President

এক বছর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নারকীয় সন্ত্রাসী হামলা ঘটে। জুলাইয়ের ১ তারিখে একদল বন্দুকধারী ঢাকার কূটনৈতিক পাড়ায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে আকস্মিক ঢুকে পড়ে। সেখানে ২০ জন অতিথিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন বিদেশি। দুজন পুলিশ কর্মকর্তাও সেদিন সন্ত্রাসীদের হাতে মারা পড়েন। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী বেকারিতে ঢুকে সন্ত্রাসীদের হত্যা করে। বিদেশি অতিথিদের হত্যা করার জন্য যে জায়গাটি বেছে নেওয়া হলো এবং স্থানীয় ধারালো অস্ত্রসহ যে আধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হলো, তাতে বোঝা যায়, বাংলাদেশে জিহাদিবাদ নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

এর জবাবে সরকার বেশ কটি বড় ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালায়। হোলি আর্টিজানে হামলার পর উদার ব্লগার বা লেখকেরা যেহেতু আর হত্যার শিকার হননি, সেই বিবেচনায় বলা যায় সরকার সফল হয়েছে। কিন্তু সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নামে বিরোধীদের দমন করা হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক দেশব্যাপী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

দৃশ্যত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী নীতির মূল নজরটা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা। পরিণতিতে সরকার নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে বল প্রয়োগ করেছে। ফলে অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও জঙ্গিগোষ্ঠী ও সমমনা ব্যক্তিদের কার্যক্রম স্থবির হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যে জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তারা গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে পুনরায় সংগঠিত হয় এবং শিগগিরই নতুন নামে ও সাংগঠনিক কাঠামোয় নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যায়। অন্য কথায়, শুধু ‘সামরিক সমাধান’ খোঁজা হলে সন্ত্রাসবাদের কারণ আমলে নেওয়া সম্ভব নয়, বল প্রয়োগ করে সন্ত্রাসীদের নিধন করা গেলেও। বাংলাদেশের এই ধর্মীয় ভাবধারাপুষ্ট জঙ্গিবাদ উৎখাত করতে হলে সামগ্রিক ‘রাজনৈতিক সমাধান’ প্রয়োজন, যার মধ্যে বল প্রয়োগের ব্যাপারও আছে, তবে সেটা অংশমাত্র।

এসব ব্যাপার মাথায় রেখে বলা যায়, সমন্বিত সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল নিতে হলে চরমপন্থার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ আমলে নিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এর অভাব দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ইসলামি বিপ্লবে বিশ্বাসীদের যে গভীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে, সন্ত্রাসবিরোধী নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে তা আমলে নিতে হবে। পরিণতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরকারের কার্যক্রম ও সেবাব্যবস্থায় যে শূন্যতা রয়েছে, তা পূরণ করে এই জটিল ইসলামি আন্দোলন দূর করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তার সঙ্গে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা সরকার আমলে নিতে না পারার কারণে দেশে ইসলামপন্থীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখানে মানুষকে অবগত থাকতে হবে, ধর্মীয় চরমপন্থীরা ত্রিমুখী কৌশলে রাষ্ট্র ও সমাজে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রথমত, ইসলামপন্থীরা রাজনৈতিক দল গঠন করে ভেতর থেকে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ক্ষয় করে ফেলে। এ প্রক্রিয়ায় তারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগায়। এটা ইসলামি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক ‘রাজনৈতিক ফ্রন্ট’। ধর্মীয় চরমভাবাপন্ন রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে গত সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রক্ষায় এটা এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যে ঢুকে ঝামেলা তৈরি, রাজনৈতিক জায়গা নেওয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামপন্থীরা দলীয় রাজনীতির জগতে ইসলামি ভাবধারা বিস্তারের চেষ্টা করে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামপন্থীরা এনজিওসহ নানা ধরনের ‘সামাজিক আন্দোলন সংগঠন’ গড়ে তুলে সমাজসেবা, উন্নয়ন ও ধর্মীয়-সামাজিক তৎপরতায় যুক্ত হয়েছে। তারা গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ তারা সমাজের প্রতিটি স্তরে ঢুকে পড়েছে (ইসলামপন্থীদের সামাজিক ফ্রন্ট)।

তৃতীয়ত, ইসলামি আন্দোলন সদস্য, সহযোগী ও ‘দুর্বলভাবে যুক্ত’ গোষ্ঠী ও ব্যক্তির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সহিংসতায় জড়ায়। এই ‘সহিংস কার্যক্রম ফ্রন্ট’ তার রাজনৈতিক ও সামাজিক ফ্রন্টের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। ব্যাপারটা হলো, তারা শেষ অস্ত্র হিসেবে কাজ করে।

