President

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার করতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হকিস্টিক, লাঠি, রড ইত্যাদি নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এতে সাংবাদিকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। তবে ছাত্রলীগ নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তারা উপাচার্যের ওপর হামলাকারীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের দাবি জানিয়েছেন।

ছাত্রলীগের হামলার বিচার, তাদের নামে দায়ের করা ভাংচুর মামলা প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবিতে মঙ্গলবার 'নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দে'র ব্যানারে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয় অবরোধ করে। এর আগে ঢাবি প্রশাসনকে ৪৮ কর্মঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল তারা; কিন্তু প্রশাসন তা মেনে নেয়নি। বামধারার ছাত্রসংগঠনগুলো এ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেয়।
দুপুর ১২টার দিকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অবস্থান করে শিক্ষার্থীরা। পরে সেখান থেকে তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি টিএসসি, কলাভবন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ঘুরে প্রশাসনিক ভবনে উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে আসার চেষ্টা করে। উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ সময় নিজ অফিসেই ছিলেন। প্রশাসনিক ভবনের গেট তালাবদ্ধ থাকায় তা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। পরে ভবনের ভেতরে থাকা পরপর আরও দুটি গেটও বন্ধ দেখতে পায় তারা। সেই দুটি গেটও ভেঙে উপাচার্যের কক্ষের সামনে পৌঁছে যায় তারা। এ সময় তারা উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। আন্দোলনকারীরা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা উপাচার্য ও প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

বিকেলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান একাডেমিক মিটিংয়ে যাওয়ার জন্য কক্ষ থেকে বের হলে আন্দোলনকারীরা তাকে ঘিরে ফেলে। এ সময় ভিসির পদত্যাগ চেয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয় আন্দোলনকারীরা। রুমের সামনে করিডোরে আধঘণ্টার বেশি উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখে তারা। পরে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি আবিদ আল হাসানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে তাকে উদ্ধার করে তার কার্যালয়ের নিয়ে যান।

এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল শাখার নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে আসার নির্দেশ দিলে বিভিন্ন হল থেকে কয়েকশ' নেতাকর্মী এসে পুরো প্রশাসনিক ভবন ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় তারা।

মারধরের মুখে শিক্ষার্থীরা সিনেট ভবনসংলগ্ন গেট, প্রধান ফটকসহ বিভিন্ন গেট গিয়ে বের হওয়ার সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা দফায় দফায় রড ও লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে। এ সময় ইট-পাটকেল, লাথি, কিল, ঘুষি মেরে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। প্রহারে অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় সাংবাদিকসহ প্রায় ৪০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র মাসুদ আল মাহাদী, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির, ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি তুহিন কান্তি দাস, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজীব কান্তি, সদস্য সোহাইল আহমেদ শুভ, রবিউল ইসলাম মিম, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ইভা মজুমদার, প্রগতি বর্মণ তমাসহ আরও অন্তত ৪০ জন আহত হন। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, তাদের শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।
শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কর্তব্যরত সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ছবি তুলতে গিয়ে আহত হন ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেনডেন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরশাদ, নিউ এজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি অরণ্য আরিফ, ডেইলি অবজারভারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আবদুল করিম, বাংলা ট্রিবিউনের রুবেল, বিডিনিউজের তপন কান্তি রায়সহ আরও অনেকে। তারা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার হন। তাদের মধ্যে আরশাদ ও অরণ্য আরিফকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তা ছাড়া কয়েকটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়।

প্রশাসন নিশ্চুপ: শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় নিশ্চুপ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসনের নিশ্চুপতায় ছাত্রলীগের মারধরের ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চরম লজ্জা ও অপমান হিসেবে দেখছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্লিপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

'ছাত্রলীগ হামলা করেনি': ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি আবিদ আল হাসান সমকালকে বলেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে উপাচার্যকে উদ্ধার করতে যায়। ছাত্রলীগ কারও ওপর হামলা করেনি। আর কেউ যদি সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা চেয়েছিলাম তারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন করুক। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুবই দুঃখজনক। প্রশাসন বিষয়টি দেখবে।'

ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন: ঘটনার পর পরই ক্যাম্পাসের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, আন্দোলনকারীরা আন্দোলনের নামে ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়েছে। তারা ভিসির ওপর হামলা করেছে। ভাংচুর চালিয়েছে। তিনি তাদের বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের দাবি জানান। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, আন্দোলনকারীরা নারী শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিকভাবে নিপীড়ন চালিয়েছে। তিনি মোবাইলে ছবি দেখিয়ে বলেন, বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা সাধারণ শিক্ষার্থী হন কী করে?

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

২৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:৫৪ এ.ম