President

 

সদ্যই সুকান্ত ভট্টাচার্যের আঠারো বছর বয়স পেরিয়ে গেছি আমরা একদল বন্ধু। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলাম এক খাঁচায় বন্দী, যেখানে পড়ালেখা ছাড়া আর কোন কিছুই প্রবেশ করতো না আমাদের জগতে। এই পর্যায় পেরিয়ে এসেই মনটা প্রশস্ত করে দিলাম। যতটা দিলাম ততটা করতে পারলাম কিনা সেটা জানতে আরো অনেক দিনই লেগে যাবে। আপাতত বুদ হয়েছি ভ্রমণের নেশায়। কক্সবাজার, জাফলং, রাতারগুল দিয়ে শুরু। নতুন নতুন জায়গার সন্ধান পেলেই মনটা আনচান করে উঠে, সময় গুণতে থাকি কখন যাবো।

দুই বছর ধরে নতুন একটা জায়গার নাম শুনেছি বিছনাকান্দি। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত এই জায়গা নাকি দেখতে অবিকল প্রকৃতি কন্যা জাফলংয়ের মতো। যারা গিয়েছেন তাদের কাছে জানার চেষ্টা করি কেমন, কেউ বলে ভালো কেউ বলে দেখার মতো কিছু নাই। আশাহত হই, আবার নতুন কাউকে জিঞ্জাসা করি। ইন্টারনেটে ভিডিও দেখি। বন্ধুদের কাছে প্রস্তাব তুলতেই সংসদের মতো করে হ্যাঁ, না ভোটে ট‌্যুরটা বিভক্ত হয়ে গেলে। না'র পাল্লাটাই বেশি, কারণ দুটা-এক রাস্তা খারাপ, দুই দেখতে জাফলংয়ের মতোই। বিশেষ কোন বৈচিত্র‌্য নেই তাই এই অধ্যায়ের দাঁড়ি এখানেই। আমি নাছোড়বান্দা, বললাম যার চোখে সৌন্দর্য নেই সে কক্সবাজার দাঁড়িয়ে বলবে দেখার কিছু নেই আর যে সৌর্ন্দযের পূজারী সে প্রকৃতির সবকিছুতেই সৌর্ন্দয খুঁজে। মনে হলো কথাটা গাঁয়ে লেগেছে অন্যদের। একজন একজন করে মত পাল্টাচ্ছে আর তাতেই সন্ধ্যার ধোঁয়া উঠা টং দোকানের রং চায়ের আড্ডায় ফাইনাল হয়ে গেলো আমাদের নতুন গন্তব্য বিছনাকান্দি ভ্রমণের। প্রকৃতির কোলে গাঁ ভাসিয়ে হিম শীতল হওয়ার জন্য এর বিকল্পই বা কি আছে?

তারিখ ও সময় নির্ধারণ করে সেদিনের মতো বিদায় নিয়ে প্রস্তুতিটা চলছিলো জোর। রাস্তা খারাপ থাকায় কোন প্রাইভেট গাড়ি যেতে চায় না, তাই লেগুনা রিজার্ভ করে এর উপরেই ভরসা রাখতে হলো আমাদের। যাত্রা শুরু করতে করতে সময় সকাল ১০টা বেজে গেলো সিলেট শহরেই। অবশেষে হৈ হৈল্লোড় করেই আমাদের গাড়ি চলতে থাকল এয়ারপোর্ট এলাকায় পৌঁছানোর আগে আকাঁ-বাকাঁ রাস্তা দিয়ে। আমাদের সুরেলা আর সুর ছাড়া কন্ঠে শুরু হয়ে গেলো গান আর আড্ডাবাজি। ভাঙা রাস্তায় হেলে-দুলে গান গাইতে গাইতেই আমরা পৌঁছে গেলাম বিছনাকান্দিতে। সড়ক আর নৌপথের ক্লান্তি সঙ্গ নিয়েই নৌকার পাটাতনে বসে দুপুরের খাবারটা সেরে নিলাম। এরপর ক্লান্তি আর অবসাদে ভর করা শরীরটা ডুবিয়ে দিলাম হিম শীতল পাহাড়ি ঝর্ণার পানিতে। তাতেই মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো করে সকল ক্লান্তি অবসাদ এই মূর্হতে হাওয়া হয়ে গেলো। কেউ কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউবা বন্ধু-বান্ধব সাথে নিয়ে আমাদের মতো করেই। সময়টা একেক জন একেক ভাবে উপভোগ করছেন। কেউ পানির মধ‌্যে সারা গা ডুবিয়ে রাখছেন, আবার কেউ বিশাল বিশাল পাথরের উপর দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত। ঘন্টা দু'য়েকের পাহাড়ি হিম শীতল পানি বিলাসের পর ব্যস্ত শহরে ফেরার জন্য আমাদের তৎপরতা শুরু হয়ে গেলো। এক দিকে সূর্য নিভু নিভু করছে আর অন্যদিকে আমাদের গাড়ি শহরের দিকে ছুটছে।

