President

সুখ কিংবা আনন্দ ভাগ করে নিলে কষ্টও ভাগ করে নিতে হয়। ভালোবাসায় কোন বন্টনবিধি কার্যকর না হলেও প্রেম ও প্রীতি বিলিয়ে দেয়া যায়। মানবিকভাবে ভালোবাসা যায় প্রতিটি মানুষকে। ভেতরে ইচ্ছে জাগ্রত হলেই পাঁশে দাঁড়ানো যায়। সময় এখন দুর্ভোগের।

দক্ষিণ এশিয়াকে ছুঁয়ে গেছে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা। চীন, ভারত ও নেপালের বন্যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় বন্যা বাংলাদেশের নিত্য সঙ্গী হলেও বিপদসীমা অতিক্রম করে কখনও ১০০ সে. মি উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়নি। প্রায় টিনের চালা ডুবে যাওয়ার অবস্থাও তাই দেখতে হয়নি পূর্বে কখনও। মাটি কিংবা ইটের দেয়ালের প্রায় পুরোটা ডুবে যাওয়ার পর শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে সপরিবারে টিনের চালে আশ্রয় নিয়েছে এমন ছবিও দেখি নি পূর্বে। বুক সমান পানিতে মধ্য বয়স্ক দুই নারীর হাতে কুকুরের দুই পা- আর আদরের সেই কুকুরটিকে ডাঙায় টেনে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা তাদের; এমন দৃশ্যপটও দেখতে হয়নি কখনওই। ভেলায় ভেসে যাচ্ছে পরিবার- সে এক চিরন্তন দৃশ্য। পানিতে ভেসে আসছে লাশ- সেও পুরোনো।

তবে এবারের বন্যায় দেখতে হয়েছে নতুন কিছু। দেশের শস্যভাণ্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চল সাধারণত বন্যার কবলে না পড়লেও চলিত মৌসুমের দ্বিতীয় দফায় আক্রান্ত হয় ওই অঞ্চলটিই। এতে ফসলী জমিসহ ডুবেছে ঘরবাড়িও। রাজশাহী অঞ্চলে পানি সরে যাওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্তরা বাড়ি ফিরতে পারছে না। ঘরগুলো প্রায় বিধ্বস্ত। এর মধ্যেই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে মধ্যাঞ্চল। ঢাকার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলাতে মানুষ এখন পানিবন্দি। দক্ষিণে বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও চলমান এই বন্যা স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করছে অনেকেই।

তথ্যগতভাবে এখন পর্যন্ত বন্যা পূর্বের রেকর্ড স্পর্শ না করলেও হাওরের আগাম বন্যা ছাড়াও মৌসুমের প্রথম দফার বন্যাতেই ক্ষতিগ্রস্ত ছিলো দেশ। বোরোর ক্ষয়ক্ষতিতে উৎপাদন যেমন হয়েছে নিম্নগামী তেমনি খাদ্য রপ্তানিকারক দেশের তকমা মুছে গিয়ে দেশকে পুনরায় নাম লেখাতে হয়েছে আমদানিকারকের তালিকায়। চালের দাম কমাতে সরকারের প্রায় সব চেষ্টাই বৃথা গেছে। বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানিতে শুল্ক প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চললেও মার খেয়েছে এই উদ্যোগও।

ভারত অভ্যন্তরীণভাবে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকেও খাদ্যশস্য সেভাবে আসছে না। আবার চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ বন্যায় আক্রান্ত হওয়ায় চালের আন্তর্জাতিক বাজারও রয়েছে অস্থির। এমন সময়ে চলতি আমন মৌসুমেও ফের আঘাত। ৩৪ জেলায় ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে ৫ লাখ হেক্টরের বেশি আমন। সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১০ শতাংশ ফসলী জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শেষ পর্যন্ত শতাংশের ঘরেও এই অঙ্ক বড় হতে পারে। শুধু শস্যই নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছে প্রাণিসম্পদ খাতও। আক্রান্ত জেলাগুলোতে কোরবানির আগে গরু নিয়েও সমস্যায় পড়েছে অনেকে। সঙ্কট দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের। ঘরহীন মানুষগুলো এখন প্রায় নি:স্ব।

