President

চলছে গ্রন্থমেলা। নতুন পুরানো লেখকদের ভীড়ে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত। সঙ্গে পাঠকদের বইকেনা এবং বই নিয়ে আগ্রহ। সব মিলে গ্রন্থমেলা মানেই লেখক, পাঠক, প্রকাশক আর প্রতিদিন আসা নতুন বই। গ্রন্থমেলা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাপ্রকাশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকাশক ইঞ্জিনিয়ার মেহেদী হাসান।

কেমন দেখছেন এবারের গ্রন্থমেলা?
গ্রন্থমেলা তো মাত্র শুরু হলো। এখনই মন্তব্য করার সময় হয়নি। তবে যা দেখছি তাতে আশা করতে পারি গ্রন্থমেলা অনেক পরিচ্ছন্ন হবে। একটি কথা বলা দরকার, এবারের মেলার আয়তন বেড়েছে। যা দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল পাঠকের। সঙ্গে প্রকাশকদেরও। আশা করছি মেলার আগামী দিনগুলো ভালোই হতে থাকবে।

কতটুকু প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে?
প্রত্যাশার তো আর শেষ নেই। আমাদের কিছু প্রত্যাশা পূরণ হয়, আবার নতুন প্রত্যাশার জন্ম নেয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ সবসময় সচেষ্ট আছে প্রকাশক ও পাঠকের প্রত্যাশা পূরণের জন্য। একটি কথা বলে রাখা ভালো, তাদেরও কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার জন্য সবার উচিত একাডেমিকে সহযোগিতা করা।

মেলার কোন বিষয়টির উপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে?
সবার আগে পাঠকের নিরাপত্তা। এই পাঠকদের মধ্যে শিশু ও নারীও থাকে। আমরা চাই সবাই মেলায় এসে আনন্দের সঙ্গে বই কিনুক। আনন্দের সঙ্গে বাসায় ফিরুক। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এ ব্যাপারে সার্বিক সচেষ্ট থাকা।

মেলা কী আসলে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে?
না। তবে আমাদের প্রকাশকরা যেভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে স্টল বা প্যাভিলিয়ন বানান তা যেকোনো আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এখানেও একটি কথা বলা যায় যে, বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে গ্রন্থমেলাই যা পুরো একটি মাস চলে। পৃথিবীর কোনো দেশে এত দীর্ঘ সময়ের বইমেলা হয় বলে আমার জানা নেই। শুধু তাই নয়, এত লোকসমাগমও পৃথিবীর কোথাও হয় না।

যদি না পায়, তবে কোন বিষয়গুলোতে মনোযোগী হতে হবে?
মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো গ্রন্থমেলাকেও সারাবিশে^র জন্য মুক্তি দিতে হবে। আমরা চাই মননশীলতার মুক্তি। আমরা চাই সৃজনশীলতার মুক্তি। যেকোনো আন্তর্জাতিক মেলা মানেই যেকোনো দেশ তাদের মননশীল ও সৃজনশীল বই নিয়ে অংশগ্রহণ করবে। এ ব্যাপারে আমার মতামত হচ্ছে গ্রন্থমেলার পুরোনো ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে প্রতিবছর আলাদা করে আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজন করা যেতে পারে। বাংলা একাডেমি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সাহিত্য সম্মেলন সম্পন্ন করতে পেরেছে। আমি বিশ^াস করি আন্তর্জাতিক বইমেলাও শুরু করা যেতে পারে বাংলা একাডেমিকে দিয়ে।

মেলা পাঠকপ্রিয় হতে পেরেছে কি?
পাঠকপ্রিয় না হলে এত জমজমাট হতো না গ্রন্থমেলা। পাঠক আছে বলেই প্রকাশকরা নতুন নতুন বই নামক পণ্য প্রস্তুত করেন এবং মেলাকে সাজান পাঠকের মতো করে। বরং মেলা এতই পাঠকপ্রিয় যে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে সারাদেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হবে।

নতুন পাঠক সৃষ্টিতে আপনারা কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন কি?
এই ব্যাপারে আমার সোজাসাপটা উত্তর প্রতিটি পরিবারকে এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবার যদি চায় পরিবারের বড়ছোটো যেকোনো সদস্য পাঠক হয়ে উঠবে। প্রতিটি শিক্ষ প্রতিষ্ঠানেও পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দিতে হবে মননশীল ও সৃজনশীল বই। আমরা সারাদেশে বই পৌঁছে দিচ্ছি। এসব বই কেনার ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহী করে তুলবে অভিভাবক এবং শিক্ষকরা। প্রয়োজনে টাকা নষ্ট করার পথ বন্ধ করে বই সবার হাতে তুলে দিতে হবে। এ তো গেল অভিভাবক ও শিক্ষকদের দায়িত্বের কথা। ইদানীং কিছু চিন্তাশীল মানুষ পাঠক সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন ই-বুক বাজার তৈরি করেছেন। যেহেতু তরুণসমাজ আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত সেজন্য এই বাজার। শুধু তাই নয় এমন কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম নিয়েছে যারা পাঠকের চাহিদা মতো বই সংগ্রহ করে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান বই কেনায় আগ্রহী করে তোলার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহব্যঞ্জক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই পাঠক সৃষ্টিতে সরকারও একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি উপজেলায়, প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি স্কুলে এবং মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তুলতে পারে।

