President

গত কয়েকদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির কারণে ঢাকার অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন হওয়ায় অনেক রাস্তাঘাট চলাচলের জন্য কষ্টসাধ্য, এমনকি অসম্ভব হয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন ধরনের পরিবহন আটকে থেকে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। ঢাকায় এমনিতেই সব সময় যানজটে রাস্তার অবস্থা খারাপ থাকে। এমনকি শুক্রবার সকালের দিকে কিছুক্ষণ ছাড়া বাকি সময়ে সপ্তাহের অন্যদিনের মতোই যানজট হয়। বৃষ্টির সময় রাস্তাঘাটে কোনো কোনো জায়গায় হাঁটু পর্যন্ত পানি জমে। এই অবস্থা যে আরও খারাপ হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এখন এই অবস্থা 'স্বাভাবিক' হলেও কোনো স্বাভাবিক কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এটা মানুষেরই কীর্তি, যে মানুষেরা প্রশাসন চালাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করছে, বিশেষত ভূমিদস্যুতা করে যারা ঢাকায় পানি নিস্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় খালবিল ভর্তি করে তার ওপর দালানকোঠা বানাচ্ছে।

বৃষ্টি হলে পানি মাঠঘাট থেকে নিয়ে ঢাকার মতো শহরের ওপরও পড়তে থাকে। কিন্তু এভাবে বৃষ্টির পানি পড়ে তার যদি নিস্কাশনের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেটা যে রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে থাকবে, এটা বলাই বাহুল্য। ঢাকায় তাই হচ্ছে। আগে ঢাকার খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি বের হয়ে চারদিকের নদীগুলোতে পড়ার যে ব্যবস্থা ছিল, সেটা সংকুচিত হতে হতে এখন এমন অবস্থা হয়েছে, যাতে বৃষ্টির পানি তাড়াতাড়ি সরার উপায় নেই। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এ জন্য বৃষ্টি থামার পরও জমে থাকা পানির জন্য চলাচল বিঘ্নিত হয়।

ঢাকা শহরের ভেতরকার খালগুলো ভূমিদস্যুদের দ্বারা দখল হতে থাকার বিষয়টি সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের অজানা নয়। শুধু তাই নয়, এই পরিস্থিতির যাতে উন্নতি হয় এবং নতুন করে খাল ও অন্যান্য জলাশয় যাতে দখল না হয়, এ বিষয়ে সরকারি মহল থেকে প্রায়ই নানা ধরনের আশ্বাস ও প্রতিজ্ঞার কথা শোনা যায়। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে চলা সত্ত্বেও এমন কোনো সরকারি বা স্থানীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপের দেখা পাওয়া যায় না, যার দ্বারা এ পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ও পরিবর্তন হতে পারে। উপরন্তু বাস্তবত দেখা যায় যে, ভূমিদস্যুরা এসব সরকারি কথাবার্তা, প্রতিশ্রুতি ও প্রতিজ্ঞার কোনো তোয়াক্কা না করে তাদের ভূমি দখল অভিযান অব্যাহতই রাখে। এটা শুধু ঢাকার ভেতরকার নালা ও জলাশয়ের ক্ষেত্রেই নয়, ঢাকার চারদিকে চারটি বড় নদীর ক্ষেত্রেও এদিক দিয়ে পরিস্থিতি একই রকম। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি ও সমালোচনা হলেও অবস্থার উন্নতির পরিবর্তে একটানাভাবে অবনতিই ঘটে চলেছে।

'চার নদীর সঙ্গে ২৬ খাল যুক্ত হলে ঢাকা বাঁচবে'- এই শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় (২৩.১০.২০১৭) একটি দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, 'জেলা প্রশাসনের হিসাবে ঢাকায় খালের সংখ্যা ৫৮টি। এর মধ্যে ২৬টি এখনও সচল করা সম্ভব বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। তারা এই ২৬ খালকে ঢাকার চার নদীর সঙ্গে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে এর জন্য খালগুলোকে দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে।' এই রিপোর্ট থেকেই দেখা যাচ্ছে যে, ঢাকায় ৫৮টি খালের প্রত্যেকটি এখন দখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে ৩২টি খাল পূর্বাবস্থায় ফেরানোর কোনো সম্ভাবনাই যে নেই, এটা রিপোর্ট থেকেই বোঝা যায়। কারণ এগুলোর ওপর বিল্ডিং তৈরি হয়েছে খুব প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের দ্বারা। অন্য ২৬টিও দখল হয়েছে; কিন্তু তার ওপর এখনও বড় বিল্ডিং ওঠেনি। কাজেই সেগুলো দখলমুক্ত করে সচল করা যায়। কিন্তু এটাও যে বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব, তা বোঝার অসুবিধা নেই। কারণ, সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত যে ভূমিদস্যু দখলদাররা ৩২টি খাল দখল করে তার ওপর বিল্ডিং বানিয়েছে, বাকি ২৬টি খাল তাদেরই মতো লোক দখল করে রেখেছে, সেই দখল ছাড়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে বাধ্য করার ক্ষমতা সরকারের নেই। কারণ, এই দখলদাররা সরকারেরই লোক অথবা সরকারি লোকদের সঙ্গে তারা নানাভাবে সম্পর্কিত।

