President

যান্ত্রিক সভ্যতার মানুষসকল যখন কর্ম ব্যস্ততায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে এবং অবসরে কিংবা কোনো অবকাশে যখন একটু ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ আসে তখন তারা কিছুটা অন্য রকম আনন্দের ছোঁয়া পায়।
ঢাকার নিকটবর্তী সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে চলা এমন একটি ঘুরে আসার মতো গ্রাম সাদুল্লাহপুর। তুরাগ নদের তীরবর্তী সবুজ দ্বীপে ছায়াঘেরা পথ, লাল মাটির দেশ, দিগন্তজোরা মাঠ, পাখির কলকাকলি আর নির্জীবতায় আচ্ছন্ন নিরেট গ্রামটি যেকোনো শহরবাসীর মুহূর্তেই মন কেড়ে নিতে পারার মতো একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে বিশাল বৃক্ষের ছায়া সুনিবিড় রূপ, বর্ষায় অঝর বারিধারায় সবুজের সমারোহ আর শীতের কুয়াশায় গ্রামটির চাদরমুরির শ্রী ফুটে ওঠে বছরজুড়ে। গ্রামের লাল মাটির বিস্তৃত বাগানের ফুলের সৌরভের মাঝ দিয়ে এলোমেলো পথ বেঁয়ে চললে আর মনের সবচিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করলে মিলবে প্রশান্তি।

সকাল সকাল ডিঙায় চড়ে জেলেরা খাল-বিল থেকে কখনো নদী থেকে মাছ ধরে এখানের স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করে থাকেন। ট্যাংরা, খলিশা, পুঁটি, শোল, চিংড়িকুচো, বাইন এ সকল মাছ ছাড়াও নানান ঋতুর সাজি ভরা সতেজ সবজি ওঠে বাজারে। চাইলে কিনে নিতে পারেন অনেক সস্তায়, হাতের নাগালে।

এই গ্রামে প্রবেশের সূচনালগ্নে পাকা পিচ ঢালাই রাস্তা দিয়ে চললে দুপাশ দিয়ে মিলবে ফুলবাগান আর বসতবাড়ি। বিস্তৃত মাঠ, মাঠের পাশে মজা পুকুর, পুকুরে সবুজ পাতার মাঝে শুভ্রবেগুনি কচুরিফুলের হাসি, কালচে জলে হাঁসের জলকেলি আর মিষ্টি রোদ জড়ানো চোখে-মুখে উৎসাহ নিয়ে চলতে পারেন গ্রামের ভেতরে । গ্রামবাসীরা যথেষ্ট সহজ সরল। জানা-অজানার নানান প্রশ্নের সমাধান রয়েছে তাদের দীর্ঘ দিন এখানে বসবাসের কারণে। এখানে শীতের সময় অবশ্য নদীর পানি কমে গিয়ে সর্পিল আঁকাবাঁকা নদীরেখা তৈরি হয় আর তাতে জেলেদের মাছ ধরা দৃশ্য আপনার সামনে কিছুটা হলেও আবহমান গ্রাম বাংলার রূপ তুলে ধরবে।

এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে হয়তো জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার কবিতার চরণগুলি আপনার চোখের সামনে ভেসে আসবে, কখনোবা মনের কোণে। ঘাটের নৌকাবাঁধা সারি সারি, বিশাল বটের ছায়ায় গ্রামবাসীর বিশ্রাম নেয়া বা ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের শুকনো বিলের পাশে খেলাধুলায় মাতামাতি আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জোয়ার নিয়ে ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য আপনাকে শৈশবের ভাবনায় সাঁতরাতে পারে।
সাদুল্লাহপুর, শ্যামপুর, ভাগ্নিবাড়ি এ সকল গ্রামের মানুষের আয় প্রধানত ফুলের ব্যবসার থেকে। গ্লাডিওলাস, সাদা, হলুদ ও লাল মিরান্ডি জাতের গোলাপ চাষ করে এখানের চাষিরা প্রায় ২৫ বছর ধরে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে। মূলত মাটি লাল থাকার কারণে তারা অন্যান্য ফসলের দিকে তেমন না ঝুঁকে গোলাপ চাষেই রয়েছেন। শহরের প্রায় সমস্ত ফুলের চাহিদা মিটিয়ে আসছে এই সাদুল্লাহপুর। অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীতের মৌসুমে ফুলের দাম একটু বেশি থাকে। সকালের ফুলের কলি বিকেলে ফোটে আর এ ফুল কেটে সন্ধ্যার বাজারে নিয়ে আসেন চাষিরা। এক একটি আঁটিতে ৫০টি ফুল। এভাবে ৩০০টি ফুল একই সঙ্গে ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। তিনটি বাজার রয়েছে পাইকারি ফুল বিক্রির জন্য। এর মধ্যে শ্যামপুরে আবুল কাশেম মার্কেট ও মোস্তাপাড়ায় সাবু মার্কেটে ফুল ব্যবসায়ীদের সন্ধ্যার পর ফুল কেনার উদ্দেশ্যে আনাগোনা বেশি দেখা যায়।

ঢাকার মিরপুর-১ থেকে যদি কেউ নদী পথে যেতে চান, তাহলে বেড়িবাঁধ দিয়াবাড়ি বটতলা ঘাট থেকে শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকায় জনপ্রতি ২৫ টাকায় সাদুল্লাহপুর পৌঁছাতে পারেন। আর সড়কপথ দিয়ে যাবার জন্য শাহআলী মাজারের সামনে থেকে টে¤পুতে উঠে আকরাইন বাজার জনপ্রতি ২০ টাকা দিয়ে নেমে পরবর্তীতে ব্যাটারির অটোতে ১৩ টাকায় সাদুল্লাহপুর পৌঁছানো যায়। যাদের নিজস্ব গাড়ি রয়েছে তারা মুহূর্তেই পৌঁছে যেতে পারেন মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে। গাজীপুর থেকে যারা আসতে চান, তারা আশুলিয়া বেড়িবাঁধ হয়ে আসতে পারেন। উত্তরা দিয়ে চাইলেও সহজে আসা যায়। উত্তরা হাউজ বিল্ডিং দিয়ে উত্তরা মডেল টাউনের ভেতর সোজা বিরুলিয়া ব্রিজের ওপর হয়ে আকরাইন বাজার আসার আর একটি সহজ পথ। উত্তরা কিংবা মিরপুর যে পথ হোক, সময় ৩০ মিনিটের বেশি প্রয়োজন হয় না। কোনো যানজটের রূপ এখানে দেখা যায় না। নানান মুড়ি-মুড়কি, নিমকি, মিষ্টি, লাড্ডু পাওয়া যায় এখানে। খাবারের কিছু হোটেল রয়েছে সাদুল্লাহপুর বাজারে। তবে যারা এ সকল ছাউনি ঘেরা বা ছোটো-খাটো হোটেলে খেয়ে অভ্যস্ত নন, তারা চাইলে নিজস্ব ব্যবস্থা করে নিয়ে যেতে পারেন।

ভ্রমণের জন্য শীতের সময়টি বিশেষ করে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেশ আরামদায়ক। আর এই সময় এখানে ফুলের মেলা বসে গোটা গ্রামজুড়ে। চারিদিকে তাকালে মনে হয় লাল লাল ফুলের ভেলা যতদূর চোখ যায়। ভোরের শুভ্র কুয়াশা ঘেরা আমেজ থেকে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতার আগমুহূর্তেই অচেনা গ্রামকে হাতছানি দিয়ে শহরে ফিরে এসে আবার পরবর্তী দিনের কর্মযজ্ঞে যোগদান করুন পূর্ণ প্রফুল্লতা নিয়ে।


টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

২০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৬:৫৩ পি.এম