President

সেদিন বেশ রাতে বাড়ি ফিরছিলাম। গাড়িটা একটা রাস্তার পাশে থেমে আছে, সিগন্যালিংয়ের কারণে। দেখি, কাপড় দিয়ে একটা কবরের সমান ঘর বানিয়ে একজন নারী সেখানে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে। অবাক হয়ে গেলাম। এই প্রচণ্ড শীতে এমন একটি ঘর কতটুকু তাপ ও নিরাপত্তা দেবে তাকে! ড্রাইভার বলে, এখানে এমন ঘর অনেক আছে। যখন বৃষ্টি পড়বে?

উত্তর দিল ড্রাইভার- ব্রিজের তলায় চলে যাবে। মানুষ আর পশুতে খুব বেশি কি পার্থক্য আছে?

জে কে রাওলিং বলেছেন- যে মারা গেছে তার দেখভাল নয়; যে বেঁচে আছে তার দেখভাল করো। তাহলে এই যে মানুষজন এমন একখানা ঘর বানিয়ে তার ভেতরে রাত কাটানোর চেষ্টা করছে, সেটা কি কেউ দেখছে না? এসবের কি কোনো সমাধান নেই?

আমি জানতে পারলাম, বর্তমান পৃথিবীতে কবরের স্থান কমে আসছে। একটা সমীক্ষায় এ কথা বলছে, বর্তমান পৃথিবীতে কবরের জমি তেমন আর নেই। ব্রিটেনে 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলেশন'-এর সময় সব মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসেছিল। গ্রামে যারা ছিল সেই সময়ে, তাদের স্থানীয় চার্চইয়ার্ডে কবর দেওয়া হতো। কিন্তু শহরে যখন অনেক লোকের আগমন হলো, তৈরি হলো মৃত মানুষদের অনেক কবরস্থান। এখন দেখা যাচ্ছে, এসব কবরে আর জায়গা নেই। নতুন কবরখানা তৈরি হয়েছে ও হচ্ছে। ব্রিটেনে কবর ও ক্রিমেশনের প্রধান টিম মরিস বলছেন, যদি অনেক ব্রিটিশ লোক ক্রিমেশন বেছে নেয় তারপরও দেখা যাচ্ছে, দিন দিন কবরের জায়গা কমে আসছে। যেমন লন্ডনের 'বরো অব টাওয়ার হ্যামলেটস' এবং 'হ্যাকনে'তে এখন আর নতুন কবর দেওয়ার জায়গা নেই। কাজেই এখানে কেউ মারা গেলে তাদের কবর দেওয়া হচ্ছে পাশের বরোতে। তিনি বলেন, কবরস্থানের জন্য নতুন জায়গা বের করা কষ্ট। এর সঙ্গে আছে পুরনো কবরগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব। ২০১৩ সালের সার্ভেতে বলা হয়েছে, ২০ বছরের ভেতর ব্রিটেনে শহরগুলোতে আর কবর দেওয়ার জায়গা থাকবে না। এর একটা সমাধান এই- পুরনো কবর থেকে হাড়-হাড্ডি তুলে সেখানে আবার নতুন করে কবর দেওয়া অথবা কবরের হাড়-হাড্ডিকে আরও গভীরে পুঁতে ফেলে সেখানে নতুন কবর দেওয়া। মারা যাওয়ার পর বছরের পর বছর কবর আঁকড়ে একজন পড়ে থাকবে- সেসব দিন বোধ করি শেষের পথে। শোনা যাচ্ছে, কিছুদিন পর আত্মীয়-স্বজনের কবর দর্শন নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। জার্মানিতে কবর কিনে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। কয়েক বছর পর হাড়-হাড্ডি তুলে সেখানে নতুন কবর দেওয়ার নিয়ম। স্পেন ও গ্রিসে মাটির ওপরে কোনো জায়গায় ছোট একটা খোপ বানিয়ে বছরের পর বছর সেখানে মৃতদেহ রাখা হয়। তার পর শরীর যখন পচে-গলে যায়, একটা জায়গায় গর্ত করে দেহ পুঁতে রাখা হয় এবং তা এক সময় মাটিতে মিশে যায়। ইসরায়েলে বহুতলা কবরের জায়গা থাকে মাটির নিচে। যদিও অনেক গোঁড়া জুয়িশ লোকজন বলেন- এটা ঠিক নয়। তবে কে শুনছে কার কথা! একে বলে 'স্কাই বেরিয়াল' বা শূন্যে সমাধি। বহুতলা কবর।

