President

আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকার-আলবদর-আলশামসরা এক পরিকল্পিত ছক কেটে আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দু'দিন আগে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের বেছে বেছে নৃশংসভাবে হত্যা করে। যদিও একাত্তরের ২৫ মার্চ রাত থেকেই শুরু হয়েছিল নিধনযজ্ঞ, কিন্তু এর সর্বশেষ ভয়াবহ ছোবল পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় দোসররা বসিয়েছিল ১৪ ডিসেম্বর। সেসব বিভীষিকাময় ঘটনাবলি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার জন্য ইতিহাস বিকৃতি কম ঘটানো হয়নি। কিন্তু আশার কথা এই যে, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনায় প্রজন্ম ক্রমেই শানিত হচ্ছে সবরকম প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে। আজকের এই শোকাবহ দিনে গভীর শ্রদ্ধায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীসহ স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জনদানকারী সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি

যেসব শ্রেষ্ঠ সন্তান দশকের পর দশক বিদ্যাচর্চা, জ্ঞান তপস্যা, গবেষণা ও সৃজনশীলতা দিয়ে জাতির মননকে সমৃদ্ধ করেছেন, জাতির অগ্রগতি ও মুক্তির পথ রচনায় নিরলস সাধনা ও জাতিকে অনুপ্রাণিত এবং উদ্দীপিত করেছেন, তাদের শেষ করে দেওয়ার হীন পরিকল্পনার পেছনে শত্রুদের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা পেয়েও এ জাতি যেন ভবিষ্যতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। এ লক্ষ্যেই তারা বাঙালি জাতিকে মেধা ও মননশূন্য করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের জানা ছিল না যে, ব্যক্তির শারীরিক বিনাশ ঘটানো যায়, কিন্তু একটি বিজয়ী জাতির মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। কোনোকালে কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তিই এটি করতে পারেনি। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি এবং আজও আমরা এই ক্ষতির রেশ বহন করে চলেছি তা সত্য। কিন্তু এও তো সত্য যে, আমরা জেগে আছি এবং জেগে থাকব। আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে অমর শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে অন্তরের গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমরা প্রতিবার নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে পথচলা শুরু করি।

আমাদের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি শুধু স্মৃতিতর্পণ নয়। এমন শোকের দিনেও আমরা ইতিহাসের অপরিশোধিত দায় ভুলে যাই না। শোকের সঙ্গে আমরা তাদের অন্তহীন শূন্যতা অনুভব করি; কিন্তু তাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন করে শক্তিও সঞ্চয় করি। ঘাতক ও তাদের মিত্ররা মনে করেছিল এই রক্তস্নাত মাটিতে তাদের অপরাধের কোনো বিচার হবে না। তারা মনে করেছিল ইতিহাসের চাকা উল্টো দিকে ঘুরে গেছে। কিন্তু না, ইতিহাসের দায়মুক্তি ছাড়া জাতির অগ্রগতির পথ অবারিত হয় না, হতে পারে না তা এ দেশের প্রগতিশীল মানুষ প্রমাণ করে ছেড়েছে। বিলম্বে হলেও ঘাতকদের বিচার হয়েছে। শীর্ষ অপরাধী কয়েকজনের দণ্ডও ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে। আমাদের দাবি ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলার মাটিতে হতেই হবে। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। তাদের নেতৃত্বাধীন সরকার যুদ্ধাপরাধী, বুদ্ধিজীবীদের ঘাতকদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে পর্যায়ক্রমে এক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা পূরণে এগিয়ে চলেছে।

