President

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে অশান্ত হয়ে উঠেছে দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। এরই অংশ হিসেবে তিন সপ্তাহে তিনটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দলটির একাধিক সূত্র থেকে এমন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

জানা গেছে, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগ কমিটিতে ‘মাই ম্যান’দের (নিজের লোক) সুপারিশের দায়িত্ব দেয়া নিয়ে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

দলটির একাধিক সূত্র জানায়, মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থানা ও ওয়ার্ড কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এ আধিপত্যবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। যদিও শাহে আলম মুরাদপন্থীদের অভিযোগ, সাঈদ খোকন নগর ভবনকেন্দ্রিক একটি বলয় তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন মেয়র। সংঘর্ষের ঘটনায় বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মহানগরের রাজনীতিতে শাহে আলম মুরাদের সঙ্গে মেয়র সাঈদ খোকনের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে দেখা গেলেও এর পেছনে অবিভক্ত কমিটির অন্তত দুজন এবং ওই দুই নেতার অনুসারীদের ইন্ধন রয়েছে। পাশাপাশি খোকনপন্থী হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক রয়েছেন, একই সঙ্গে তারা কমিশনারও।

নগর আওয়ামী লীগের ওই দুই নেতার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত ২৬ অক্টোবর। রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিকনফারেন্সে থাকাকালে হাতাহাতি ও ভাঙচুরে জড়িয়ে পড়ে দু-পক্ষ। পরে এর পাল্টা ঘটনা ঘটে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ‘জেলহত্যা দিবস’ উপলক্ষে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ আয়োজিত বর্ধিত সভায়। ওই সভায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার আবু আহমেদ মন্নাফি এবং মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ সমর্থকদের মধ্যে।

সূত্রে জানা গেছে, ওই ঘটনায় দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নালিশ করেন আবু আহমেদ মন্নাফি। উত্তরে দলীয় প্রধান বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে ওই দুই ঘটনার জের ধরে বৃহস্পতিবার রাজধানীর আজিমপুর এলাকায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উভয়পক্ষ। আজিমপুর পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারে নাগরিক সমাবেশ সফলের লক্ষ্যে লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালী ও কামরাঙ্গীরচর থানা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে যৌথ সভার কর্মসূচি দেয় দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। ওই যৌথ সভাস্থলের সামনে ময়লার স্তূপ রাখা নিয়ে দু-পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

আজিমপুরের স্থানীয়রা জানান, এলাকাবাসী ঘুম থেকে উঠে দেখেন পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে জমে আছে আবর্জনার স্তূপ। পার্ল হারবারের তিনতলায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সভাস্থলের সামনে ময়লার স্তূপ দেখে মেয়র সাঈদ খোকনের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেয়া শুরু করেন। খবর পেয়ে পুলিশও ঘটনাস্থলে যায়, পুরো এলাকায় নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এর কিছুক্ষণ পর বেলা ১১টার দিকে মেয়রের অনুসারী বলে পরিচিত স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক এবং পার্শ্ববর্তী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দীন আহমেদ রতনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কয়েকশ’ নেতাকর্মী শাহে আলম মুরাদের বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে আজিমপুর রোডে ঢুকতে চাইলে শুরু হয় হট্টগোল।

ওই সময় উপস্থিত জনতার হাতে ‘মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছনাকারী শাহে আলম মুরাদের বহিষ্কার চাই’ শিরোনামের ব্যানার দেখা যায়। মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিক কমিটির ব্যানারে মেয়র খোকনের অনুসারীরা মিছিলে উপস্থিত ছিলেন। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে পলাশীর মোড়ে দু-পক্ষের কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া হয়। মহানগর আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসার পথে প্রধান অতিথি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনির গাড়ি আটকা পড়ে আজিমপুর মোড়ে। ওই সময় স্থানীয় কাউন্সিলর মানিককে ডেকে গাড়িতে বসে তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

ওই সময় দীপু মনি বলেন, ‘তোমাদের জন্য আওয়ামী লীগের বদনাম হচ্ছে। তোমাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকলে সেটা দলীয় ফোরামে বলবে, রাস্তা অবরোধ করে এখানে হট্টগোল কেনো? কথাবার্তার একপর্যায়ে দীপু মনির গাড়িতেও দু-একটি ঢিল এসে পড়ে। তখন তিনি অনুষ্ঠানস্থলে না গিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে চলে আসেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে বেলা ১টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়।

