President

এবার শান্তিতে নোবেল পেয়েছে আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান 'ক্যাম্পেইন টু অ্যাবলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস (আইক্যান)'। বিশ্বের ১০১টি দেশের সাড়ে চার শতাধিক সংগঠন এই প্রচারাভিযানের সঙ্গে যুক্ত। এর সঙ্গে আছে বাংলাদেশের দুটি সংগঠন- ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি, বাংলাদেশ (পিএসআরবি) ও সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ (সিবিএস)। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার জন্য আইক্যানের এ তৎরতাকে অভিনন্দন জানাই। এটি আমাদের জন্য সুখকর যে, পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার সংগ্রামে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই; বাংলাদেশের দুটি সংগঠনও এতে শরিক।


পরাশক্তিসহ কিছু দেশের হাতে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র; ভয়ঙ্কর দানবীয় শক্তি। যার ভয়াবহতা আমরা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে দেখেছি। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র নিক্ষিপ্ত বোমায় দেড় লাখ নর-নারী-শিশু প্রাণ হারিয়েছিল। প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়েই এর প্রতিক্রিয়া শেষ হয়ে যায়নি। লাখো মানবসন্তানকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। এমনকি পরবর্তী সময়ে যেসব শিশু জন্ম নিয়েছিল, তাদেরও বহন করতে হয় এই দানবীয় থাবার চিহ্ন। কারও দ্বিমতের সুযোগ নেই- পৃথিবীর মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে এই পারমাণবিক অস্ত্র।


২০১৬ সালে প্রখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে আসছে; বড়জোর এক হাজার বছর টিকে থাকতে পারে। এ বছর মে মাসে 'এক্সপেডিশন নিউ আর্থ' নামক বিবিসির এক তথ্যচিত্রে তিনি মন্তব্য করেছেন, পৃথিবী ১০০ বছর টিকে থাকতে পারে। আর জুনে নরওয়ের এক বিজ্ঞান ফেস্টিভ্যালে বললেন, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেতে আর দেরি নেই; বর্তমান যে অবস্থা তাতে আর মাত্র ৩০ বছর টিকবে পৃথিবী। জলবায়ু পরিবর্তন মারাত্মক হুমকি। তবে আরও বেশি হুমকি পারমাণবিক অস্ত্র। কয়েক ঘণ্টায় কিংবা এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে মানবসভ্যতা।


এর আগে মনে হতো, পারমাণবিক অস্ত্র আর ব্যবহূত হবে না। বরং এই মারণাস্ত্র্প পরাশক্তিধরদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করছে। এখন পারমাণবিক অস্ত্রধরদের হম্বিতম্বি শুনে মনে হচ্ছে, এর থাবা থেকে বিশ্ব আর নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও উত্তর কোরিয়ার নেতা যেভাবে কথা ছোড়াছুড়ি করছেন, তা সমগ্র বিশ্বকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দাঁড়িয়ে উত্তর কোরিয়াকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। জবাবে উত্তর কোরিয়ার প্রধান নেতা কিম জং উন ট্রাম্পকে উন্মাদ ও মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। টুইট বার্তায় ট্রাম্পও কিমকে পাগল সম্বোধন করে বলেছেন, কিমকে এমন পরীক্ষায় ফেলবেন, যা কখনও ভাবেননি। দুই 'পাগলে'র হাতে দানব-বোমা; বিশ্ব এ থেকে কতটুকু নিরাপদ?


এই মারণাস্ত্র রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ ৯টি দেশের কাছে। ইরানের কাছেও থাকতে পারে। একটি-দুটি নয়, সব মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার বোমা (যুক্তরাষ্ট্র ৬৬৮, রাশিয়া ৭০০, যুক্তরাজ্য ২১৫, ফ্রান্স ৩০০, চীন ২৭০, ইসরায়েল ৮০, উত্তর কোরিয়া ৬০, ভারত ১৩০ ও পাকিস্তান ১৪০- সূত্র :বিজনেস ইনসাইডার)। এখন পরাশক্তি বা অঢেল সম্পদশালী দেশই কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক নয়। পারমাণবিক ক্লাবে নাম লিখিয়েছে আমাদের দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। ভারত বৃহৎ দেশ হলেও সেখানে এখনও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তচিৎকার আছে, অগণিত মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পায় না, শত সহস্র শিশুর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয় না। পাকিস্তানের অবস্থা আরও খারাপ। অথচ দেশ দুটি পারমাণবিক শক্তিধর হয়ে হুঙ্কার ছুড়ছে। মানবসেবার চেয়ে অস্ত্রসেবাই যেন তাদের ব্রত। আর তাদের এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা কেবল দুই দেশেরই নয়; ঘুম কেড়েছে আমাদেরও।