ক্ষতির চিত্র নতুন করে তুলে ধরার কিছু নেই। আবার বন্যা নিয়ন্ত্রণেও নেই কারো হাত। ভাটির দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ বরাবরই আক্রান্ত। উজানের বাঁধ নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। বাঁধ একেবারে উঠিয়ে দেয়ার পন্থাও নেই।

জানা যায়, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি প্রথমে পাকিস্তান সরকারেই উদ্যোগ। পূর্ব পাকিস্তানের এই অংশে বাঁধ প্রকল্প শুরুর তৎপরবর্তী সময়ে ভারতও উজানে প্রায় ৫ টি বাঁধ দিয়েছে। তবে দেশে স্বাধীনের এতোবছর পরও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। কারণ উজানে বাঁধ থাকার পর ভাটিতে বাঁধ দিয়ে কোন লাভ নেই। ভারত বাঁধ নির্মাণ শুরু করলে পরবর্তীতে এটি বুঝতে পারে পূর্ব বাংলা। অর্থাৎ ৪৭’ পরবর্তী সময়ে ওই অংশে বাঁধ দিতে ভারতকে উস্কে দিয়েছিলো পাকিস্তান সরকারই। একইভাবে ভারতের উজানে চীনেও একাধিক বাঁধ রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে চীনের একটি বাঁধ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর এলেও ভারত এটি নিয়ে টু শব্দ করেনি। কারণ, হয়তো তারাও একই দোষে দুষ্ট। চীনের ওই বাঁধটির প্রভাব ভারতসহ বাংলাদেশেও পড়বে।

পানি নিয়ে রাজনীতি নতুন নয়। তাই কোন কোন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করে থাকেন, পানি নিয়েই হতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। কারণ পানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ, ফসল ও কোন একটি দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ। তবে ভৌগলিক পরিবেশ কিংবা রাজনীতির কারণে আপাতদৃষ্টিতে বন্যার কোন স্থায়ী সমাধান না থাকলেও বানভাসিদের রক্ষার্থে আমাদের করণীয় অনেক। নিজ অবস্থান থেকে প্রতিটি মানুষেরই কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বনভাসিদের পাঁশে দাঁড়ানো। মানুষ দাঁড়াচ্ছেও। যার যার অবস্থান থেকে ত্রাণ সংগ্রহ করছে। বলা চলে, অনেকটা ঝাঁপিয়েই পড়েছে।

ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে সরকারও। একইভাবে এগিয়ে আসছে এনজিও সংস্থাগুলো। বরাবরেরই মতো এবারও সরকার ও এনজিও সংস্থার ত্রাণ তৎপরতা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এটি উঠবেই। তবে সরকার ও সংগঠনের বাইরে দেশের স্বার্থে প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। মানবিকভাবে মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াবে। দাঁড়াচ্ছেও।

