President

ট্রাম্প প্রশাসনের সাড়াশি অভিযানে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়া বাংলাদেশীদের জন্যে স্বস্তির বার্তা দিলেন নিউইয়র্কের ইমিগ্রেশন এটর্নিরা। মূলধারার রাজনীতিক ও খ্যাতনামা আইনজীবী মোহাম্মদ এন মজুমদার ও ইয়াকুব এ খান সিপিএর সার্বিক সহায়তায় ১৯ জানুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এক সেমিনার থেকে অভিবাসনের মর্যাদা নিয়ে সংকটে থাকা বাংলাদেশীদের নানা পরামর্শ দেয়া হয়। অভিবাসন-আইনে বিশেষভাবে পারদর্শী এটর্নি ব্যতিত অন্য কারোর কথায় যেন নিজের বিপদ কেউ ত্বরান্বিত না করেন- সে অনুরোধও জানানো হয় এ সেমিনার থেকে। 
 
ধর-পাকড় এড়াতে অভিজ্ঞ এটর্নির পরামর্শক্রমে চলাফেরা করার পাশাপাশি পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে কিংবা চলতি পথে থামাতে পারে এমন কোন কাজ অথবা আচরণ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক আইন লংঘন করা যাবে না কিংবা সভা-সমাবেশে কোন হাঙ্গামায় লিপ্ত হওয়াও চলবে না। স্বামী/স্ত্রীর মধ্যে ঝড়গাঝাটিও পরিহার করতে হবে। অভিবাসনের এজেন্টরা দরজায় নক করলেও তা খোলা যাবে না। ভেতর থেকেই কথা বলতে হবে এবং নিযুক্ত এটর্নির পরামর্শ ব্যতিত দরজা খোলা হবে না বলে এজেন্টদের জানাতে হবে। 
 
এ সেমিনারে প্যানেলিস্টদের মধ্যে ছিলেন এটর্নি ব্যারি সিলভারওয়াইজ, এটর্নি কেন সিলভারম্যান, এটর্নি ফেরদৌসী চৌধুরী, এটর্নি মার্ক লেভিনসন এবং ইন্যুরেন্স-এক্সপার্ট শাহ নেওয়াজ। 
 
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ অনুযায়ী হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের এজেন্টরা মাঠে নেমেছে অভিবাসনের মর্যাদাহীনদের গ্রেফতারের জন্য। এমনকি অভিবাসন কোর্টের শুনানীতে অংশ নিতে গিয়েও শত শত বাংলাদেশী গত এক বছরে গ্রেফতার হয়েছেন এবং এর অধিকাংশকেই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় কয়েক সপ্তাহ ধরেই নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া, ভার্জিনিয়া, মিশিগান, টেক্সাস, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা প্রভৃতি অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশিসহ অভিবাসী সমাজে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা চরমে উঠেছে। 
 
নিউইয়র্ক, লসএঞ্জেলেস, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, টেক্সাস, নিউজার্সি প্রভৃতি এলাকা থেকে গ্রেফতার হওয়া অবৈধ অভিবাসীর প্রায় সকলেরই স্ত্রী ও সন্তান রয়েছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এ অবস্থায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়ায় স্ত্রী-সন্তানেরা অনিশ্চিত জীবনে হা-হুতাশ করছেন। এ প্রসঙ্গে আইনজীবী মোহাম্মদ এন মজুমদার এবং কম্যুনিটি এ্যাক্টিভিস্ট মাজেদা এ উদ্দিন পৃথক পৃথকভাবে এ সংবাদদাতাকে বলেন, ‘অভিবাসনের আইন লংঘন ব্যতিত অন্য কোন অপরাধ না করেও অসংখ্য বাংলাদেশী ডিটেনশন সেন্টারে রয়েছেন। তাদেরকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এসব প্রবাসীর সন্তানেরা ডুকরে কাঁদছেন। এদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হলেও হৃদয় গলছে না ট্রাম্পের। 
 
