President

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্পষ্টভাষী মানুষ, যিনি অপ্রিয় সত্য কথা বলতে দ্বিধা করেন না। ইতিপূর্বে তিনি আওয়ামী লীগের ভেতরে ঢুকে পড়া 'হাইব্রিড' ও 'কাউয়াদের' সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন; যা নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে বেশ বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। এবার তিনি রাজনীতিকদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত ২৫ নভেম্বর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, 'আমরা যারা রাজনীতি করি তাদের মধ্যে কয়জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে আমি সৎ, আমি শতভাগ সৎ মানুষ। এখানেই সমস্যা। আমরা রাজনীতিকরা যদি দুর্নীতিমুক্ত থাকি, তবে দেশের দুর্নীতি অটোমেটিক্যালি অর্ধেক কমে যাবে' (বিডিনিউজ২৪; ২৫ নভেম্বর ২০১৭)। এটি সঠিক উপলব্ধি।

দুর্নীতি এখন সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রতিষ্ঠান সর্বত্রই দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এমনকি শিক্ষক, সাংবাদিকদের একাংশও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সামাজিক মূল্যবোধও যেন বদলে গেছে! অনেকে মনে করেন, যারা দুর্নীতিবাজ তারাই 'বুদ্ধিমান'। আর যারা দুর্নীতি করেন না তারা 'বেআক্কেল'। এখন খুব কম বাবা-মা আছেন, যারা সন্তানদের সৎ হতে পরামর্শ দেন। তারা দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করতে শেখান না। উপরন্তু দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকেও অনুকরণীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেন। এমন সামাজিক অবক্ষয়ের মধ্যে আমরা ডুবে আছি। দুর্নীতিকে জায়েজ করার ফতোয়াও আছে। বলা হচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে বলে দুর্নীতি বাড়ছে। দুর্নীতির প্রশ্নে কঠোর হলে উন্নয়ন নাকি ব্যাহত হবে। উদ্ভট যুক্তি! একচোখা লোকেরা দেখছেন না, দুর্নীতির কারণে প্রকল্প বিলম্বিত হচ্ছে, উন্নয়নের চাকা ঠিকমতো ঘুরছে না, উন্নয়নের সুফল খেয়ে ফেলছে দুর্নীতিবাজরা। তাই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে না পারলে দেশ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছবে না। ক্রমেই পিছিয়ে পড়বে।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, রাজনীতিকরা সৎ হলে অন্যরা কি দুর্নীতি ছেড়ে দেবে? না, তা হয়তো ছাড়বে না। তবে দুর্নীতির ক্ষেত্র সংকুচিত হবে। দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রাম জোরদার হবে। একটা সাধারণ হিসাব- মন্ত্রী দুর্নীতি না করলে সচিবের জন্য দুর্নীতি করা কঠিন। আর সচিব না করলে তার অধস্তনদের জন্য তা আরও কঠিন। তাই দুর্নীতি রুখতে সর্বাগ্রে রাজনীতিকদের দুর্নীতিমুক্ত হওয়া দরকার। রাজনীতিকরা দেশ চালান; তারা দুর্নীতিমুক্ত হলে দুর্নীতি অর্ধেক কেন, আরও বেশি কমে আসবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রাজনীতিতে 'হাইব্রিড' আর 'কাউয়ার' ব্যাপক উপস্থিতি। রাজনীতি ত্যাগের বিষয়, এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোগের সংস্কৃতি। একদল টাকাওয়ালা রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছেন। রাজনীতি তাদের কাছে বাণিজ্য। তারা নির্বাচনে টাকা বিনিয়োগ করেন, এমপি-মন্ত্রী হন বিনিয়োগের শতগুণ কামাই করার জন্য। করছেনও। কেউ আমাকে ভুল বুঝবেন না, আমি টাকাওয়ালা ব্যবসায়ী বা আমলাদের রাজনীতিতে আসার বিরোধিতা করছি না। সব পেশার মানুষেরই রাজনীতি করার অধিকার আছে। তবে রাজনীতিকে কলুষিত করার অধিকার নেই, অধিকার নেই রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করার। ইতিপূর্বে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও রাজনীতির এই বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদের ৭০ শতাংশই ব্যবসায়ী ও সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা। অথচ '৫৪, '৭০, এমনকি '৭৩-এ গঠিত সংসদে এমন ছিল না। এসব সংসদে সিংহভাগই ছিলেন আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ নানা পেশার মানুষ। তারা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা গণসম্পৃক্ত রাজনীতিক ছিলেন।