শুক্রবার। রাত সাড়ে ৮ টা। মহাখালীর পার্শ্ববর্তী বউবাজার। ছ’তলার একটি ফ্ল্যাটে মেস করে ব্যাচেলর জীবন পার করে দেওয়ার এই সময়ে মাসে একবার বাজার করা নৈতিক দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে। সে দায়িত্ব সারতেই বাজরে ঢু দিলাম। বাজার করার ফাঁকে কথা হচ্ছিলো মধ্য বয়স্ক এক কাঁচা মরিচ বিক্রেতার সঙ্গে। এমন সময় সেই দোকানে এলো ৪ থেকে ৫ জনের একটি দল। তারা সবাই পায়জামা, পাঞ্জাবী ও টুপি পরিহিত। পোশাকের ধরণই বলে দেয়, তারা পার্শ্ববর্তী কোন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে তাদের হাতে বন্যার জন্য সাহায্য সংগ্রহ করার বক্স। দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে টাকা তুলছে। মুহূর্তেই বিস্মিত চোখে ধরা পড়া দৃশ্যপট- কাঁচামরিচের ওই দোকানদার বন্যার্তদের সাহায্য সংগ্রহের বাক্সে ১০০ টাকার একটি নোট ঢুকিয়ে দিলেন। তিনি কেবল জিজ্ঞেস করেছিলেন, এটি কিসের সাহায্য। বন্যার কথা শুনার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যাশ বাক্স থেকে ১০০ টাকার একটি নোট হাতে নিয়ে সাহায্যের ওই বাক্সে ঢুকিয়ে দেন। তরুণেরাও দ্রুত দোকান ত্যাগ করে।

মুহূর্তটিতেই হৃদয়ে কেমন জানি একটি তারুণ্য খেলে গেলো। অজান্তেই হয়তো বলে বসেছি, তরুণেরাই পারে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যদি পারে তবে স্কুল-কলেজের কেন নয়। বরং তারা দ্বিগুণ গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে। এবং উচিৎও বৈকি।

সময়টিতে কেবল এটিই একটি ঘটনা নয়। এমন অজস্র ঘটনা আপনার চোখের সামনে পড়তে পারে। বর্তমানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন্ধুরা মিলে অনেকেই ত্রাণ সংগ্রহ করছে। অনেকটা সার্কেল ভিত্তিক। আবার ত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে সংগঠন ভিত্তিকও। পারিবারিকভাবেও কেউ কেউ সাহায্য নিয়ে ছুটে যাচ্ছেন। তবে এখনও ত্রাণ বিতরণের তৎপরতা পুরোদমে শুরু হয়নি। এই সপ্তাহের মধ্যে অধিকাংশ সংগঠন নেমে পড়বে মাঠ পর্যায়ে। কেউ কেউ পূর্বেই স্থান নির্ধারণ করে নিয়েছে। আবার কোন কোন ইভেন্টে স্থান নির্ধারণ করেই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে।


সম্প্রতি, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগডোমা এলাকার ভুড়িহাট স্কুলের আশ্রয় কেন্দ্র, সদুল্লাপুর ও কাজল গ্রামে শম্পা সরকার ও তার বন্ধুরা নিজ উদ্যোগে বিতরণ করেছে চিড়া-মুড়ি-বিস্কুট ও গুড়। প্রায় ২০০ পরিবারের মধ্যে তারা হালকা নাস্তা জাতীয় এ খাবারগুলো বিতরণ করেছে। দিনাজপুরে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারাই প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে বলে ফেসবুকে লক্ষ্য করেছি। একইভাবে শনিবার ফেসবুকে লক্ষ্য করেছি, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী জামালপুরের ইসলামপুরে শুকনো খাবার বিতরণ করেছে। মশিউর রহমান আদি ও তার বন্ধুরা মিলে এই উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানতে পেরেছি। রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতির উদ্যোগেও শনিবার বন্যা দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পাঠানোর খবর শুনতে পেয়েছি। শাহবাগ কেন্দ্রিক আমাদের একটি গ্রুপও ত্রাণ বিতরণে দ্রুত সময়ে যাচ্ছে হাওরে। সঙ্গত কারণেই এই গ্রুপটির ত্রাণ বিতরণে বিলম্ব হয়েছে। এরজন্যে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দু:খিত বলা না হলেও হয়তো বলতে হবে। একই সময়ে ফেসবুক ভিত্তিক যে সংগঠনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে আসছে তারা এখনও মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেনি। অধিকাংশ সংগঠনই এখন পর্যন্ত অর্থ সংগ্রহ করছে।