সিইজিআইএস-এর উপনির্বাহী পরিচালক প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'ঢাকায় পানি নিস্কাশনের একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ছিল। শহরের পাশের নদীগুলোর সঙ্গে শহরের ভেতরের খালগুলোর সংযোগ ছিল। এই খালগুলোর সঙ্গে যদি নিস্কাশন নালাগুলোর সংযোগ থাকত, তাহলে বৃষ্টির পানি সড়ক থেকে নালা দিয়ে খাল হয়ে দ্রুত নদীতে গিয়ে পড়ত। কিন্তু খালগুলো সব ভরাট হয়ে গেছে। খালের সঙ্গে নদীগুলোর সংযোগও বিচ্ছিন্ন। তাই সামান্য বৃষ্টিতেই পানি সড়কে জমে যায়। এর পর প্রথম আলো তাকে জিজ্ঞেস করে, 'সব খাল ও জলাভূমি তো প্রভাবশালীদের দখলে। এগুলো কি আদৌ উদ্ধার করা সম্ভব?' উত্তরে তিনি বলেন, 'সিটি করপোরেশন যদি মনে করে তারা জলাবদ্ধতা কমাবে, তাহলে তাদের এই কাজ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।' কিন্তু বাস্তবত সরকার বা সিটি করপোরেশনের দ্বারা এ কাজ যে সম্ভব নয়, এটা বছরের পর বছর ধরে প্রমাণিত হয়ে এসেছে। তাদের চোখের সামনে ও নাকের ডগায় খাল দখলের কাজ হতে থাকলেও তারা তা বন্ধ করতে পারেনি বা করেনি। কারণ, যারা এভাবে খাল দখল করছে, সিটি করপোরেশন চালায় তাদেরই মতো লোকেরা। এই অবস্থার পরিবর্তন যে এখন ঘটবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। একের পর এক সরকারের আমলে দল নির্বিশেষে এটাই চলে আসছে।

এই একই অবস্থা যে বজায় থাকবে এবং এর অবনতি যে হতেই থাকবে, এটা নিশ্চিত হওয়ার মতো একটি রিপোর্টও একই দিনের প্রথম আলোতে প্রকাশ হয়েছে। 'বোয়ালিয়া খাল ভরাট করছে পুলিশের সমিতি'- শীর্ষক একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, 'রাজধানীর উত্তরাংশে বিস্তীর্ণ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একদিকে চলছে পাঁচ হাজার কোটি টাকার নতুন খাল খনন প্রকল্প, অন্যদিকে একই এলাকার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বোয়ালিয়া খালের একটি অংশ ভরাট করে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের সমিতির বিরুদ্ধে। খিলক্ষেত এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য এই আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতি। কিন্তু 'জলাধার আইন লঙ্ঘনের' অভিযোগ এনে খালটি ভরাট না করার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গত এপ্রিলে সমিতিকে চিঠি দেয়। এখন পর্যন্ত খালের ভরাট অংশ পুনরুদ্ধারে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন রাজউকের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান। তবে পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খাল ভরাটের অভিযোগের বিষয়টি নিছকই 'অপপ্রচার'। প্রকল্পের জন্য খালের যে অংশটুকু ভরাট করা হয়েছে, তা তাদের কিনে নেওয়া। এতে আইন লঙ্ঘন হয়নি।

পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে দেওয়া এই বক্তব্য চমৎকার! এর মধ্যেই বাংলাদেশের অবস্থা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়। যেসব খাল ঢাকার ভেতরে ও তার চারপাশে আছে, সেগুলো তো কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সব খাল-নদীর মালিকানা সরকারের অথবা তার অধীন বিভিন্ন সংস্থার। এই অবস্থায় পুলিশ সমিতি কার কাছ থেকে বুঝিয়ে দেওয়া খালের অংশ কিনেছে? তার দলিলপত্র কই? রাজউক পুলিশ সমিতির এই দখলদারির বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও এ বিষয়ে তারা কি তাদের থেকে এর কোনো প্রমাণ চেয়েছে? এভাবে খাল কিনে নেওয়ার বিষয়টি যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, এটা খুবই স্পষ্ট। তাছাড়া সরকার নতুন খাল প্রকল্প হাতে নেওয়া সত্ত্বেও একই এলাকায় কীভাবে সরকারেরই অধীন পুলিশদের সমিতি খাল ভর্তি করতে পারে জবরদখল বা 'কেনার' মাধ্যমে- এটাও এক অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার। এসব হলো চোখ খুলে দেওয়ার মতো ব্যাপার।

লক্ষ্য করার বিষয় যে, এসব নিয়ে এ ধরনের রিপোর্ট প্রদান, সমালোচনা, সরকারি পরিকল্পনার কথা যতই বলা হোক, কার্যক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনাই নেই। কারণ এসব দখলদারি যারা চালাচ্ছে, তারা সরকারের লোক ও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সে সরকার যে দলেরই হোক। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ প্রক্রিয়া শক্তিশালীভাবে জারি আছে। কাজেই এর দায়িত্ব সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকে অবশ্যই নিতে হবে। কিন্তু মাঝে মাঝে তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপের কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে কিছুই হয় না। এটাই এখনকার বাস্তব পরিস্থিতি।

সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

 

২৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০৯:৫৩ এ.ম