President

ড. আবদুল মুহসিন ইবন মুহাম্মদ আল কাসেম। মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব। বৃহস্পতিবার (০৬ এপ্রিল) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক অায়োজিত উলামা-মাশায়েখ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। মসজিদের নববীর ইমামের ভাষণটি বাংলানিউজের পাঠকের জন্য অনুবাদ করেছেন- আবদুল্লাহ আল ফারুক

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
আমি আল্লাহর প্রশংসা আদায় করছি। তিনি আজকের এই বরকতময় দিনে আপনাদের সঙ্গে আমাদেরকে একত্র করেছেন। আজকের এই দিনটিতে ইসলামের আলোকিত অবয়ব ফুটে ওঠেছে। আজকের এই সম্মেলন ইসলামি সৌভ্রাতৃত্ব ও মুসলিমসূলভ সৌহার্দ্যরে পরিচয় বহন করে।

প্রিয় সুধী! ইসলাম বস্তুনিষ্ঠ সৌভ্রাতৃত্বের ধর্ম। ইসলাম কখনই দেশ, জাতীয়তা ও ভাষার ভিত্তিতে বৈষম্য করার অনুমতি দেয় না। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে এমন মহান ধর্মের অনুসারী করেছেন। এই ইসলামের মাঝে পৃথিবীর অন্যসব ধর্মের যাবতীয় সৌন্দর্য্য ও মাধুর্যের সন্নিবেশ ঘটেছে।

ইসলামের কল্যাণে আমরা সবধর্মের পরিপূরক ও সম্পূরক সৌকর্য ধারণ করতে পেরেছি। আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামসম্মত পদ্ধতিতে ইবাদত করার নির্দেশ করেছেন। ইসলাম এমন এক ধর্ম, যার মাঝে মানবিকতার শতভাগ প্রকাশ ঘটেছে। মানবধর্ম ইসলামের মাঝেই সৃষ্টিরহস্যের চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে। পৃথিবীর সর্বশ্রেণির মানসিকতার সঙ্গে ইসলাম শতভাগ সঙ্গতিপূর্ণ। কোরআনে কারিমে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘এটাই আল্লাহতায়ালার প্রকৃতি, যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন।’ -সূরা আর রুম: ৩০

ইসলামের মাঝে মানবজীবনের সব বিষয়ের পূর্ণ সংবিধান রয়েছে। ইসলাম সুষ্ঠু লেনদেনের কথা বলে। ইসলাম উন্নত চরিত্র ও সুউচ্চ নৈতিকতার কথা বলে।

ইসলাম ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে কার্যকর ধর্ম। ইসলাম আমাদেরকে ইহকালীন জীবনে সৌভাগ্য ও পরকালীন জীবনে চিরস্থায়ী নেয়ামতের নির্দেশ করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, যে সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং সে ঈমানদার ‘পুরুষ হোক কিংবা নারী’ আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করবো এবং প্রতিদানে তাদেরকে তাদের উত্তম কাজের কারণে প্রাপ্য পুরষ্কার দেবো যা তারা করতো। -সূরা নাহল: ৯৭

আমাদের ধর্ম ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানচর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করে। প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম যে আয়াত অবতীর্ণ হয় সেখানে আল্লাহ নির্দেশ করেছেন, ‘হে রাসূল! আপনি পড়ুন আপনার সেই রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’


যে ব্যক্তি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করবে মহান আল্লাহ তাকে সম্মানিত করার অঙ্গীকার করেছেন। তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের সঙ্গে এ অঙ্গীকার করছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে।’ -সূরা নূর: ৫৫

ইসলাম এমন এক ধর্ম যা সর্বযুগে সর্বস্থানে কার্যকর। যে কোনো পরিবেশে, যে কোনো সমাজে ইসলাম শতভাগ কার্যকর। পৃথিবী যতোই অগ্রসর হোক, জাতিসত্তার যতোই উন্মেষ ঘটুক, ইসলামের আবেদন কখনই ক্ষুন্ন হবে না। ইসলামের যৌক্তিকতা ও কার্যকরিতা প্রতিনিয়ত প্রমাণিত হয়ে চলেছে। মানবতা সর্বযুগে ইসলামের কাছে ঋণী।

ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের যেই তকমা ইসলামের ওপর আরোপ করার অপচেষ্টা চলছে, তার সঙ্গে ইসলামের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। ইসলামের শূভ্র বদনে কালিমা লেপনের মাধ্যমে তার মহান আহ্বান বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চলছে। অথচ এই ইসলাম পৃথিবীর সব মানুষকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার কথা বলে। ইসলাম মানবতার জয়গানের কথা বলে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদেরকে অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।’ -সূরা ইসরা: ৭০