ময়মনসিংহের একদল তরুণ ত্রাণ সংগ্রহের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ধু ও ছোট ভাই মাজহারুল ইসলাম তমাল ও তার বন্ধুরা মিলে জামালপুর বা নেত্রকোনার কোন একটি গ্রামের ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। যোগাযোগ করছে ওই এলাকার স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে। তবে তারা কোনভাবেই ২০০ পরিবারের অধিক এমন কোন গ্রামে ত্রাণ বিতরণ করবে না। কারণ হিসেবে তমাল জানিয়েছে, তারা ওই মুখগুলোর মধ্যে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও হাসি ফোটাতে চায়। আর ত্রাণের জন্য ১ লাখ টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমে প্রথম দিনেই তাদের সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজারের অধিক। একইভাবে শনিবার ফেসবুকে সংগঠন বা ব্যক্তি পর্যায়ে ত্রাণ তৎপরতা এগিয়ে চলার খবর পাওয়া গেছে। আপডেট জানিয়ে জয়ন্ত মুখার্জী ফেসবুকে লিখেছেন, ২ দিনে ২ ঘণ্টা করে মাত্র ৪ ঘণ্টায় ৪৩ হাজার টাকা বেশি উঠেছে বনভাসিদের জন্য। তবে আজকের বড় অর্জন ১ জন অন্ধ মানুষ যিনি বন্যার্তদের জন্য ৫০ টাকা দিয়েছেন। যা কেউ জানবে না। অর্থাৎ বন্যার্তদের পাঁশে দাঁড়াতে অন্ধ লোকেরাও এগিয়ে আসছে। এর থেকে বড় প্রাপ্তি সত্যিই আর হতে পারে না!

প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন বরাবরের মতো এবারও মাঠে নেমেছে। তারা মাঠ পর্যায়ে ২২ তারিখের পর ত্রাণ সংগ্রহ পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। সংগঠনটি প্রথম ধাপে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ করতে চায়। গনির চর, চর বাঘমারা ও কালার চরে ২৫০ জনকে ত্রাণ দেওয়ার লক্ষ্য তাদের। ছোট ভাই পাভেল বাবু এই সংগঠনটির সঙ্গে জড়িত। জানামতে, তার উদ্যোগেই গড়ে উঠেছে প্রচেষ্টা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মধ্যে তাদের ব্যতিক্রমী কার্যক্রম সবার নজর কেড়েছে। তাদের উদ্যোগে পরিচালিত প্রচেষ্টা ফুড ব্যাংকিং। যার কাজ মূলত কোন অনুষ্ঠানে খাবার বেঁচে গেলে ওই খাবার সংগ্রহ করে পথের মানুষের মধ্যে বিলিবন্টন করা। তাদের প্রদত্ত নম্বরটিতে কল করলেই স্বেচ্ছাসেবীরা ওই বাসা কিংবা কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। এবং পরবর্তীতে রাতভোর মানুষের সেবায় চলে তাদের কর্ম। খাবারের প্যাকেট তৈরি থেকে শুরু করে বিলিবন্টন পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রমেও তাদের মুখে থাকে হাসি। পথের মানুষের মুখে হাসি ফোটে বলেই হয়তো তারা হেসে উঠে সকালের সূর্যের মতো!

ত্রাণ সংগ্রহে সংগঠন ভিত্তিক কাজ করছে লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশনও। বন্যা দুর্গতদের জন্য তাদের সংগ্রহের পরিমাণ এখন পর্যন্ত ৬৮ হাজারের উপরে। কুড়িগ্রামের উলিপুরে তাদের ত্রাণ বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে রাজনৈতিকদলগুলোও ত্রাণ সংগ্রহ করছে। কয়েকটি বাম দলের পক্ষ থেকে ত্রাণ সংগ্রহের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তবে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এমন কোন তৎপরতা চোখে পড়েনি।

সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকেও ত্রাণ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকরা ত্রাণ তহবিলে অর্থ জমা করছেন। লেখক ও কবি সমাজের পক্ষ থেকেও দাঁড়ানো হচ্ছে বনভাসিদের পাঁশে। সংস্কৃতিকর্মীরাও দাঁড়িয়েছেন। ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনায় বলা যায়, মানুষ এগিয়ে এসেছে। আসছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ত্রাণ তৎপরতা পর্যাপ্ত নয়। সে হোক সরকারী কিংবা বেসরকারি!