এখন যেসব পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি হচ্ছে, তা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত বোমার চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এর মানে, এসব বোমা দিয়ে পৃথিবীকে কয়েকশ'বার ধ্বংস করা যাবে। রাজনীতিকদের খামখেয়ালি ছাড়াও যন্ত্রের মতিভ্রমও অঘটন ঘটাতে পারে। যেমনটি ঘটতে চলেছিল ১৯৮৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরে। রাশিয়ার এক কর্মকর্তা দেখলেন, মার্কিন ব্যালিস্টিক মিসাইল সে সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ধেয়ে আসছে। সেটি ছিল যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত সমস্যা। তিনি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝেছিলেন, এমনটা হওয়ার কথা নয়। তাই তিনি নিশ্চিত হতে সময় নিয়েছিলেন। তার এ দূরদৃষ্টিতে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় বিশ্ব।


যে ৯টি দেশের পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তাদের এ মরণখেলা থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশসহ ১২২টি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র নিরোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও এর বাইরে উন্নত-অনুন্নত অনেক দেশ রয়েছে। যারা এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি, তাদের মধ্যে হয়তো কেউ কেউ এ পারমাণবিক শক্তিধর হতে স্বপ্ন দেখছে।


মানবসভ্যতাকে বাঁচাতে বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে হবে। এর বিকল্প নেই। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? এ ক্ষেত্রে আইক্যান যে প্রচারাভিযান করছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রচারাভিযানের মধ্য দিয়ে জোরদার হতে পারে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্বের পক্ষে জনমত; যা পারমাণবিক অস্ত্রধর দেশগুলোর সরকারকেও প্রভাবিত করতে পারে। তবে প্রচারাভিযানই শেষ কথা নয়। এ আত্মঘাতী প্রবণতার পেছনের কারণগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। আমরা দেখছি, পৃথিবীর যত দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে, ততই দ্রুত ধ্বংসের পথে অগ্রসর হচ্ছে। কারণ এ উন্নয়ন ভাবনায় মানুষ ও প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্ব সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে বৃহৎ শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পুঁজির বিকাশ, আধিপত্য বিস্তারের নীতি। এই আত্মঘাতী প্রতিযোগিতায় ব্যাপকভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হচ্ছে; বন-জঙ্গল ধ্বংস হচ্ছে। আর গড়ে তোলা হয়েছে মারণাস্ত্রের ভান্ডার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশের আয়ের বড় খাত অস্ত্র ব্যবসা। আর অস্ত্রের খরিদ্দার জোগাড় করার জন্য দরকার যুদ্ধ-বিগ্রহ। তাই সুকৌশলে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের যুদ্ধ বাধিয়ে বা সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে অস্ত্র বিক্রির পথ সুগম করা হয় বা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও সংঘাতের পেছনে অন্যতম কারণ যে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির দুরভিসন্ধি- তা প্রমাণিত সত্য। এখন মধ্যপ্রাচ্য পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অস্ত্রবাজারে। তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য এখন ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে জড়িয়ে পঙ্গুপ্রায়।


যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষ কেবল মুনাফার পেছনে ছোটে, যে কোনো উপায়ে পুঁজি আহরণে প্রবৃত্ত হয়, তখন রাষ্ট্রও ওই ব্যবস্থা রক্ষা ও বিকাশে দানব হয়ে ওঠে। সেই অমানবিক রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা বহাল রেখে যুদ্ধ, হামলা, অস্ত্র বাণিজ্য, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তন রোধেও পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। সে স্থলে প্রয়োজন রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন। তাই সঙ্গত কারণেই সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রাম ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার সংগ্রাম এক সুতোয় গাঁথা। আমাদের মনে রাখতে হবে- যখন পুঁজির পুঞ্জীভবন প্রক্রিয়া থাকবে, তখন লুটপাট থাকবে; আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা থাকবে। যে কারণে যুদ্ধ, অস্ত্র ব্যবসা, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে না। বিশ্বকে মানবিক ও সব মানুষের বাসযোগ্য করতে হলে দানবীয় শক্তির পতন ঘটাতে হবে। তবেই কেবল পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে উঠতে পারে।


অস্ত্রের শক্তির চেয়ে মানুষের শক্তিই বড়। যুগে যুগে মানুষেরই ইচ্ছায় সমাজ বদলেছে, গড়ে উঠেছে নতুন সমাজ। আজ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার যে আওয়াজ উঠেছে, তাতে আমাদের কণ্ঠ মেলাতে হবে। দুনিয়াজোড়া শান্তিকামী মানুষদের হাতে হাত ধরে আনতে হবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত, শোষণমুক্ত নতুন বিশ্ব। প্রমাণ করতে হবে- আইক্যান, উই ক্যান।


টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

১১ অক্টোবর, ২০১৭ ১৭:২৮ পি.এম