President

আগামী সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েন এবং ইভিএম ব্যবহার না করার বিষয়ে এক নির্বাচন কমিশনারের মন্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা এর প্রতিফলন দেখতে চান।

তাদের মতে, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু করতে দুই প্রস্তাবের বাইরে ইসিকে আরও পদক্ষেপ নিতে হবে। এগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরাসরি ইসির এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দেরি করা সমীচীন হবে না। সবার সঙ্গে আলোচনা করে নেয়া সিদ্ধান্ত অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভূমিকা রাখবে। দূরত্ব কমিয়ে বড় দুটি দলকে কাছাকাছি নিয়ে আসবে। সে অনুযায়ী ইসির নির্বাচনী ছক সাজানো উচিত।

নির্বাচন কমিশনারের এই মন্তব্যকে মাঠের বিরোধী দল বিএনপিও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মনে করে একজন কমিশনার নয়, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই ইসি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই সেনা মোতায়েন করা দরকার। তবে সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়ার দরকার নেই। ভোটের দিন সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কাজ করবে। প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি সাপেক্ষে গুলিও করতে পারবে। তারা বলেন, ১৯৯১ সালের পর থেকে অনুষ্ঠিত সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে। তারা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করেছে। ভোট শেষে সেনাবাহিনী ফিরে গেছে। ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে অসুবিধার দিকগুলো তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, আধুনিক এ পদ্ধতির প্রতি মানুষের আস্থার সংকট আছে। এটা এখনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ইভিএম ব্যবহারের ফলে পুরো নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা আছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ কমিশনারের মন্তব্যকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, নির্বাচনের বাকি প্রায় এক বছর। এখনই বিএনপির দুটি প্রস্তাব মেনে নেয়া হলে দলটির তৃণমূলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

আগস্ট মাসে ইসির সঙ্গে ৪০টি রাজনৈতিক দলের সংলাপ হয়েছে। এর মধ্যে ভোটের দিন সেনাবাহিনী চেয়েছে বিএনপিসহ ২৪টি দল। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলেছিল, প্রয়োজন হলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সেনাবাহিনী নামানো যেতে পারে। এছাড়া ভোটে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে ১২টি রাজনৈতিক দল পক্ষে অবস্থান নেয়। বিপক্ষে কথা বলে বিএনপিসহ ১০টি দল। এরপর ১৩ নভেম্বর সোমবার নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেনা মোতায়েন হবে আগামী নির্বাচনে। এখানে একটা কিন্তু আছে। সেনাবাহিনীকে আমরা কিভাবে কাজে লাগাব, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সেনাবাহিনী কিভাবে যুক্ত হবে, তা বলার সময় এখনও হয়নি। আমরা কমিশনাররা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আমাদের সবারই অনুভূতি হচ্ছে সেনা মোতায়েন হোক।’ ওই সময়ে তিনি ব্যক্তিগত অভিমত প্রকাশ করে বলেন, আগামী নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ সম্ভব হবে না। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই নির্বাচন কমিশনারের এ বক্তব্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর দুটি প্রস্তাবের বিষয়ে তার ইতিবাচক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা এ বক্তব্যের প্রতিফলন দেখতে চেয়েছেন।

ইসির বক্তব্যের বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন বলেন, পত্রিকায় একজন নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য (নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার) দেখলাম। এটা ভালো কথা। সেনাবাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে। দেশের মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে হবে। তবে সব কেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দরকার নেই, শুধু যেসব কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ সেসব কেন্দ্রে মোতায়েন করতে হবে।

