President

জ্যোস্না না থাকলে বোধহয় পৃথিবী তার অর্ধেক সৌর্ন্দয থেকে বঞ্চিত করত আমাদের, নিকষ কালো অন্ধকারে অবিচ্ছিন্নভাবে হতো রাতের পৃথিবী। জ্যোস্নালোকের রাতগুলো তাই স্বপ্নের মতো সুন্দর| পাহাড়ের নির্জন চরাচরে শিশিরভেজা নরম ঘাসে বসে কাটিয়ে দিব পুরোটা রাত্রি, নৈঃশব্দের ভাষা বুঝে নেব গভীর মনোযোগে- এমন স্বপ্ন দেখছিলাম অনেকদিন থেকে।

 

এক বন্ধুর কাছে সন্ধান পেলাম জ্যোৎস্নাবাড়ির। আকাশ আর পাহাড়ের দ্বৈততা যেখানে সেখানে না গিয়ে উপায় কি! দলবদ্ধ বন্ধুরা সব যাত্রা করলাম  ঝাঁঝালো এক দুপুরে। ওই সময়ে পাহাড়ে বৃষ্টিবাহী মেঘের আনাগোনাও শুরু হয়। পাহাড় আর আকাশের খুনসুটি মেটাতে যদি বৃষ্টিরানি নেমে আসে তাহলে স্বর্গসুখ মিলবে- তাই  এই সময়টাকেই বেছে নিলাম আমরা। শান্তি পরিবহনে শান্তির ভাতঘুম দিতে দিতে যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নিলাম। খরতাপে ক্লান্ত শহর পেরিয়ে গেলাম দ্রুত। সূর্য তখন পাটে যেতে বসেছে। গোধূলীর সোনারঙা রোদে উজ্জ্বল পথের দুই পাশে বিস্তৃত ধানক্ষেত। এরকম আবেশী গোধূলীতে বাসের চাকা নষ্ট! ঠিক করার জন্য দাঁড় করাল পথের পাশে। শাপে বর হলো যেন! বাস থেকে নেমে অপূর্ব প্রকৃতি দেখে প্রাণভরে শ্বাস নিলাম তারপর গোগ্রাসে চোখে মেখে নিলাম গোধূলীর সোনালি মায়া। অদূরে গ্রাম্য ঝুপড়িতে চা খেয়ে আবার যাত্রা শুরু।

 

 

 

