President

পরিবার মানবসমাজের মূল ভিত্তি। একটি সমাজের শান্তি, শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা বহুলাংশে নির্ভরশীল সুষ্ঠু সুশৃঙ্খল পরিবারের ওপর। তাই সভ্যতার উষালগ্ন হতেই সমাজবিজ্ঞানীরা পারিবারিক জীবনের সুস্থতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে আসছেন। সুখ, শান্তি ও মানবতার কল্যাণের কালজয়ী ধর্ম ইসলামে জীবনের সকল দিকের ন্যায় পারিবারিক জীবনের ক্ষেত্রেও রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। একজন মুসলিমের সতত সাধনা থাকে তার সমস্ত জীবন ইসলামের আলোকে অতিবাহিত করা। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন ইসলামী শিক্ষার আলোকে পরিচালিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। যাতে সে দীন ও দুনিয়ায় কামিয়াব হয় এবং তার জীবন যেন সুখ-স্বাচ্ছন্দে ভরে ওঠে। এক্ষেত্রে যদি আমরা আমাদের পরিবারগুলোকে ইসলামী শিক্ষাও বৈশিষ্ট্য দ্বারা পরিপূর্ণ করি তাহলে তা সুখশান্তি ও নিরাপত্তার পূর্ণ বলয়ে পরিণত হবে। তাহলে আমাদের সন্তানরাও ইসলামী শিক্ষার ওপর বেড়ে উঠবে। এমনকি আমরা আমাদের পরিবারকে ইসলামী দাওয়াতের কেন্দ্র হিসেবেও গড়তে পারি।

একজন মুসলিমের পারিবারিক জীবনে ঘর আল্লাহর অনেক বড় একটি নেয়ামত। ঘর থেকেই মানুষের জীবন হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়। রাস্তাঘাট, ফুটপাত রেললাইনের পাশে বসবাসকারী মানুষের দিকে তাকালেই আমরা মুহূর্তেই তা বুঝতে পারি। একজন কীভাবে তার ঘরে প্রবেশ করবে, ঘর হতে বের হবে, ঘরের জিনিসপত্র কীভাবে রাখবে তার বিশদ বিবরণ রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে।

১. বাড়িতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় বিসমিল্লাহ্ বলা

বাড়িতে প্রবেশ ও বের হওয়ার কিছু সুন্নত আদব আছে। যা পালন করলে শয়তানের কবল হতে হেফাজত থাকে। দুনিয়াবি বিভিন্ন ফিতনা-ফাসাদ ও অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকা যায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার ঘরে প্রবেশকালে এবং খাবার গ্রহণকালে আল্লাহর নামে স্মরণ করলে শয়তান (তার সংগীদের) বলে তোমাদের রাত্রিযাপন ও আহারের কোনো ব্যবস্থ হল না।’ (সহিহ মুসলিম)

২. গৃহে প্রবেশের পূর্বে অনুমতি নেয়া ও সালাম দেয়া

ব্যক্তি কারো ঘরে প্রবেশের পূর্বে সালাম দিয়ে অনুমতি প্রার্থনা করবে। অনুমতি দিলে গৃহে প্রবেশ করবে। ব্যক্তি তার ঘরে বাইরে সর্বত্র সালামের প্রচলন করবে। কারণ সালাম ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর দ্বারা পরস্পরের হৃদতা ও ভালোবাসা বৃদ্বি পায়। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ নিজেদের ঘর ব্যতীত অন্যের ঘরে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং এর অধিবাসীদের সালাম দেবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।’ (সূরা নূর, আয়াত ২৭)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তিন ব্যক্তি আল্লাহর জিম্মায় থাকে। যদি তারা বেঁচে থাকে তাহলে রিজিকপ্রাপ্ত হয় এবং যথেষ্ট হয়। আর যদি মারা যায় তবে জান্নাতে প্রবেশ করে : ১. যে ব্যক্তি বাড়িতে প্রবেশ করে বাড়ির লোকদের সালাম দেয়, সে আল্লাহর জিম্মায়। ২. যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বের হয়, সে আল্লাহর জিম্মায়, যে ব্যক্তি মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হয়, সে আল্লাহর জিম্মায়।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান)

