President

স্কুলে সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের শুরুতে ‘সভ্যতার বিকাশ’ শিরোনামে একটা চ্যাপ্টার ছিল। সেখানে পড়েছি, সভ্যতার বিকাশে আগুনের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। মানুষ যেদিন পাথরে পাথর ঘঁষে আগুন জ্বালাতে শিখলো, সেদিন থেকে নাকি সভ্যতার অগ্রযাত্রা শুরু। আসলে আমাদের ভুল শিক্ষার শুরু সেখান থেকেই।


একটু বুঝিয়ে বলি। আমাদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বাসে-প্রাইভেট কারে আগুন দেয়, টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে। খবরে বলা হয়, দাবি আদায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ কিংবা কিঞ্চিত আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় তারা আগুন ইস্তেমাল করেছে। খবরে যেটা বলা হয় না, আসলে ওরা সভ্যতার বিকাশ ও অগ্রযাত্রাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ওই চ্যাপ্টার স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এখনো বহাল তবিয়তে আছে।


সময় এখন বিকৃত ইতিহাস বাদ দিয়ে মানবসভ্যতা বিকাশের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার। ইতিহাসের এই দায় এবং পূর্বপুরুষের আজন্ম ঋণ থেকে বলছি, সত্যিটা হলো মানবসভ্যতার বিকাশে ডিমের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। মানুষ যেদিন হাঁস-মুরগিকে বোকা বানিয়ে তাদের ডিম হাতিয়ে নিতে শিখেছে, সেদিন থেকে সভ্যতার বিকাশ শুরু।
ডিমের বহুমুখী ব্যবহার মানুষকে করেছে বলবান (অমলেট, মামলেট, পোজ, ভাজি, হাফ বয়েলড, ফুল বয়েলড ইত্যাদি) এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে করেছে বেগবান (পচা ডিম ছুঁড়ে মারা, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ডিমের পশ্চাতমুখী ব্যবহার, ঘোড়ার ডিম ইত্যাদি)।


প্রকৃতপক্ষে, মানুষ ও ডিম একে অন্যের পরিপূরক। মানুষের জন্মপ্রক্রিয়া শুরুই হয় ‘ডিম্বাশয়’ থেকে। জন্মের পর জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয় ডিমময়। বাচ্চাকালে কখনোই ডিম খায় নাই এমন মানবসন্তানের হদিস মেলা ভার।
শৈশবে ভালো-খারাপের মধ্যে পার্থক্য শেখাতে এবং অভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাতেও রয়েছে ডিমের ভূমিকা। আদর করে মুখে তুলে দেয়া ডিম আর পরীক্ষায় খাতায় পাওয়া ’জোড়া ডিম’ যে এক বস্তু নয়, তা অভিভাবক-শিক্ষকের পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়াতে স্পষ্ট হয়।


ডিম সম্পর্কে কতিপয় অগুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ
>> মানুষের মতো পৃথিবীর বিকাশেও রয়েছে ডিমের অবদান। ইনফ্যাক্ট পৃথিবীর সৃষ্টিরহস্য ডিমের মধ্যেই নিহিত। কারণ, আমাদের পৃথিবী গোলাকার নয়, ডিম্বাকার। সৃষ্টিরহস্য বুঝতে জ্ঞানীদের জন্য ডিমই (ইশারার বিকল্প) যথেষ্ট।
>> ডিম আগাগোড়া অসাম্প্রদায়িক খাবার। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের খাবার টেবিলে ডিমের থাকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ডিম একই সঙ্গে শ্রেণিহীন সমাজের আদর্শ খাবার। ধনী-গরীব, কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-ব্যাচেলর, বেকার সবাই ডিম খায়।
>> অ্যা ফ্রেন্ড ইন নিড ইজ অ্যা ফ্রেন্ড ইনডিড। ঐতিহাসিকভাবে ডিম ব্যাচলরদের প্রকৃত বন্ধু। আসলে বন্ধুর চেয়েও একটুখানি বেশি। হাল্কা ঝোলে এবং ঝালে ডিমই মূলত ব্যাচেলরদের শেষ ভরসা।
>> মানুষ ভালোবেসে ডিম খাওয়ায়, ভালো না লাগলে ছুঁড়ে মারে। কাউকে চূড়ান্ত অপদস্থ করতে ডিম ছুঁড়ে মারা হয়।
>> ডিমের সঙ্গে কোন ধরনের সম্পর্ক না থাকলেও ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ঘোড়ার নাম জুড়ে দেয়া হয়। ঘোড়ার ডিম বা অশ্বডিম্ব কেন বলা হয়, তা আজও জানা যায়নি।
>> কবিতায় উপমা হিসেবে ডিমের সার্থবক ব্যবহার করেছেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি লিখেছেনে, সোনার ডিমের মতো ফাল্গুনের চাঁদ।
>> মানুষের হৃদয় আর ডিম একই রকম। বাইরে শক্ত মনে হলেও ভেতরটা নরম। দুটোই অল্প আঘাতে ভেঙ্গে যায়। তাই ডিম ও হৃদয় সাবধানে রাখতে হয়।
>> ডিমকে স্বীকৃতি দিতে মানুষের কেন জানি অনীহা। পরীক্ষায় ডিম পাওয়ার কথা সচরাচর কেউ স্বীকার করতে চায় না। অপ্রকাশিত খবরে শোনা যায়, বিশেষ ব্যক্তিদের খাতির যত্নে পুলিশ নাকি ডিম দেয়। তবে এই ডিম কীভাবে-কোথায় দেয়া হয় এ বিষয়ে কোন পক্ষের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি মেলে না।

শেষকথাঃ
ডিম অনকেইে পাড়ে। তবে প্রাণীজগতে ডিমের জন্য সবচয়েে বেশি উচ্চারিত হয় মুরগির নাম। সভ্যতার বিকাশে মুরগি তার ডিম দিয়ে অবদান রেখে চললেও কোনদিন স্বীকৃতি পায়নি। এ নিয়ে ব্যাপক ডিম ছোঁড়াছুড়ি হওয়ায় অবশেষে চলতি বছর নোবলে কমিটি মুরগিকে পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিনোদন মাধ্যমে খবর বেরোয়, পুরস্কার ঘোষণার আগের দিন নোবেল কমিটি মুরগিকে টেলিফোনের কাছাকাছি থাকতে বলেছিল। ডিমে তা দেয়ার ব্যস্ততা থাকায় ফোনের কাছাকাছি থাকা হয়নি মুরগির। এ বিষয়ে কর্মবীর মুরগির বক্তব্য- স্বীকৃতির আশায় ডিম পাড়ি না। ডিম পাড়ি মনের আনন্দে।

লেখকঃ সাংবাদিক, দৈনিক জনকণ্ঠ 


টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

 

১৪ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:৫৮ এ.ম