President

কারও কাছে তাঁর ড্রিবলিং লিওনেল মেসির মতো। কেউ বলেন বাঁ পায়ে তাঁর মেসির মতোই জাদু আছে। কেউ কেউ বলেন তাঁর স্পর্শগুলোও নাকি মেসির মতোই মোহময়। সব মিলিয়ে ফুটবল বিশ্বে এরই মধ্যে তিনি ‘নতুন মেসি’। সময়ের সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে তুলনা হচ্ছে। যেকোনো তরুণ ফুটবলারেরই এতে আনন্দে ভেসে যাওয়ার কথা। পাওলো দিবালা সেই দলের নন। পা মাটিতে রাখতে জানেন তিনি। এই সব তুলনায় তাই তেমন একটা আগ্রহ নেই আর্জেন্টিনার তরুণ ফরোয়ার্ডের। তাঁর মনে সব সময়ই ভাসে ১৫ বছর বয়সেই হারিয়ে ফেলা বাবার মুখ। ফুটবলে দিবালার সবচেয়ে বড় প্রেরণা অনেক আগেই না ফেরার দেশে চলে যাওয়া সেই বাবা। 
গত জানুয়ারিতে ইতালিতে তুষার চাপ পড়ে প্রাণ হারায় ২৯ জন মানুষ। সেই দুর্ঘটনায় নিজেদের বাবাকে হারায় জুভেন্টাসের দুই সমর্থক এদোয়ার্দো ডি কার্লো ও স্যামুয়েল ডি মিকেলাঞ্জেলো। এই দুই বালককে সান্ত্বনা দিতে ভিডিও কল করেছিলেন দিবালা। দুজনকে ডেকে নিয়েছিলেন কাছে। ছেলে দুটির সঙ্গে দেখা করে ভাগাভাগি করে নেন নিজের বাবা হারানোর দুঃখ। ওই দুই বালক আর দিবালার বাবা হারানোর গল্প এক নয়। তবে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা তো একই। 
দিবালা যখন ১৫ বছরের কিশোর, ক্যানসারের কাছে হার মেনে পৃথিবীকে বিদায় জানান তাঁর বাবা। আদোলফোর তিন ছেলের মধ্যে সবার ছোট দিবালা। কিশোর দিবালার কাছে ক্যানসারের কথাটা চেপেই গিয়েছিলেন পরিবারের বড়রা। বছর পরও সেই সময়টা ঠিকই মনে পড়ে দিবালার, ‘তারা আমাকে সবকিছু বলেনি। আমি আশা করছিলাম তিনি ঠিক হয়ে যাবেন। এখন আমি তাকে স্বপ্নে দেখি। জেগে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়ি।’
বাবার এভাবে চলে যাওয়ার পরও দিবালা নিজেকে সামলে নেন। বাবার দেখা স্বপ্নকে যে পূরণ করতে হবে। আদোলফো চাইতেন, তাঁর ছেলেদের মধ্যে একজন অন্তত ফুটবলার হোক। বড় দুই ভাইয়ের মধ্যে সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি। বাবার স্বপ্নের মশাল বহনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেন দিবালা। আট বছর বয়সে মেসির সাবেক ক্লাব নিউ ওয়েলস বয়েজে ট্রায়াল দেন। কিন্তু ক্লাবটি নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না আদোলফো। ছেলেকে আশ্বস্ত করেন এই বলে, ‘আমরা বাড়িতেই থাকব, আমার ওপর বিশ্বাস রাখ।’ বাড়ির পাশের ক্লাব করদোবায় নাম লেখান দিবালা। দিবালাদের বাড়ি লাগুনা লারগা থেকে গাড়িতে এক ঘণ্টার দূরত্ব ছিল। প্রতিদিন বাবাই দিবালাকে পৌঁছে দিতেন ক্লাবের অনুশীলনে। বাবা মারা যাওয়ার পর দিবালা লাগুনা লারগা ছেড়ে করদোবায় চলে যান। ক্লাবের গেস্ট হাউজে থাকতেন। তবে পরিবার ছেড়ে সেখানে থাকাটা সহজ ছিল না তাঁর জন্য, ‘আমি বাথরুমে গিয়ে কাঁদতাম। কিন্তু হাল ছেড়ে দিইনি। আমার বাবার স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে আমাকে ফুটবলার হতেই হতো।’ 
১৭ বছর বয়সে করদোবার হয়ে প্রথম গোল পান দিবালা। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি মারিও কেম্পেসকে পেছনে ফেলে ক্লাবের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে যান। পরের মৌসুমে ৩৮ ম্যাচে করেন ১৭ গোল। ‘লা জয়া (দ্য জুয়েল)’ নামও পেয়ে যান দিবালা। করদোবা থেকে তাঁকে নিয়ে নেয় পালেরমো। ইতালির এই ক্লাবটির কোচ মাউরিসিও জাম্পারিনিই প্রথম দিবালাকে ‘নতুন মেসি’ আখ্যা দেন। পালেরমো থেকে ২০১৫ সালে নাম লেখান জুভেন্টাসে। এর পরের গল্প তো সবারই জানা। যে মেসির সঙ্গে তুলনা হচ্ছে দিবালা এখন আর্জেন্টিনা দলের আক্রমণভাগে সেই মেসির সঙ্গেই খেলছেন। মেসির মতো তিনিও আর্জেন্টিনা দলে অভিষেক ম্যাচেই লাল কার্ড দেখেছেন। এতে কারও কারও বিশ্বাসটা আরও দৃঢ় হয়েছে—সবকিছু যখন মিলে যাচ্ছে মেসির সঙ্গে, বিশেষ করে অভিষেকে লাল কার্ড দেখার বিষয়টিও; তাহলে দিবালা মেসির যোগ্য উত্তরসূরি না হয়ে পারেনই না!
দিবালা অবশ্য এভাবে ভাবেন না। নিজেকে গড়ে তুলতে চান নিজের মতো করে, ‘আমি দিবালা। আর আমি শুধু দিবালাই হতে চাই। আমি অবশ্য বুঝতে পারি, তুলনা আসেই। কিন্তু আমি বলব, মেসি একজনই আছে। ম্যারাডোনাও যেমন একজনই হয়।’ মেসি-ম্যারাডোনার প্রসঙ্গ আসতেই দিবালা আবার সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন তাঁর প্রয়াত বাবাকে, ‘আমি আমার গোলগুলো তাঁকে উৎসর্গ করি। ফুটবল আমাকে অনেক দিয়েছে। আমি আমার চেয়ে তাঁর (বাবা) ইচ্ছার কারণেই খেলোয়াড় হয়েছি। তিনি আমাকে লড়াই করতে আর হাল ছেড়ে না দিতে শিখিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল আমাকে ফুটবল খেলতে দেখা। আমার বিশ্বাস, আমাকে নিয়ে বাবা স্বর্গে বসে গর্ব করেন।’ সূত্র: গোল ডটকম

১১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০৭ এ.ম