৩. পরিবারের সদস্যদের ধার্মিক হিসেবে গড়ে তোলা

মুসলিম পরিবারের প্রতিটি সদস্যই ইসলামের বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করবে। একটি পরিবারকে যথার্থ ইসলামী পরিবার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি নারী ও পুরুষ তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করবে। পুরুষরা জামাতের সঙ্গে ফরজ সালাত গুলো আদায় করবে। নারীরা বাড়িতে সালাতগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় করবে। পরিবারের সদস্যদের ছোটবেলা থেকে সালাত আদায়ে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে নামাজের শিক্ষা প্রদান যখন তাদের বয়স সাত বছর হবে। আর দশ বছর বয়স হলে (নামাজ না পড়ার কারণে) তাদেরকে শাসন কর এবং বিছানা পৃথক করে দাও।’ (মুসনাদে আহমাদ)

পরিবারের যিনি অভিভাবক তিনি অবশ্যই নারীরা যেন সঠিকভাবে পালন করে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করেছেন : ১. মদ্যপায়ী ২. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং ৩. যে নিজ পরিবারের মধ্যে বেহায়াপনাকে জিইয়ে রাখে। (মিশকাত, মুসনাদে আহমাদ)

৪. সুন্নত নামাজ বাড়িতে আদায় করা

সুন্নত-নফল সালাত ঘরেই আদায় করাই উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ সালাত মসজিদে আদায় করে তখন তার উচিত সে যেন ঘরে কিছু সালাত আদায় করে। কেননা নিজ ঘরে সালাত আদায়ের কারণে আল্লাহ তার ঘরে কল্যাণ ও বরকত দান করবেন।’ (সহিহ মুসলিম)। তাই আমাদের বাড়িকে কল্যাণকর ও বরকতময় করার একটি মাধ্যম হচ্ছে সুন্নত ও নফল সালাত বাড়িতে আদায় করা।

৫. ঘরে ছবি বা মূর্তি না ঝুলানো

ছবি ও মূর্তি ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই এসব হতে ঘরবাড়িমুক্ত রাখা মুমিনের কর্তব্য। দেয়ালে নিজের, মাতা-পিতা, প্রিয় ব্যক্তিদের ছবি ঝুলানো থাকে। কখনো তার প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য স্থান পায় মুসলমানের ঘরে। এমনকি শোভাবর্ধনের প্রাণীমূর্তির শোপিচ সাজানো থাকে শোকেসে, আলমারিতে। এসবের জন্য যেমন ঘরে বরকত থাকে না তেমনি পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ঘরে কুকুর ও ছবি থাকে সে ঘরে (রহমত ও বরকতের) ফেরেশতা প্রবেশ করে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)

৬. ঘরে বাদ্যযন্ত্র না রাখা

এখন ইসলামী জীবনযাপনে যেসব উপাদান অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাদ্যযন্ত্র। মোবাইল, কম্পিউটার, টেলিভিশন ইত্যাদির ব্যবহার একদিকে যেমন জীবনযাত্রাকে অত্যন্ত সহজ করেছে। তেমনি এর অপব্যবহারে দিনদিন মানুষের অবৈধ গানবাজনা শোনার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অথচ শরিয়ত অননুমোদিত গানবাজনা পাপের মূল। এর মাধ্যমে অন্তরে মুনাফিকি পয়দা হয় এবং এটি খারাপ কাজ বৃদ্বির একটি অন্যতম উৎস। আমাদের করণীয় হল এসব আবিস্কারকে বৈধ কাজে ব্যবহার করা এবং পাপকাজে ব্যবহার থেকে বিরত থাকা। সৌজন্যে- পরিবর্তন

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৪:২২ পি.এম