মাটিরাঙা পৌঁছালাম প্রায় রাত ৮টায়। এখান থেকে এরপরের বাহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অটোরিকশার হেডলাইটের আলোতে দেখছি সবুজ বনানী কেটে কেটে প্রবেশ করছি গহিনে। ৩০ মিনিটের যাত্রা শেষ হলো যখ,ন তখন প্রকৃতির মোহনীয় অভ্যর্থনা দেখে মুগ্ধ হলাম। দেখি ঘাসের বুকে আলোর পাখি জোনাকি তারার চাদর বিছিয়ে রেখেছে। চোখ তুলে তাকালাম পাহাড়ের দিকে। অসংখ্য তারকাখচিত আকাশ-এ যেন নক্ষত্রের রাত। এমন ভয়াবহ সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়ালে বুকে ধাক্কা লাগে। জ্যোৎস্না কুটিরে পা রাখলাম। কত বিচিত্র সব পোকামাকড়ের শব্দ। যেন অন্য কোনো পৃথিবীতে এলাম-এত রকম শব্দ, এত রকম বিচিত্র গন্ধ! আকাশে মেঘের খেলা। কখনো ঢেকে দেয় নক্ষত্ররাজিকে, আবার পরক্ষণেই তারা জোর করে উঁকি দেয়। এই অদ্ভুত নিস্তব্ধ রাত্রিতে শিশিরের গন্ধ, আরো নানা বৃক্ষরাজির গন্ধ নিচ্ছিলাম প্রাণভরে। দীর্ঘ রাত বসে থাকলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। মাথার খুব কাছে আকাশ। চরাচরে তীব্র নির্জনতা। এই রহস্যময় পাহাড়ি রাত্রিতে নিজেকে খুঁজে পাই নতুন করে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো এই পাহাড়ি কুটিরে আমরা ক্যাম্প পেতেছি। ঘাই হরিণীর দেখা না মিললেও বিচিত্র পাখ-পাখালি  আমাদের নিরাশ করেনি। তাঁবুর ফাঁকে ঘুম জড়ানো চোখ রাখলাম ভোর দেখব বলে। ভোর এত অপার্থিব সুন্দর হয় কংক্রিটের জঙ্গলে কোনো দিন টের পাইনি! কমলা রঙের সূর্যটা যখন চোখ পাকাল, তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। আহ! চারপাশে ঘন সবুজ বন, তাদের মাঝে উদ্ধত এই জ্যোৎস্নাবাড়ি! প্রকৃতির সতেজ অক্সিজেন নিতে নিতে কুয়ার জলে প্রশান্তি। চায়ের বদলে ডাবের পানিতে সকাল শুরু আর পরাটা-ভাজির বদলে মুড়ি-কলা। এত তৃপ্তির নাশতা কবে খেয়েছি মনে পড়েনা। দুই পাহাড়ের মাঝে লেক। মাছ ও আছে সেই লেকে। যাক! কোনোদিন মাছ ধরার সুযোগ হয়নি। আজ সেটাও পেয়ে গেলাম। আনাড়ি শহুরে মানুষ আমরা তবু মাছ ধরার কায়দা-কানুন আয়ত্ত করে নিলাম। কয়েকজন তো সাঁতার প্রতিযোগাতায় নেমে গেল। আর আমরা যারা সাঁতার জানি না, তারা ফ্রিতে একদিনেই সাঁতার শেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। দীর্ঘ সময় ঝাঁপাঝাঁপি শেষে ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত আমরা একেকজন যেন একেকটা পাহাড় গিলতে পারব তখন। বাগানের তরতাজা সবজি আর লেকের মাছ। মাটির চুলায় রান্না অসাধারণ। এখন বুঝি কেন মাটির চুলার রান্না এত সুস্বাদু। অন্যরকম গন্ধ সেই রান্নায়। যা অন্য কোথাও তা মিলবে না। আহারের বাহার আমাদের মুগ্ধ করল আরেকবার। এ রকম সময়ের টিকটিক চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে অকৃত্রিম দুটি দিন কাটিয়ে দিলাম। যখন জ্যোৎসানাবাড়ির সবুজ জঙ্গল পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম কংক্রিটের জঙ্গলে- মনটা আপনাতেই বিষিয়ে উঠল। রবিবাবু ঠিকই বলেছিলেন-দাও ফিরে এ অরণ্য, লও হে নগর। দুদিন ধরে ফুসফুসে জমানো অক্সিজেন বাঁচিয়ে রাখবে আর কটা দিন। আবার যখন বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড বিষিয়ে তুলবে ফুসফুস ঠিক ছুটে আসব এই সবুজ জঙ্গলে।

সতর্কীকরণ

 

এখানে মিলবে না বিদ্যুতের সুবিধা, এসির ঠান্ডা হাওয়া, ফ্রিজের শীতল পানি। বরং মিলবে সৌর বিদ্যুৎ, কুয়ার ঠান্ডা জল, সারিবদ্ধ বৃক্ষের ছায়া আর শরীরজুড়ানো বাতাস, পাখিদের গান, লেকের তাজা মাছ, বাগানের ফল-সবজি। নাগরিক জীবন এখানে বেমানান। প্রকৃতি এখানে তার আপন মহিমায় উপস্থিত।

 

যেভাবে যাবেন

 

ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে এসি/ননএসি গাড়ি করে আসতে হবে মাটিরাঙা (খাগড়াছড়ি)। এস আলম, সৌদিয়া, শান্তি পরিবহনসহ বিভিন্ন বাস সার্ভিস আছে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত, ননএসি ভাড়া ৫২০,  এসি বাস ৯০০। মাটিরাঙা থেকে সিএনজি বা বাইকে করে জ্যোৎস্নাবাড়ি যাওয়া যায়, বাইকে জনপ্রতি ৪০ টাকা। জ্যোৎস্নাবাড়িতে রাতযাপন ও তিন বেলা আহারে জনপ্রতি গুনতে হবে ১২০০-১৫০০ টাকা পর্যন্ত। যোগাযোগ : ০১৮১৫-৮৫৬৪৯৭,  ০১৫৫৬-৭১০০৪৩

০২ জুলাই, ২০১৭ ১৪:৪৮ পি.এম