President

বাংলাদেশে আপাতত নতুন ব্যাংকের দরকার নেই — শুধু বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এ মতামত আসছে তা নয়। আইন যে প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার এখতিয়ার দিয়েছে সেই বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, আর কোনো বেসরকারি ব্যাংক স্থাপন বাস্তবসম্মত হবে না। এরপরেও রাজনৈতিক কারণে সরকার নতুন তিনটি ব্যাংক চায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ বার্তা ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। হয়তো আমরা কিছুদিনের মধ্যে জানতে পারব, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কী কারণে নতুন ব্যাংক দিতে চাইছে না — তা সরকারকে যুক্তি ও পরিসংখ্যান দিয়ে জানিয়েছে। ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, গত ৫ বছরে ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদ, ঋণ ও আমানতের পরিমাণ বাড়লেও এগুলোর বৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে কমছে। মূলধন পর্যাপ্ততার হার, সম্পদের বিপরীতে মুনাফার হার এবং উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের (ইক্যুইটি) বিপরীতে মুনাফার হারও নিম্নমুখী। এছাড়া খেলাপি ঋণের হারও বেড়েছে।

সর্বশেষ গত ২০১৩ সালে অনুমোদন দেওয়া ৯টি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক প্রচণ্ড রকম তারল্য সংকটে ভুগছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ইতোমধ্যে ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন ব্যাংকগুলোর কয়েকটি এমনভাবে আগ্রাসী ব্যাংকিং করছে যে, তাদের এ প্রবণতা পুরো খাতে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। অন্য ব্যাংকের গ্রাহককে প্রলোভন দেখিয়ে তার ঋণ অধিগ্রহণ করে কেউ কেউ বিপাকেও পড়েছে।

বাংলাদেশে ৫৮টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে। এর বাইরে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংকসহ ৬টি ব্যাংক রয়েছে যেগুলো তফসিলি নয়। এসব ব্যাংক বিশেষ উদ্দেশ্যে আলাদা আইনের মাধ্যমে গঠিত। এছাড়া দেশে ৩৩টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানও জনসাধারণের কাছ থেকে আমানত নেয় এবং ঋণ বিতরণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ব্যাংক এজেন্ট নিয়োগ করে গ্রামেগঞ্জে ব্যাংকিং সেবার বিস্তার ঘটিয়েছে। ১৭টি ব্যাংক ১৮০০ এজেন্টের মাধ্যমে ৩ হাজারের বেশি আউটলেটে এজেন্ট ব্যাংকিং করছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যাপক প্রসারের কারণে আর্থিক অর্ন্তভুক্তি বহুলাংশে বেড়েছে। বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর আরও বেশি বেশি মানুষকে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর কথা বলে নতুন ব্যাংক দেওয়ার যুক্তি যথাযথ নয়।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন তিনটি ব্যাংক দেওয়ার জন্য সরকারের সিদ্ধান্ত অনাকাঙ্ক্ষিত। সর্বশেষ অনুমোদন দেওয়া ৯টির মধ্যে যখন একাধিক ব্যাংকের অবস্থা করুণ, তখন সরকার আবার কেন নতুন ব্যাংক দিতে চাইছে তা তাদের বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার তাতে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীতা দেখছেন না তারা।

আশির দশকের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়। এরশাদ সরকারের সময়ে ১৯৮২ সাল হতে ১৯৮৭ সালের মধ্যে ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ৮টি ব্যাংক অনুমোদন পায়। তৃতীয় পর্যায়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সময়কালে ১৩টি বেসরকারি ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়। ২০০৫ সালের ১২ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ২৭২তম সভায় বেসরকারি খাতে নতুন ব্যাংক স্থাপন সংক্রান্ত একটি নীতিমালা উপস্থাপন করা হলে পর্ষদ তা অনুমোদন করে। তবে তার অর্থ এই ছিল না যে, বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। বরং দেশের অর্থনীতি ও অর্থবাজারের আকার, সঞ্চয় সৃষ্টি ও মূলধন গঠনের হার, আর্থিক খাতের গভীরতা, বিদ্যমান ব্যাংকিং অবকাঠামো ও ব্যাংকিং সেবার চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনায় নতুন কোন ব্যাংক স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ যুক্তিসঙ্গত হবে না মর্মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ ওই সময় মতামত দেয়। এরপরেও সরকারের ইচ্ছায় ২০১৩ সালে প্রবাসীদের মালিকানায় ৩টিসহ ৯টি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয় সরকার। নতুন কোনো ব্যাংক দেওয়ার আগে এই ৯টি ব্যাংকের অবস্থা পর্যালোচনা করা জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৩:২৩ পি.এম