President

কারখানা বন্ধ থাকাকালে শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য সরকারের কাছে এককালীন অর্থ বরাদ্দ চাইলেন ট্যানারি মালিকেরা। এ ছাড়া কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় যেসব রপ্তানি আদেশ বাতিল হবে এবং ক্রেতারা যে ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন, সেই অর্থও সরকারের কাছে দাবি করেছেন মালিকেরা।
দেশের চামড়া খাতের ১৩টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত চামড়া শিল্প রক্ষা ঐক্য পরিষদ আয়োজিত মহাসমাবেশে এসব দাবি জানানো হয়। গতকাল সোমবার রাজধানীর হাজারীবাগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঐক্য পরিষদের পক্ষে যে নয়টি দাবি তুলে ধরা হয়, তার মধ্যে চার ও পাঁচ নম্বর দাবি ছিল শ্রমিকের বেতন ও রপ্তানি আদেশ বাতিলে ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারের কাছে টাকা চাওয়া-সংক্রান্ত।
সমাবেশে তুলে ধরা দাবিগুলোর প্রথমটিই হলো ২০০৩ সালের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী সাভারের চামড়াশিল্প নগরের জমির মালিকানা দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া। বাকি দাবিগুলো শিল্পনগরে আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি), ক্রোক রিকভারি ইউনিট ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে শিল্পনগরে গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের আবাসন ও চামড়ার সংযোগ শিল্পকে জমি দেওয়া, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অব্যবস্থাপনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত, ট্যানারি মালিকদের বিদ্যমান ঋণ ব্লক করা ও সুদ মওকুফ করা এবং হাজারীবাগের জমিতে নকশা ও প্ল্যান পাশের ওপর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী ১৫ দিনের মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত না করলে বিসিক ঘেরাওয়ের কর্মসূচিও দিয়েছে চামড়া শিল্প রক্ষা ঐক্য পরিষদ। লিখিতভাবে এটা জানালেও সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে মালিকেরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছেন। আগামীকাল তাঁরা হাজারীবাগে কালো পতাকাসহ মৌন মিছিল করবেন এবং ১৫ এপ্রিল সব সংগঠন মিলে মতবিনিময় সভা করবেন।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর গত শনিবার হাজারীবাগের সব ট্যানারির গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর চামড়া শিল্প রক্ষা ঐক্য পরিষদ গঠন করা হয়। চামড়া খাতের সংগঠনগুলোর পূর্বনির্ধারিত মহাসমাবেশ কর্মসূচি এ সংগঠনের ব্যানারেই অনুষ্ঠিত হয়।
হাজারীবাগ ঢাকা ট্যানারি মোড়ে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে চৌরাস্তার এক দিকে ছিল মঞ্চ। অন্য তিন দিকে চামড়া-সংশ্লিষ্ট সব সংগঠন ও খাতের কয়েক হাজার শ্রমিক, কর্মচারী ও মালিকেরা বসে নানা স্লোগান দেন। সমাবেশস্থলে বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুনে বিভিন্ন সংগঠনের দাবি উঠে আসে। যেসব সংগঠন সাভারে জমি পায়নি, তারা জমি দাবি করে, শ্রমিকেরা আবাসন ও চিকিৎসা-সুবিধা দাবি করেন, ছোট রপ্তানিকারকেরা সাভারে কমন ফ্যাসিলিটি সেন্টার করার দাবি করেন, জমি না পাওয়া কয়েকটি ট্যানারির ব্যানারে জমি দেওয়ার দাবি করা হয়।
সমাবেশে কর্মসূচিগুলো তুলে ধরে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহিন আহমেদ বলেন, চামড়া খাত-সংশ্লিষ্টরা চাইলে হাজারীবাগে কেউ সেবা-সংযোগ কাটতে প্রবেশ করতে পারত না। তবে শান্তি রক্ষার জন্য সেটা করা হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তর এক দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পেরেছে। তিনি আরও বলেন, পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আদালতকে ভুল তথ্য দিয়েছে। আর শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিক ট্যানারি মালিকদের সহায়তা করার বদলে ফাঁসি দিয়েছে।
দাবি না মানলে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের হুমকি দিয়ে শাহিন আহমেদ বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি-সংযোগ দিতে না পারলে আবার হাজারীবাগে কারখানা চালু করতে দিতে হবে।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ দাবিগুলো তুলে ধরে বলেন, আজকের অবস্থার জন্য বিসিক দায়ী। চামড়াশিল্প নগরের মতো বড় প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা তাদের নেই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চামড়াকে এ বছরের ‘বর্ষপণ্য’ ঘোষণা করেছেন। এ খাতে ৬০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। তবে এখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেল। তিনি সাভারের ধলেশ্বরী নদী দূষণ হচ্ছে উল্লেখ করে সেখানে বর্জ্য পরিশোধনাগার থেকে পচা পানি ফেলা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
বিটিএর সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বিসিক লে-আউট প্ল্যান দেওয়ার পরে সাভারে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন ট্যানারি মালিকেরা। ২৭ মাসে সেখানে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়।
মহাসমাবেশের সঞ্চালক ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাজারীবাগ এখন ভুতুড়ে এলাকা। কারখানার ভেতরে অন্ধকার, বাইরে গরম। বিদ্যুৎ ও পানি না দিয়ে শ্রমিকদের মেরে ফেলার অবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
সমাবেশে ট্যানারি মালিকদের দুই সমিতি ছাড়াও ট্যানারি ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, লেদার কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি, বাংলাদেশ লেদার অ্যান্ড লেদারগুডস ম্যানুফ্যাকচারিং কো-অপারেটিভ সোসাইটি, লেদার ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড টেকনোলোজি সোসাইটি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইমপোর্টার্স অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ চামড়া রপ্তানিকারক সমিতি, স্পিলিট চামড়া ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতি, বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, সমাজতান্ত্রিক চামড়া শিল্প শ্রমিক জোট, বাংলাদেশ লেদার সিলেক্টর অ্যাসোসিয়েশন, হাজারীবাগ ঠেলাগাড়ি লেবার বহুমুখী সমবায় সমিতি, বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

১০ এপ্রিল, ২০১৭ ১৯:৩২ পি.এম