মাজেদা এ উদ্দিন জানান, গত বুধবার নিউজার্সির ব্লুমফিল্ডে নিজ কর্মস্থল থেকে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশি আমিনুল হক। গত ১০ জানুয়ারি নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে ফেডারেল প্লাজায় নিয়মিত হাজিরা দেওয়ার সময় গ্রেফতার হন জ্যামাইকার অধিবাসী কাজী আজাদ আরজু। 
 
ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্ট তথা আইসের এই গ্রেফতার অভিযানে সর্বত্রই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগের সপ্তাহে ২১ অঙ্গরাজ্যে ‘সেভেন-ইলেভেন’ স্টোরে অভিযান চালিয়ে ২১ অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতারের ঘটনায় আতংক আরো বেড়েছে।
 
নিউজার্সি থেকে আটক আমিনুল হকের স্ত্রী রোজিনা আক্তারের উদ্ধৃতি দিয়ে মাজেদা উদ্দিন বলেন, ‘বুধবার আইসের এজেন্টরা বাসায় এসে তার স্বামীর খোঁজ করে। তিনি তখন বাসায় ছিলেন না। ওইদিনই পুলিশ তার কর্মক্ষেত্র ন্যুয়ার্কের ব্লুমফিল্ড এলাকায় ফ্রাইড চিকেনে গিয়ে সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করে।’
 
আমিনুল হকের এক মেয়ে, দুই ছেলে। বড় মেয়ে ইভানার বয়স ১৯ বছর। সে ইউনিয়ন কাউন্টি কলেজে পড়ছে। একটি ফার্মেসিতে খন্ডকালীন কাজও করছে ইভানা। কিন্তু বাবার গ্রেফতারে তার ভবিষ্যত এখন অনিশ্চয়তার মুখে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে গ্রেফতার করায় তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন রোজিনা আক্তার।
 
আমিনুল হক ২০০৪ সালে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। এরপর এখানে তার ছোট ছেলের জন্ম হয়। আমিনুল হকের ডিপোর্টেশন অর্ডার হওয়ার পর প্রথম দফায় গ্রেফতার হয়েছিলেন ২০১০ সালে। তখন ১১ মাস ডিটেনশনে কাটিয়ে মুক্তি পান তিনি।
 
এদিকে, নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী কাজী আজাদ আরজু পূর্বনির্দ্ধারিত তারিখ গত ১০ জানুয়ারি ইমিগ্রেশন কোর্টে গিয়েছিলেন হাজিরা দিতে। সেখানে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
 
কাজী আরজুর স্ত্রী উম্মে হানি লুবনা জানান, ফেডারেল প্লাজায় হাজিরা দিতে গেলে ইমিগ্রেশন পুলিশ আরজুকে গ্রেফতার করে। লুবনা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার স্বামীর ডিপোর্টেশন অর্ডার ছিল। কিন্তু তিনি ইমিগ্রেশন কোর্টে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছিলেন।
 
কাজী আরজু ২৫ বছর ধরে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তারা সবাই যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেছে। 
 
আইসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২০ জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আড়াই লাখ অবৈধ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশীর সংখ্যা হাজারখানেক হবে। এছাড়া, গ্রেফতার ও বহিষ্কারের আতংকে আরো ৫/৬ হাজার বাংলাদেশী স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন। এদের অনেকেই পাড়ি দিয়েছেন কানাডায়। 
 
ভীত-সন্ত্রস্তদের অভয় দিয়ে খ্যাতনামা এটর্নি মঈন চৌধুরী বলেছেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশনের নির্দেশ রয়েছে তারা যেন চলাফেরায় সতর্ক থাকেন। সব সময় যেন নিজ নিজ এটর্নির সেলফোন নম্বর সাথে রাখেন। ইমিগ্রেশন আইনে অভিজ্ঞ নন-এমন কারোর পরামর্শ মত যেন কোন পদক্ষেপ তারা না নেন। কারণ, মানুষের এই বিপদেও অনেক বাজে লোক মাঠে নেমেছে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্যে।’
 
টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে

২০ জানুয়ারী, ২০১৮ ১৩:৫৭ পি.এম