ইসলাম ভালোবাসা, সম্প্রীতি, সামাজিকতা ও দয়ার ধর্ম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ পরস্পরে ভাই।’ ইসলাম আমাদেরকে সবধরনের বৈষম্য ও বিবাদের ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানায়। ইসলাম অন্যকে মানসিক প্রশান্তি প্রদানের কথা বলে। ইসলাম আমাদেরকে পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব পোষণের কথা বলে। ইসলাম আমাদেরকে উদ্যমী ও কর্মচঞ্চল হওয়ার কথা বলে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘শক্তিশালী ও কর্মক্ষম মুমিন কল্যাণকর। দুর্বল মুমিন অপেক্ষা সেই মহান আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।’

ইসলাম আমাদেরকে সংকীর্ণতা ও বিবাদ-কলহ ত্যাগ করার কথা বলে। ইসলামি শরিয়তের মাঝে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা নেই। যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো সময় ইসলাম শেখার অধিকার রাখেন। ইসলাম অত্যন্ত সহজ ধর্ম। প্রত্যেকের জন্যে ইসলাম অনুসরণ করা অত্যন্ত সহজ। ইসলাম সামাজিকতার ধর্ম। ইসলামের দুয়ার পৃথিবীর সব মানুষের জন্যে সবসময় উন্মুক্ত। ইসলাম সবাইকে তার ছায়াতলে আপন করে নেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো।’ 

ইসলাম আমাদেরকে বিবেক-বুদ্ধি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও নৈতিকতার সদ্ব্যবহারের কথা বলে। ইসলাম সবাইকে উন্নত চরিত্রের অধিকারী হওয়ার কথা বলে। আল্লাহ বলেন, ‘ক্ষমা অবলম্বন করুন। সৎকাজের নির্দেশ করুন। আর অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’

ইসলাম আমাদেরকে সবসময় সুন্দর কথা বলার নির্দেশ করে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা মানুষকে সুন্দর কথা বলো।’ ইসলাম সবার মেধা-বুদ্ধি ও সম্পত্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বহন করে। ইসলাম অন্যের বিপদে, সঙ্কটে, দুঃসময়ে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করে।


আমাদের ধর্ম ইসলাম সৃষ্টির প্রতি দয়ার কথা বলে। অন্যের কল্যাণে এগিয়ে আসার কথা বলে। ইসলাম বলে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বন্ধন গভীর করতে হবে। এই ইবাদত বান্দার জন্যে রিজিকের দুয়ার খুলে দেবে। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবে। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে পিতা-মাতার আনুগত্য করার নির্দেশ করে।

ইসলাম প্রতিবেশীকে সম্মান করার কথা বলে। ইসলাম আমাদেরকে লজ্জা, শালীনতা, প্রজ্ঞা, বদান্যতা, আত্মসম্মানবোধ, যৌক্তিক মৌনতা ও সুষ্ঠু কর্মকৌশল অনুসরণ করার নির্দেশ করে। ইসলাম বিশ্বস্ততা, অঙ্গীকার রক্ষা, লেনদেন সুচারুরূপে সম্পন্ন করা, অন্যের প্রতি সুধারণা রাখা, প্রতিটি কাজ ধীরে-সুস্থে সম্পন্ন করার নির্দেশ করে। ইসলাম জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের কথা বলে। সমাজের অনাথ ও বিধবাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে। ইসলাম প্রতিটি কাজ মহান আল্লাহর শোকরিয়া, শ্রদ্ধা, ভয় ও আশার সঙ্গে পালন করার নির্দেশ করে।

এটাই একজন মুসলমানের ধর্ম। প্রতিটি ঈমানদার এ কথাগুলোই বিশ্বাস করে। কারণ, ইসলাম এমন এক ধর্ম- যা আমাদেরকে যাবতীয় নৈতিকতা ও চরিত্রমাধুরিমার অধিকারী হওয়ার নির্দেশ করে। অন্যের প্রতি দয়া করার কথা বলে। ইসলাম আমাদেরকে একটি সম্মিলিত সমাজ নির্মাণের নির্দেশ করে। ইসলাম নেতৃবৃন্দকে বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলে।

আজকের এই আনন্দমুখর মহান দিনটিতে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে আপনাদের সঙ্গে একত্র হতে পেরে আমি মহান আল্লাহর শোকর আদায় করছি। হারামাইন শরীফাইনের মহামান্য সেবক এবং বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্রাতৃপ্রতীম দুটি দেশের জনগণের মাঝে সৌহার্দ্য গড়ে তোলার যেই উদ্যোগ নিয়েছেন, তা অভিবাদনযোগ্য। মহান আল্লাহ তাদেরকে এর উত্তম বিনিময় দিন।

অমি এই সম্মেলনের সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা ও আপনাদের আন্তরিক আতিথেয়তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি- তিনি আমাদেরকে হেদায়েতের সরল পথে পরিচালিত করুন। আমাদেরকে খাঁটি মুমিন হওয়ার তওফিক দিন। 

আলোচনার শেষপ্রান্তে এসে আমি আরেকবার মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি। প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পরিবার-সহচরবৃন্দের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আস সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

০৮ এপ্রিল, ২০১৭ ১৯:২০ পি.এম