রাজনীতি কেবল রাজনীতিক-ব্যবসায়ীদের কারণে কলুষিত হচ্ছে, তা নয়। প্রকৃত রাজনীতিকদের একাংশ এখন টাকা কামাইয়ের পথ বেছে নিয়েছে। এই পদস্খলনের স্বপক্ষে যুক্তিও দেওয়া হয়। তা হলো- মনোনয়ন ও নির্বাচনের জন্য বস্তা বস্তা টাকা ব্যয় করতে হয়। যারা তা পারেন না, তারা মনোনয়নও পান না। তাই বাধ্য হয়ে তাদের টাকার কথা ভাবতে হয়। এ যুক্তি কি গ্রহণযোগ্য? সত্তর বা চুয়ান্নর নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও অন্য দলে ধনকুবেররা প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিকদের মনোনয়ন দিয়েছিলেন। সে সময় টাকা দিয়ে টাকার খেলা মোকাবেলার চেষ্টা হয়নি। মোকাবেলা করা হয়েছিল রাজনীতি দিয়ে। তখন তরুণ আদর্শবাদীদের কাছে প্রতিপক্ষের জাঁদরেল ও টাকাওয়ালা প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৫৪ সালে নূরুল আমীন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের কাছে হেরে গেলেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনের অনেক ঘটনাই আমার জানা। ফরিদপুর সদরের নির্বাচনী এলাকায় মনোনয়নের প্রত্যাশায় একাধিক ধনী ও সাবেক আমলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ওখানে আমার ইমাম (ইমামউদ্দিন আহমেদ) আছে। ইমামউদ্দিন আহমেদের কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। রাজনীতির কারণে স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি হারিয়েছিলেন। তবে রাজনীতিতে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। সর্বত্রই ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পক্ষান্তরে প্রতিপক্ষরা ছিল অনেক অর্থবিত্তের মালিক। তখন মুসলিম লীগের প্রার্থীরা জিপ গাড়ি ও লঞ্চ ভাড়া করে প্রচার কাজে যেতেন। আর আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের প্রার্থীরা হেঁটে, বাইসাইকেল বা নৌকায় করে নির্বাচনী প্রচার করতেন। আমার গ্রামের পাশের নির্বাচনী এলাকা বোয়ালমারীতে আওয়ামী লীগের এমপিএ প্রার্থী ছিলেন ডা. আফতাবউদ্দিন আহমেদ। এখন ভাবতে অবাক লাগে, আমি তার সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে বসে ক্যাম্পেইনে গিয়েছিলাম। তখন মনোনয়নের মানদণ্ড ছিল ত্যাগ ও আদর্শ। এ মানদণ্ড আজ আর বিবেচ্য নয়। এ জন্য রাজনীতিবিদরা সামরিক আমলকে দায়ী করছেন। তা অস্বীকার করা যায় না। তবে রাজনীতিকদের কাজ সে পথে হাঁটা, না পরিবর্তন আনা- সেটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আমাদের অতীত রাজনীতি ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জ্বল। এর মানে এই নয় যে, অতীতে রাজনীতিতে জমিদার বা ধনকুবেররা ছিলেন না। তাদের বিপরীতে যে রাজনীতি ও কর্মী বাহিনী ছিল, বাংলাদেশ সেই রাজনীতির উত্তরাধিকার। ব্রিটিশ ভারতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে জমিদার ও রায়বাহাদুর-খানবাহাদুরদের বিরুদ্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের সংগ্রাম ছিল। দেশভাগের পর মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে সোহরাওয়ার্দী-হাশিমের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল অংশই মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তী সময়ে মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগে পরিণত হয়) গঠন করে। আওয়ামী লীগে বরাবরই উকিল-শিক্ষক-ডাক্তারসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রাধান্য ছিল, এটি কখনও টাকাওয়ালাদের দল ছিল না। দলের প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি মওলানা ভাসানীর ঢাকাতে কোনো বাড়ি ছিল না। সহকর্মীদের বাড়িতে থাকতেন। তিনি রাজধানী থেকে দূরে টাঙ্গাইলের সন্তোষে পর্ণকুটিরে বাস করতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ জীবনযাপন করতেন। বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে গেলে তার প্রমাণ মিলবে। স্বাধীনতার আগে ও পরে আওয়ামী লীগের সিংহভাগ নেতাই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারতেন, আমি সৎ। এ সময়ের নেতাদের বেশিরভাগ নিজেদের সৎ দাবি করতে পারছেন না। মূলধারার অপরাপর দল অর্থাৎ বিএনপি-জাতীয় পার্টির কাছে তা আশা করা যায় না। জনগণ এমন আশাও করে না। তাদের প্রত্যাশা, ভাসানী-শামসুল হক-তর্কবাগীশ-বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দীনের হাতে গড়া আওয়ামী লীগের কাছে। সঙ্গতভাবে জনগণের প্রত্যাশা বাম দলগুলোর কাছেও। বাম দলগুলোতে ত্যাগী নেতাদের সাক্ষাৎ পাওয়া গেলেও তারা নির্বাচন ও রাজনীতিতে তেমন ফ্যাক্টর নয়। ভোটের হিসাব-নিকাশে এগিয়ে আছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাপা, যেখানে দুর্নীতিবাজরা হাঁটু গেড়ে বসেছে। এসব দলই দেশ চালাচ্ছে। ফলে দুর্নীতি কমছে না। বরং দুর্নীতি বেড়েই চলেছে।

দেশের উন্নয়ন ধারাকে এগিয়ে নিতে দরকার দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা। আর সেটি করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই। দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের দিয়ে তা সম্ভব নয়।'

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ এইচ কে/এস আর

২৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১৪:০৩ পি.এম