সংলাপে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবির বিষয়ে সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেয়া যাবে না। তবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট রাখা যেতে পারে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) অনুযায়ী আইন লংঘনকারীকে গ্রেফতার করতে পারবে। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া কাউকে গুলি করতে পারবে না। সাবেক এ নির্বাচন কমিশনারও আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইভিএমের ওপর জনগণের আস্থার সংকট রয়েছে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর থেকে ইভিএমের ওপর মানুষের যেটুকু আস্থা ছিল তা আরও কমে গেছে। এছাড়া আইটি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও গ্রুপিং রয়েছে। ইভিএম নিয়ে এক গ্রুপ কাজ করলে ভেতরে ভেতরে আরেক গ্রুপ এ মেশিনে কারসাজি করা যায়, তা মানুষের কাছে প্রমাণের চেষ্টা করবে। তাই আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, একজন নির্বাচন কমিশনার নয়, নির্বাচন কমিশন থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য আসা উচিত। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে সংলাপ করেছে। সেখানে যেসব প্রস্তাব উঠে এসেছে, সেগুলোর সারসংক্ষেপ করে যে প্রস্তাবগুলো দুটি দলকে নির্বাচনে আনতে সহায়ক হবে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করাই ইসির কাজ হবে বলে আমি মনে করি।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু একটি বা দুটি প্রস্তাবের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালে চলবে না। অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে সবার সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত দিতে হবে। এমন পদক্ষেপ ইসির প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। তারা মনে করেন, সংলাপে বেশিরভাগ দল যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে ইসির তা অনুসরণ করা উচিত। বিশেষ করে যেসব প্রস্তাব সরাসরি ইসির এখতিয়ারের মধ্যে আছে সেগুলো অনুসরণ করা নির্বাচন কমিশনের অনেকটা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান সেনা মোতায়েন প্রসঙ্গে বলেন, ১২ নভেম্বর বিএনপির সমাবেশের দিন যানবাহন বন্ধ করে নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ যে আচরণ করেছে, তা কাম্য নয়। পুলিশ অনেকটা দলীয় কর্মীর মতো কাজ করেছে। তাই আগামী নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই সেনা মোতায়েন করা যেতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। আরপিও সংশোধন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘সশস্ত্র বাহিনী’ শব্দটি যুক্ত করে গত নির্বাচনের মতো সেনা নামানো যেতে পারে। জনআস্থা না থাকায় আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন তিনি।

ইসির সঙ্গে সংলাপে প্রয়োজন হলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সেনা মোতায়েন ও ইভিএমে ভোটগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যে ওই প্রস্তাবের প্রতিফলন ঘটেনি। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, একজন নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যে আমরা অবাক বা অস্থির নই। কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সংলাপে অনেক দল নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কথা বলেছে। আমরাও (আওয়ামী লীগ) বলেছি, প্রয়োজন হলে ইসি সেনা মোতায়েন করতে পারে। আমাদের প্রস্তাবনার সঙ্গে অনেকের মতপার্থক্য থাকতে পারে, নির্বাচন কমিশনের নেয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গেও ডিফার হতে পারে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। আমরা মনে করি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসি আলোচনা করবে। ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে সব কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করার মতো প্রস্তুতি নেই। আমরা স্যাম্পল (নমুনা) হিসেবে যতদূর সম্ভব ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছি। কিন্তু সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কিভাবে এর বিরোধিতা করলেন বুঝলাম না। ভবিষ্যতে নির্বাচন প্রক্রিয়া উন্নত করতে হলে সীমিত হলেও এখন থেকেই ইভিএম ব্যবহার শুরু করতে হবে।

নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যকে অন্যভাবে দেখছে বিএনপি। তারা মনে করছে, নির্বাচনের এক বছর আগেই তাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণের ইঙ্গিত মিলেছে। তাদের প্রত্যাশা নির্বাচনের আগে যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করবে ইসি। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, একজন নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহার না করা এবং নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের কথা বলেছেন। এটা ইতিবাচক। আমরা আশা করি, এটা শুধু একজন নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেবে। যাতে একটি গ্রহণযোগ্য ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, যেখানে আমাদের দেশের মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে ঠিকমতো ভোট দিতে পারে না, সেখানে ইভিএমে নির্বাচন সম্ভব নয়। তাছাড়া যেসব দেশে ইভিএম চালু হয়েছিল, সেখানে কারচুপির কারণে তাদের অনেকেই এ পদ্ধতি বন্ধ করে দিয়েছিল। সুষ্ঠু নির্বাচনে অতীতেও সেনা মোতায়েন হয়েছিল, আগামীতেও করতে হবে। বিএনপির অন্যান্য দাবি পূরণ করতে ইসিকে উদ্যোগ নিতে হবে।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০৯:০৩ এ.ম