বিছনাকান্দি কিভাবে যাবেন: দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে সড়ক বা আকাশপথে প্রথমে সিলেট আসতে হবে। সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি যোগে এয়ারপোর্ট হয়ে হাদারপার পর্যন্ত যেতে হবে। সিএনজি ভাড়া পড়বে ১০০০-১২০০ টাকা। আসা যাওয়ার জন্য অঙ্কটা ২৩০০-২৬০০ টাকার মধ্যে থাকবে। হাদারপার নেমে আপনি নৌকা ভাড়া নিতে পারেন, ভালো দরদাম করতে পারলে ৮০০-১২০০ টাকার মধ্যেই পেয়ে যাবেন।

দুপুরের খাওয়া-দাওয়া: হাদারপারে ভালো মানের কোন রেষ্টুরেন্ট নেই। সিলেটের বিভিন্ন রেষ্টুরেন্ট দেখে যেকোন একটা থেকে খাবার প্যাকেট করে নিয়ে যেতে পারেন।

সর্তকতা: যাদের খুব বেশি ঠান্ডার সমস্যা আছে তারা বিছনাকান্দির পানিতে না নামাই ভালো কারণ বরফ শীতল পানির মতো হলো বিছনাকান্দির পানি। বিছনাকান্দির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথর গুলোর মধ্যে বিশেষ করে যে পাথরগুলো স্বচ্ছ পানির নিচে দেখা যায় সেগুলোতে খুব সাবধানে পা ফেলবেন, কারণ পাথরগুলো খুব পিচ্ছিল হয়। স্বচ্ছ পানির যেদিকটা বেশি স্রোত রয়েছে, যারা সাতাঁর জানেন না সেদিকে না যাওয়াটাই ভালো। সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন বিছনাকান্দিতে চোরাবালি রয়েছে, একটু সাবধান থাকবেন যাতে করে আপনার আনন্দ ভ্রমণটি বিষাদে পরিণত না হয়।

সৌন্দর্য: বিছনাকান্দির সবচেয়ে বড় সৌর্ন্দয ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন রঙের পাথর। এদের গাঁয়ের সাথে আপনার গাঁ মিলিয়ে অনায়াসেই সারাদিন পার করে দিতে পারেন। বিছনাকান্দির পিকনিক পয়েন্টের সাথে ভারতের সীমান্ত যোগ রয়েছে এখানে একটি ঝুলন্ত সেতু রয়েছে যা আপনার আর্কষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, তবে সেটা দূর থেকে উপভোগ করতে হবে। এছাড়া পাহাড়ের সাথে মিশে থাকা সাদা মেঘ নীল আকাশ আর দূর পাহাড়ে পাহাড়ি ঝর্নাই বিছনাকান্দির মূল সৌর্ন্দয।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর/এইচ কে

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৯:২৭ এ.ম