ঢাকা কেন্দ্রিক বইমেলার বড় আয়োজন। আপনার মতামত কী?
প্রতিবছর প্রতি জেলা, উপজেলায় বইমেলার আয়োজন করা হয় জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির মাধ্যমে। তাছাড়াও স্থানীয় কিছু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান প্রতিটি জেলায় গ্রন্থমেলার আয়োজন করে থাকে। এসব মেলায় আমন্ত্রণ পেলে আমরাও অংশগ্রহণ করি। তবে এ ব্যাপারে যে কথাটি বলা দরকার তাহলে প্রত্যেক এলাকায় এই আয়োজন আরও বেশি করে করা দরকার। প্রতিটি চাষি মজুরেরও বই পড়ার অধিকার আছে। এ অধিকার পূর্ণ করতে পারে একমাত্র স্থানীয় চিন্তাশীল মানুষের পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।

আপনার প্রকাশনী থেকে কতগুলো নতুন বই আসছে?
চলতি বছর বাংলাপ্রকাশ থেকে আসছে প্রায় শ’খানেক বই। বাংলাদেশের খ্যাতিমান হাসান আজিজুল হক, আবুল আহসান চৌধুরী, মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী, ইমদাদুল হক মিলন, ইকতিয়ার চৌধুরী, সুব্রত বড়–য়া, ড. আলী আজগর, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, আলী ইমাম, কাইজার চৌধুরী, ড. মাহবুব সাদিক, সরকার আবদুল মান্নান, ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজ, সেলিনা হোসেন, পবিত্র সরকার, অমর মিত্র, শ্যামলকান্তি দাশ, বিপ্রদাশ বড়–য়া, হাশেম খান, সুজন বড়–য়া, হাসান হাফিজ, আমীরুল ইসলামসহ দেশের মানি-গুণী লেখক আছেন।

কোন ধরনের বই বেশি আসছে?
গল্প, উপন্যাস ছড়া, কবিতা ছাড়াও আমাদের প্রকাশনা থেকে আসছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বেশ কিছু বই। প্রবন্ধ, নিবন্ধও আছে। আছে রান্নাবান্নার বই। বলা যেতে পারে এবারের মেলায় থাকবে বৈচিত্র্যময় বইয়ের সমাহার।

নতুন কোনো লেখক আছে কি? তাদের সম্পর্কে কিছু বলুন...
নতুন লেখক বলে কিছু নেই। সবাই লেখক। তিনি হাসান আজিজুল হকের মতো অশীতিপর লেখকও হতে পারেন আবার তারুণ্যে ঝলমল লেখকও হতে পারেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে এমন কিছু লেখকের বই বের হচ্ছে যাদের আমরা নতুন বলি না। তারা দীর্ঘদিন যাবৎ লিখছেন। হয়তো বই বের হচ্ছে এই প্রথম। আমি তাদের মেধা ও মননের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি। আশা করি এই তারুণ্য একদিন সাহিত্য-সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হবেন।

পাঠকপ্রিয় লেখকদের মধ্যে বই আসছে মেলায়?
আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের প্রতিটি বই পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে আলী ইমাম, কাইজার চৌধুরী, ইমদাদুল হক মিলনরা পাঠকপ্রিয় লেখক, কিন্তু আমাদের প্রকাশিত প্রতিটি বই সারা দেশের মানুষ আগ্রহ নিয়ে পড়ে। মুদ্রণ সৌকর্যে অনন্য বলে এসব বই হাতে নিতে বাধ্য হয়।

আপনার প্রকাশনায় উল্লেখযোগ্য পাঁচটি বই?
আমাদের প্রকাশনীর অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে পাঁচটি হচ্ছে ১. মমতাময়ী ২. আত্মকথা ১৯৭১ ৩. বঙ্গবন্ধু : পয়েট অব পলিটিক্স ৭. ৭ই মার্চ : রেসকোর্স থেকে ইউনেসকো এবং ৫. বাংলাভাষা ও বানানের সহজ পাঠ। আমি এসব বইয়ের বিষয় বৈচিত্র্যের কথা বলতে চাই না। যে কথাটি বলতে চাই এসব বই যেমন ইতিহাসের আকরগ্রন্থ হিসেবে সমৃদ্ধ তেমনি মুদ্রণ সৌকর্যের দিক দিয়েও তা আকর্ষণীয়। পাঠক বলবে এসব বইয়ের বিষয় নির্বাচনে আমরা কী ভূমিকা নিয়েছি।

কত তারিখের মধ্যে সব বই বইমেলায় থাকবে?
বই মেলায় আসতে শুরু করেছে। আসতে থাকবে অবিরাম। তারিখ বলে কাউকে বিভ্রান্ত করতে চাই না।

 

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ২৩:৫৪ পি.এম