একাত্তর আমাদের অক্ষয় অধ্যায়। কোনো গণযুদ্ধ অসামরিক জনগণের সর্বাত্মক সহযোগিতা ব্যতিরেকে সফল হতে পারে না। পাকিস্তানের মতো একটি দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে জনযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এর কৃতিত্ব একা কোনো শক্তির নয়। সামরিক বাহিনী, মিত্র বাহিনীর সঙ্গে আমাদের অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত যুদ্ধের ফসল এই বাংলাদেশ। রক্তগঙ্গা পেরিয়ে আমাদের বিজয় এসেছে। ইতিহাস কথা বলে। ইতিহাসই বলে দেয় মোটা দাগে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, তা বিশ্বে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এবং থাকবেও। আমরা যা হারিয়েছি আর যা অর্জন করেছি এর হিসাব মেলানোর চেয়েও বড় কথা হলো, আমরা একটি বিজয়ী জাতি এবং একটি নিরস্ত্র জাতি হিসেবে আমাদের গৌরবগাথা অনন্য। একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর কেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা জাতির কণ্ঠস্বর, জাতির মনীষা, দুঃসময়ের দিশারি সেই গুণীদের নির্মমভাবে হত্যা করতে চেয়েছিল তা আগেই বলেছি। কিন্তু তারা যে চেতনা ও মূল্যবোধ আমাদের মধ্যে প্রোথিত করে গেছেন তা কি আমরা বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি নাকি যে, আমরা কক্ষচ্যুত হয়ে পড়ব?

ফিরে যেতে হয় আবারও সেই প্রেক্ষাপটে। একাত্তরে পুরো এই জনপদের মানুষ ছিল অরক্ষিত। একই অবস্থা তো ছিল এ দেশের বুদ্ধিজীবীদেরও। বাংলাদেশের অনেক নিরপরাধ মানুষ মৃত্যুকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ঘাতকের অস্ত্রের মুখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছিল তাদের। ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞদেরও ঘাতকের নিশানা হতে হয়েছিল। তারা এমন একটি সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যা বহন করত পরাধীনতা মোচনের দীপ্ত মশাল। ঘাতকদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এ দেশকে মেধাশূন্য করে দেওয়া। বাঙালির বিজয় যে আর বেশি দূরে নয়, এটা বুঝতে পেরেছিল পরাজিত শক্তি। যাতে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে বাঙালি- এটাই ছিল একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল উদ্দেশ্য। আমাদের এই বুদ্ধিজীবীরা কখনও মাথা নত করেননি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন তারা। যে চেতনার জগৎ তারা গড়ে তুলেছিলেন, সেই চেতনা থেকেই আপামর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। আর সে কারণেই ঘাতকদের টার্গেট ছিল দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানরা। প্রতিহিংসা মেটানোর পাশাপাশি চেতনার দিক থেকে বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করতে চেয়েছিল তারা।

একাত্তরের ঘাতক ও তাদের উত্তরসূরিদের নতুন করে চিনিয়ে দিতে হবে নতুন প্রজন্মকে। এ কাজটি অত্যন্ত জরুরি। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের যারা হত্যা করেছে, সেই আলবদর-আলশামস বাহিনীর কমান্ডারদের একাত্তরের কর্মকাণ্ড ও পরে তাদের মধ্যে যাদের বিচার হয়েছে এবং দণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাদের নিয়ে একাধিক নিবন্ধ-প্রবন্ধ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এতে নতুন প্রজন্ম নিজেদের লেখাপড়ার ভেতর দিয়ে আলবদর-আলশামস-রাজাকারসহ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশবিরোধী শক্তিকে চিনতে পারবে।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিচারের দাবিটি স্বাধীনতার পরপরই ওঠে। বিচারকাজ চলছিলও। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী শাসকরা বিচারকাজ দূরে থাক, খুনিদের প্রতিষ্ঠিত করেছে সর্বত্র। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরপরই বিচারকাজ শুরু করেন নির্বাচনী ওয়াদা সামনে রেখে। একাত্তরে যারা হত্যাযজ্ঞে ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে জড়িত ছিল তাদের বিচার প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চলছে। ইতিমধ্যে কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী, মুজাহিদ, নিজামী, মীর কাশেম আলীর মতো অপরাধীদের আদালতের রায়ে চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর হয়েছে। আরও অভিযুক্তের বিচার চলছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলোর মধ্যে ঘৃণ্যতম। সব অপরাধীর যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আরও গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব।

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:৪৭ এ.ম