এমন পরিস্থিতিতে আলোচনায় এসেছে মোবাইল কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সর্বশেষ তথ্যমতে, মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৩ কোটি ৫৯ লাখ। তবে কারো কারো দুইয়ের অধিক সিম রয়েছে। সবমিলিয়ে ধরা যাক, একটিভ গ্রাহকের সংখ্যা ১০ কোটি। বন্যার্তদের সাহায্যার্থে প্রতিটি গ্রাহকের কাছ থেকে যদি ১০ টাকা করে কাটা হয়, তাহলে সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ কোটি টাকা। আর যদি ২ টাকা করেও আদায় করা হয় তবে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ কোটি টাকা। এটাও অর্থ সংগ্রহের একটা পন্থা হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা বাধ্যতামূলক করা যাবে না। কারণ, ইতোমধ্যে এই ইস্যুকে পূঁজি করতে শুরু করছে বিরোধী পক্ষ। তাদের ভাষ্য, সরকার যদি এতোটাই স্বনির্ভর হয় তাহলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেন অর্থ সাহায্য। কট্টর এক সমালোচকের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা না দিয়ে আমি শুধু বলতে চাই, যদি এইভাবে বন্যার্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয় তবে একটি মেসেজ বা কোডের মাধ্যমে যাতে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ যারা অর্থ সাহায্য করতে চাইবে তারাই মেসেজের মাধ্যমে কোড বা কল করে সম্মতি প্রকাশ করতে পারবে। এক্ষেত্রে কল করতে বা মেসেজে পাঠাতে কোন অর্থের প্রয়োজন হবে না। এবং এটার উপর কোন ভ্যাট বসানো যাবে না। আর এই অর্থ সংগ্রহ ও বিতরণের সার্বিক বিষয় নজরদারি করতে হবে সরকারকে। তবেই এমনটি হতে পারে। নতুবা নয়।

এবারের কোরবানিটা ছোট হোক বলেও কথা উঠেছে। তবে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষেরা এটা করবে বলে আমার বিশ্বাস হয়না। বরং কোরবানিতে কার গরু কতো বড় হবে পরোক্ষভাবে চলে তার প্রতিযোগিতা। আস্ত একটা গরুর বদলে কয়েকজনে মিলে কোরবানি দিতে রাজি হবে না অধিকাংশই। অবশ্য কয়েকজনে মিলে যারা কোরবানি দেন তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। নায়ক ওমর সানী ও মৌসুমি দম্পতি এবার কোরবানি না দিয়ে কোরবানির ১ লাখ টাকা বন্যার্তদের জন্য দান করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছে। আর তৎপরবর্তী সময়েই বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তাদের পক্ষে মত দিয়ে অনেকেই বলতে শুরু করেছে, বন্যার্তদের সাহায্যার্থে এবারের কোরবানি ছোট হোক। অবশ্য এটা নিয়ে কেউ কেউ ট্রলও শুরু করেছে। বিদ্রূপাত্মক ভাষায় আক্রমণ করছে ওই দম্পতিকে। মানুষের মধ্যে মানবিক চেতনা জাগ্রত করতেই হয়তো তাদের এই ঘোষণা ছিলো। তবে এর প্রতিক্রিয়া এসেছে বিপরীত। ওইসব বিপরীত মন্তব্যকারীদের উদ্দেশ্যে শুধু বলতে চাই- মানবিক হোন। মানুষের প্রতি। অসহায়ের প্রতি। অন্যের সমালোচনা না করে নিজে কী করছেন একবার জিজ্ঞেস করুন নিজেকে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করুন। যদি সবই লোক দেখানো হয়, আপনার দেখাতেও সমস্যা কী। নেমে পরুন। নাটক করে হলেও দেশের সেবার্থে মানুষের পাঁশে দাঁড়ান।

