President

সৎ, ত্যাগী ও নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিকদের কী অবস্থা হচ্ছে, বাংলাদেশে চোখে অাঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সাবেক এমপি মুহম্মদ ইউসুফ। তিনি ১৯৫০ সালে রাঙ্গুনিয়ার মরিয়ম নগর ইউনিয়নের মরিয়ম নগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।শৈশবে মরিয়ম নগর আলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন মরিয়ম নগর উচ্চ বিদ্যালয়ে। দুই বছর পর ওখান হতে গিয়ে রাঙ্গুনিয়া আদর্শ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৮ সালে মুহম্মদ ইউসুফ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।অতঃপর তিনি রাঙ্গুনিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও কলেজ ছাত্র সংসদের ভি,পি নির্বাচিত হন।স্বাধীনতা যুদ্ধের সমুখ সমরের একজন সাহসী যোদ্ধা ছিলেন তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ স্বাধীনতার পর যুক্ত হন শ্রমিক রাজনীতিতে। ১৯৭৪-৭৫ সালে দাউদ-ফোরাত জুট মিলে সিবিএ র সাধারন সম্পাদক ছিলেন।শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ব্যয় করেছেন তার সমগ্র যৌবন। তিনি ছিলেন কমিউনিষ্ট পার্টির একজন গুরুত্ব পূর্ন ও নিবেদিত প্রাণ নেতা। পরবর্তি সময়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষীয় রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নেবার বৃহৎ চিন্তায় তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৭০ হতে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত মুহম্মদ ইউসুফ ছিলেন গণমানুষের অধিকার আদায়ের রাজপথ কাঁপানো সৈনিক। নিবেদিত প্রাণ এই রাজনীতির মানুষটি রাজনীতিকে এতটাই ভালবেসেছিলেন যে তার নিজের সংসার জীবন করা হয়ে উঠল না। তিনি থেকে গেলেন চিরকুমার।

লোভ, লালসা ও আত্মপ্রতিষ্ঠাকে দূরে ঠেলে শুধু দেশকে ও দেশের মানুষকেই ভালবেসেছিলেন তিনি। মানুষও তার ভালবাসার মূল্য দিয়েছিল। ১৯৯১ সালে সালাহ উদ্দীন কাদের চৌধুরীর ভাই গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের এন,ডি,পির নেতা। মুহম্মদ ইউসুফ ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটের কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা। ৮ দলীয় জোটের নির্বাচনী প্রতীক ছিল নৌকা।

মুহম্মদ ইউসুফ ২০০৭ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তার শরীরের একটি অংশ অবশ হয়ে যায় ও পঁচন ধরে তার পায়ে। ছোট ভাই সেকান্দার চা বিক্রি করে। তার এই চা বিক্রির স্বল্প আয় দিয়েই চিরকুমার বড় ভাইয়ের ওষুধ পথ্য ও আহার জুটানোর প্রাণান্ত সংগ্রাম করে চলেছে সে ১৭ টি বছর ধরে। ১৯৯১ এর নির্বাচনই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় পাঠানোর ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। এরপর পুনরায় ক্ষমতায় আসে ২০০৮ সালে ও ২০১৪ সালে। এই বিভিন্ন মেয়াদে যারা ক্ষমতায় এসেছে তারা কেউ কি মুহম্মদ ইউসুফের খবর নিয়েছে?

চট্টগ্রামের দলীয় নেতা ও সংসদ সদস্যরাও যদি ইউসুফের পাশে দাঁড়াতো তার এই করুণ হাল হতো না। সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে তিনি অবশ্যই সুস্থ হতেন। কেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রধান মন্ত্রীকে তার ব্যাপারে জানতে হল? চট্টগ্রামে কি দলীয় নেতা নেই? সংসদ সদস্য নেই? সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি না হলে ইউসুফের খবর প্রধান মন্ত্রী জানতেন না আর তিনি নিরবে মরে যেতেন। তখন হয়তো কেউ জানতো না যে ইউসুফ নামের একজন এমপি ছিল। তাও সুদিনের নয় দূর্দিনের এমপি। কারণ ১৯৯১ সালে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। এই দূর্দিনের সাথীরাই লেগে পড়ে থেকে দলকে পৌঁছে দেয় সুদিনে,তাই নয় কি?

ইউসুফের চিকিৎসার দায়ভার শুধু প্রধানমন্ত্রীকেই কেন নিতে হল? জাতীয় সংসদের সকল এমপিরা কেন নিতে পারল না? অনেক এমপি, মন্ত্রীকে দেখা যায় সামান্য অসুখ হলেই চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাড়ি জমাতে। আর একজন সাবেক এমপি অনাহারে অনিদ্রায় দেশের মাটিতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে! এ লজ্জা কি সকল এমপিদের নয়?

একজন এমপির সহকারীকেও দেখা যায় বাড়ি,গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হতে। রাতারাতি অবস্থা পাল্টে যায় তাদের। আর ৫ বছর এমপি থেকেও ইউসুফের আজ কিছুই নেই। এই যদি হয় সৎ রাজনীতিকের পরিণতি তাহলে কেন সততার আদর্শে পরিচালিত হতে চাইবে মানুষ? রাজনীতি যেন আজ আত্মপ্রতিষ্ঠার অন্যতম বাহন হয়ে উঠছে। টাকা দিয়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার কথাও শোনা যায়। এগিয়ে আসছে ব্যবসায়ী ও আমলারা। পিছিয়ে যাচ্ছে আদর্শিক ধারার রাজনীতিকরা। সরকারী চাকরি করে অবসরে গিয়ে হয়ে যাচ্ছে মন্ত্রী, এমপি। ব্যবসা করে টাকার কুমির হয়ে অনেককেই ছুটতে দেখা যায় দলীয় মনোনয়নের টিকেট পেতে। আর নিবেদিত প্রাণ ত্যাগী নেতা কর্মীরাও তখন দলীয় স্বার্থে বাধ্য হয় এসব আমলা ও ব্যবসায়ীদের নামেই জয়ধ্বনি দিতে।

বাংলাদেশের রাজনীতি কি ফিরে আসবে রাজনীতিকদের হাতে? আমলা,ব্যবসায়ী ও ডিগবাজ সুবিধাভোগীদের পিছে ফেলে যতদিন পর্যন্ত ত্যাগী ও নিবেদিত প্রাণ রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে রাজনীতি না আসবে ততদিন পর্যন্ত রাজনীতি রাজনৈতিক নীতি আদর্শের ধারায় পরিচালিত হতে পারবে না। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সাবেক এমপি ইউসুফ সে বার্তাই যেন দৃশ্যমান করে দিয়ে গেল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এর থেকে শিক্ষা নেয়া ও করণীয় ঠিক করা।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

০৯ জানুয়ারী, ২০১৮ ১৩:০৩ পি.এম