আজিমপুর এলাকার এক বাসিন্দা জানান, সকাল ৮টা থেকে এলাকায় থমথমে পরিবেশ ছিল। বেলা ১১টার দিকে আওয়ামী লীগের দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। পুলিশ বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে শুরু হয় ত্রি-পক্ষীয় সংঘর্ষ। এ সময় আজিমপুর এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আজিমপুর চৌরাস্তা, পলাশী, ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ এতিমখানা রোডের পুরো এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আজিমপুর চৌরাস্তায় পুলিশ অবস্থান করলেও ভেতরের রাস্তাগুলো দিয়ে পার্ল হারবার কমিউনিটি সেন্টারে আওয়ামী লীগের সভাস্থলের সামনে বেশকিছু গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সভা পণ্ড করার জন্য সাঈদ খোকনের অনুসারীরা কয়েকটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং ভাঙচুর করে। পরে পুলিশ টিয়ার শেল ছুড়ে তাদের তাড়িয়ে দেয়। ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয় ১৩ জনকে। গ্রেফতারদের বেশিরভাগই মেয়রের অনুসারী।

সভায় অংশ নিয়ে দলীয় কোন্দলের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা বলেন, শেখ হাসিনার সরকার বারবার দরকার। কিন্তু ঐক্য ছাড়া শেখ হাসিনার সরকার আসবে না। আজ যে দ্বন্দ্ব চলছে, এভাবে চললে শেখ হাসিনার সরকার আসবে না। আপনারা যেভাবে অনৈক্য দেখাচ্ছেন তা কখনো শুভ নয়।’

মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বশেষ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনের বিরোধিতা করলেও তার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের শেষের দিকে শাহে আলম মুরাদকে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে নির্বাহী সদস্য হিসেবে স্থান পান সাবেক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন। এরপর থেকে দ্বন্দ্ব শুরু হয় দুই নেতার মাঝে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বলেন, শনিবার আওয়ামী লীগের নাগরিক সমাবেশ সফলের জন্য বর্ধিত সভা ডাকি আমরা। কিন্তু আমাদের সমাবেশ পণ্ড করার জন্য দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের লোকজন অনুষ্ঠানস্থলের সামনে কয়েক ট্রাক আবর্জনা ফেলে যায়। এ ধরনের নোংরামির কোনো মানে হয় না। শত বাধা সত্ত্বেও আমাদের সমাবেশ পণ্ড হয়নি। তবে বিশৃঙ্খলাকারীদের বাধার মুখে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে পারেননি প্রধান অতিথি, বাকিরা সবাই উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক বলেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পার্ল হারবারের সামনে ময়লার স্তূপ রাখার খবর পাই। সঙ্গে সঙ্গে আমি সিটি কর্পোরেশনকে জানাই। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন থেকে জানানো হয়, উচ্চ আদালতের নির্দেশে দিনের বেলায় রাজধানীতে ময়লা পরিবহন সম্ভব নয়। সন্ধ্যার পর তারা এটি সরিয়ে নেবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিতের প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের পক্ষে মিছিল ছিল। এলাকার কাউন্সিলর হিসেবে আমি মিছিলে যোগ দেই।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, আবর্জনার স্তূপের খবর পেয়ে আমি ওই এলাকায় খবর নেই। জানতে পারি, মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা সম্প্রতি দু-একজন মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করেছেন। এর প্রতিবাদে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা তাদের বাসাবাড়ির ময়লা এনে ওই নেতার অনুষ্ঠানস্থলের সামনে রেখে গেছেন।

ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, আগামী শনিবার সোহরাওয়ার্দীতে নাগরিক সমাবেশ আছে। সমাবেশের পর এ বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। দলের সিনিয়র নেতাদের আমি বিষয়টি জানিয়েছি।

একই বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, লালবাগে যারা বিশৃঙ্খলা করেছে তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলাকারীদের অতীতেও বিচার হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সূত্র- জাগো নিউজ

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

১৬ নভেম্বর, ২০১৭ ২৩:৫৫ পি.এম