তবে পৃথিবীতে এখন ক্রিমেশন বা ইলেকট্রিক চুল্লিতে শরীর পোড়ানো অনেক বেশি জনপ্রিয়। সিঙ্গাপুরে এমনই ব্যবস্থা। পোড়াও, ছাই করো; তারপর সেই ছাই আত্মীয়-স্বজনকে দিয়ে দাও। ভারতেও একই অবস্থা। শরীর পুড়িয়ে ছাই করে ফেল। তারপর সেই ছাই পছন্দমতো জায়গায় ছিটিয়ে দাও। কিন্তু মুসলমান আর যেসব খ্রিষ্টান শেষ শয়ানে কবরে যায়, তাদের জায়গার এখন বড়ই অভাব।

আর একটি নতুন পদ্ধতির নাম 'রেসোমেশন'। এখানে মৃত শরীরকে পানি ও কেমিক্যালে গলিয়ে ফেলে কেবল এক মুঠো ছাই করা যায়। পটাসিয়াম হাইড্রোঅক্সাইড নামের কেমিক্যালে শরীরটাকে গলিয়ে ফেলা। সেখানে অনেক তাপে এক ঘণ্টা রাখা হয়। তারপর শরীর গলে তরল কিছু হয়ে যায়। শরীরটা এক সময় তরল পদার্থ হয়ে ওঠে আর মেরুদণ্ডের হাড় দিয়ে তখন সাদা পাউডার বানিয়ে যে চায় তাকে দেওয়া হয়। এভাবে শরীর পোড়ানো ঘটনাটি নাকি পরিবেশবান্ধব।

অনেকে আবার ছাইকে মাটিতে আরও কিছুর সঙ্গে পুঁতে ফেলে সেখানে একটা গাছের বিচি লাগিয়ে দেয়। একদিন সেই ছাই থেকে একটি গাছের জন্ম হয়। জাপানে এমন গাছ হয়ে ওঠা অনেকের বাসনা। মাটিতে জায়গা নেই; বিচি আর শরীরের ছাই একসঙ্গে পুঁতে গাছ বানানো। একে বলে 'ফরেস্ট বেরিয়াল'।

চীনে ৩০০০ কবরস্থানে ছয় বছর পর আর কোনো জায়গা থাকবে না। অন্যগুলোও তাই। ওখানে জীবিত ও মৃত মানুষের জায়গার সমস্যা। ওখানে একটি কবর কেনা প্রায় অসম্ভব। কারণ দাম গগনচুম্বী। কিছুদিন আগে এক ধনী ৩ দশমিক ৫ বিলিয়নে একখানা কবর কিনেছেন। ভদ্রলোক যদি নিজে ছাই হয়ে টাকাগুলো কোনো তৃতীয় বিশ্বে বিলিয়ে দিতেন, মন্দ হতো না। ওখানে সমুদ্রে শরীর-পোড়া ছাই ফেলতে টাকা দিতে হয়। একজনের জন্য ২০০০ ইয়ান। মেক্সিকোতে কবর থেকে মানুষ বা মানুষের অবশিষ্টাংশ, কফিন সব তুলে ব্যাগে ভরে তা পোড়ানো হয় আজকাল। ওখানে নতুন কবরের জন্য আর কোনো জায়গা নেই। এখন পৃথিবী এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কবরের জায়গা সংকট একটি জরুরি বিষয়। সিডনিতে মিলিয়ন মিলিয়ন কবরের জায়গা ২০৫০ সালের ভেতর শেষ হয়ে যাবে। তারপর?

এখন প্রশ্ন হলো, কবরের ভবিষ্যৎ কী?

একটাই- পুরনো কবর থেকে শরীর তুলে ফেলে দিয়ে সেখানে আবার নতুন করে কবর দেওয়া। যেহেতু আমরা আমাদের শরীর কেমিক্যালে গলাতে চাই না, ছাই করতে চাই না; তাহলে এই একমাত্র উপায়। বছরের পর বছর কবর আঁকড়ে, মুসোলিয়াম বানিয়ে থাকার দিন শেষ নয় কি? চির-ঘুমের জায়গা বলে একটা কবর চিরকাল থাকবে- তার কোনো মানে নেই। আর বন্ধুবান্ধব এসে কবরে ফুল দিয়ে যাবে, সেসব সুযোগও থাকবে না। বাড়িতেই সেই মৃত মানুষকে স্মরণ করতে হবে। সোনার তরীতে কি কোনো সুকৃতির ফসল আছে? হোক না সেসব নিয়ে আলোচনা।

বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা দেখব, এখন ইচ্ছা করলেই কেউ কবর কিনতে পারে না। কারণ কবর কিনে দীর্ঘদিন এক টুকরো মাটি আঁকড়ে কেউ বলবে- আমি এখন এখানে; তোমরা দেখে যাও; সেসব আর চলতে পারে না। কারণ, এমন বিলাসিতা করার মতো মাটি নেই। রোহিঙ্গারা এসেছে। জীবিত রোহিঙ্গাদের জায়গা দিতে হিমশিম। তারপর আবার মৃত রোহিঙ্গা! আমির মিয়া নামে ১৮ বছরের এক রোহিঙ্গা মর মর দাদাকে নিয়ে এসেছিল কবর দিতে। ওদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন কবরস্থান। শোনা যায়, সে জায়গা নাকি প্রায় পূর্ণ। এখন কোনো কোনো কবরে শোনা যায়, দুই-তিনজনকে একসঙ্গে কবর দিতে শুরু করেছে। এ থেকেই কি বোঝা যায় না- এখন মৃতদের নিয়ে ভাবনার চেয়ে জীবিতদের নিয়ে ভাবনা অনেক বেশি জরুরি?

সেই দিন তো আর নেই; মিসরের রাজারা মাইলের পর মাইল জায়গা নিয়ে পিরামিড বানিয়ে যত ধন-সম্পদ নিয়ে অপেক্ষা করছে পরবর্তী জীবনের জন্য। তখন জায়গার অভাব ছিল না। এখন এমন ঘটনা কে ভাবতে পারে?

যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, যারা বেঁচে আছেন তাদের জায়গা কোথায়? কবরের সমান ঘর বানিয়ে ঝড়-শীত-বৃষ্টিতে যারা রাত কাটায়? কবে হবে ওদের মাথার ওপরে একটু নিরাপদ ছাদ? ব্রিটেনে একজন মানুষকে তিনটি জিনিস দেবে বলে অঙ্গীকার করেছে সরকার- মাথার ওপরে ছাদ, খাবার এবং অসুখে চিকিৎসা। আর একটি জিনিস আছে; স্কুলের ফ্রি পড়াশোনা। আহা! ভাবতেও আনন্দ হয়, এমন ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে! পথের ধারে কেউ আর শীতে-কষ্টে জর্জরিত নয়। এসব কষ্টের সমাধান হলো আকাশে কবর বানানোর মতো আকাশে ছোট ছোট ঘর বানিয়ে ওদের জায়গা করে দেওয়া। 'স্কাই বেরিয়াল' শুধু নয়; 'স্কাই লিভিং'। কেউ কি কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসবেন? তা কি আদৌ সম্ভব হবে? পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কী আছে? কবরের আবার কত শ্রেণিবিভাগ- বুদ্ধিজীবীদের কবর, বড়লোকদের কবর, গরিবের কবর, বিনামূল্যের কবর। কেন? ওরা কি ওখানে সভা-সমিতি করবেন? আমি বলে যাব, যদি আমি এখানে মারা যাই; আমাকে এমন কবর দেবে যেন ছয় মাস পরে আমার হাড়-হাডিড মাটির সার হয়ে যায়। কিংবা আমি একটা গাছ হয়ে যাই। কিংবা আমার শরীরের সারে একটু ফসল সবুজ হোক।

লন্ডনে তোফাজ্জল হোসেন চেয়েছিলেন, ওখানে তার কবর হবে। যখন তাকে কবর দেওয়া হয় (২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে), সেটা ছিল নতুন কবরস্থান। একটি পার্ককে সদ্য কবরস্থান করা হয়েছিল। তোফাজ্জল হোসেনের কবরের এলাকাকে বলে 'টার্কিশ' এলাকা। সেই এলাকায় প্রথমে তিনি একা ছিলেন। এখন পাঁচ বছরে সেই জায়গা প্রায় ভর্তি। ওখানে তার পাশে আমার জায়গা কেনা আছে। সেটা ২৫ বছরের জন্য। ততদিনে পুরো কবরস্থান নিঃসন্দেহে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। ওখানকার কর্তৃপক্ষ বলল, কিছুদিন পর এমন করে আর কবর কেনা যাবে না।

ব্রিটেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

২০ জানুয়ারী, ২০১৮ ১৪:১৩ পি.এম