এই তিনটি ফ্রন্ট ইসলামের সংকীর্ণ ও আক্ষরিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়তে চায়। ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে তারা প্রণালিবদ্ধভাবে এই কৌশলগুলো সমন্বিত করে বহুমুখী প্রচারণা ও পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সন্ত্রাসী হামলা মোকাবিলায় এমন কোনো পদক্ষেপ নেই, যাকে আমরা ‘সেরা সমাধান’ আখ্যা দিতে পারি। এর অর্থ হলো, শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর বিচ্ছিন্ন বড় বড় অভিযানই যথেষ্ট নয়। সরকারকে সংগতিপূর্ণ ও সমন্বিত সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল প্রণয়ন করতে হবে, যাতে নিম্নোক্ত উপাদানগুলো থাকা দরকার: ১. ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা যাতে সহায়ক পরিবেশ না পায়, সেটাই হবে এই কৌশলের ‘মূল লক্ষ্য’। ২. ‘সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ’ গড়ে তোলা এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ‘গঠনমূলক কাজের সম্পর্ক’ গড়ে তোলা। একই সঙ্গে সরকারের কাজ খাটো করে, এমন সংবিধান-বহির্ভূত কার্যক্রম বন্ধ করা। ৩. দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক কাঠামো থেকে ইসলামপন্থীদের দূর করার রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকতে হবে এবং সে অনুসারে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ৪. দেশের নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করতে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; বিশেষ করে নাগরিক সমাজের সংগঠন এবং ধর্মনিরপেক্ষ ও সহনশীল শক্তিকে শক্তিশালী করতে এটা করতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের অ্যাজেন্ডায় দেশের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অন্যান্য অরক্ষিত গোষ্ঠীকে রক্ষার কর্মসূচি থাকতে হবে (নারী, এলজিবিটি)। ৫. মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের ভবিষ্যৎ ও জীবনমানের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এতে শিক্ষা সংস্কারের উদ্যোগ থাকতে হবে, বিশেষ করে মাদ্রাসার প্রাধান্য হ্রাসের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তবে এটাও মনে রাখা দরকার, হোলি আর্টিজানের হামলায় আর্থিকভাবে সচ্ছল ও উচ্চশিক্ষিত পরিবার থেকে ছাত্ররা অংশ নিয়েছেন। অর্থাৎ, জিহাদি গোষ্ঠীগুলো এখন সব শ্রেণির মানুষকেই দলভুক্ত করতে পারছে; শুধু সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক মানুষকেই নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরও তারা দলে ভেড়াতে পারছে। এটাও খেয়াল করতে হবে, ব্যাপারটা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা পৃথিবীতেই ঘটছে। সংক্ষেপে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য শুধু কারণের ওপর নজর দিলে চলবে না, যে কারণগুলো দারুণভাবে বহুমুখী। এই যে ধনীর সন্তানেরা জঙ্গি হচ্ছে, তা রোধ করতে সরকারকে সুনির্দিষ্ট শিক্ষামূলক পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে, যাতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সফল প্রচারণার রাশ টানা যায়।

সংক্ষেপে বললে জিহাদি হুমকি নস্যাৎ করতে হলে বাংলাদেশের অভিজাতদের রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সামগ্রিক ধারণা নির্মাণে জাতীয় মতৈক্য গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া নাগরিক সমাজকে সামনে আনতে হবে এবং গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। আগে উদার চিন্তকেরা মতপ্রকাশে স্বাধীন ছিলেন। দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, সক্রিয় নাগরিক সমাজ ও সংবাদপত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে আধুনিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ছিল। মৌলবাদীরা বাড়াবাড়ি করলে তারা দ্রুতই তৎপর হতো। কিন্তু ব্যাপারটা আর সে রকম নেই। ইসলামপন্থীরা সফলভাবেই সমালোচকদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে। শুধু তা-ই নয়, এরা ক্রমেই জনমত গঠনে প্রভাব ফেলছে। এরপর রাজনৈতিক নেতাদের স্বীকার করতে হবে, দেশে ইসলামপন্থীদের শেকড় বেশ গভীরে চলে গেছে। তাদের ধর্মীয় জঙ্গি চরমপন্থা সামাল দিতে হবে। এটা অর্জিত না হলে বাংলাদেশ আরও বেশি করে ইসলামি মৌলবাদের খপ্পরে পড়তে পারে।

জিহাদি ভাবধারা ছড়াতে ইসলামিক স্টেট ও আল-কায়েদার মতো সংগঠনের শারীরিক উপস্থিতি নয়, প্রচারণাই কাজ করে। এ কারণে দেশে ধর্মীয় ভাবধারাপুষ্ট সহিংসতা ও কট্টরপন্থার বিস্তার হচ্ছে। শেষ কথা হলেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বুঝতে হবে, হোলি আর্টিজান হামলা আমাদের জন্য শেষ ‘ঘুম জাগানিয়া’ বার্তা। মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মতো অভিন্ন আদর্শের ভিত্তিতে তাদের উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে হাত মেলানো, যাতে যৌথভাবে ‘বৈশ্বিক জিহাদের’ মূলোৎপাটন করা যায়।

ইংরেজি থেকে অনূদিত।

ড. সিগফ্রিড ও উলফ: আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক।

 

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/আই এস/এ আর/এইচ কে

০৪ জুলাই, ২০১৭ ০৯:৫৪ এ.ম