এবার আসা যাক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের বিষয়ে। সাহায্যের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ জমা দিতে এটি সবচেয়ে বিশ্বস্ত একটি ফান্ড। যা প্রধানমন্ত্রী নিজে গ্রহণ করেন। অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বড় কোন প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিকেই ত্রাণের জন্য অর্থ জমা করতে দেখা যায়। এই মুহূর্তে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোরও ত্রাণের ব্যাপারে তৎপর হওয়া উচিৎ। একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে যদি ছোট অঙ্কের অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতো, তাও উপকারে আসতো বলে বিশ্বাস করি। এক্ষেত্রে একটি ব্যাংক একাউন্ট নম্বর জনসম্মুখে উন্মুক্ত করে দিলে ওই একাউন্টে অনেকেই অর্থ জমা করবে বলেই ধারণা করছি। তবে এমন কোন পন্থা আছে কিনা জানা নেই। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকেও এমন কোন তৎপরতা চোখে পড়ে নি। লেখাটি তাদের নজরে আসলে এটি নিয়ে তারা ভাববেন বলে বিশ্বাস করি।

বলে রাখা ভালো, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের বিষয়ে আমার ধারণাগত বা তথ্যগত কোন বিচ্যুতিও থেকে যেতে পারে। তবে সার্বিক বিষয়টি সবার নজরে আনতেই ত্রাণের ব্যাপারে সবদিকেই হিন্টস দিয়েছি।

ত্রাণ তৎপরতায় অবশ্যই জবাবদিহি থাকা উচিৎ। যারা অর্থ সংগ্রহ করছে তারা ওই অর্থ কিভাবে ব্যয় করছে- ফেসবুক ভিত্তিক সংগঠন হলে ফেসবুকেই তা জানানো উচিৎ। ব্যক্তিগত উদ্যোগের ক্ষেত্রেও যদি ফেসবুক ব্যবহৃত হয়ে থাকে সেক্ষেত্রেও। সবার সঙ্গে কথা বলে যা মনে হয়েছে, এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় একটিই। বানভাসির পাশে দাঁড়ানো। অবশ্যই তা ছোট ছোট উদ্যোগ আর প্রচেষ্টায়। তবে সমন্বিত উদ্যোগ হলে আরও ভালো হতো। অবশ্য বৃহৎ পর্যায়ে তা সম্ভব নয়। সবার সম্মিলিত ছোট ছোট প্রচেষ্টার প্রভাবেই তা বৃহৎ ত্রাণ তৎপরতায় রূপ পাবে বলে বিশ্বাস করি। তবে ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে একই এলাকায় যেন বারবার ত্রাণ বিতরণ না হয়। স্ব বা সাংগঠনিকভাবে যে এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে- ওই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত সবাই যেন উপকার ভোগের ক্ষেত্রে এর অংশীদার হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকরই উচিৎ হবে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সামগ্রিক কার্যক্রম তদারকি করা। একই সঙ্গে সরকারী ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রেও আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে।

এক্ষেত্রে যেন স্বজনপ্রীতির অভিযোগ না পাওয়া যায়। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকেও সে রকমের ঘোষণা রয়েছে।

বলা হয়েছে, কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে ছাড় নয়। সর্বশেষে ত্রাণ তৎপরতায়ও তারুণ্যের জয় হচ্ছে বলে বিশ্বাস করি।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর/এইচ কে

২০ আগষ্ট, ২০১৭ ২৩:০৩ পি.এম