President

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ গ্রামে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি। উপমহাদেশে জোড়াসাকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারির তীর্থস্থান ও কবিগুরুর সাহিত্য আর ইতিহাসের অন্যতম স্থান এই কুঠিবাড়ি। ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারের দায়িত্ব নিয়ে কুঠিবাড়িতে আসেন।

পদ্মা নদীর তীর ঘেষা সবুজ অরণ্যে আর নীল সাদা মেঘের গোধূলি লগ্নে প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্য এবই সেই সাথে পড়ন্ত বেলায় সোনালি রোদে খেয়া পারাপারের চিত্র আর জেলেদের মাছ ধরার নানা আয়োজন যেকাউকে আকৃষ্ট করবে। এখানে ফুটে উঠেছে চিরায়ত গ্রামীণ জীবন-যাপনের সাথে প্রকৃতির নৈসর্গিক প্রেম। যেখানে কবিগুরু রচনা করে গেছেন সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, গীতাঞ্জলীর মতো বিখ্যাত সব গ্রন্থ।

যা দেখবেন

পদ্মা নদীর ঢেউয়ের আকৃতির প্রাচীর বেষ্টিত তিনতলার পিরামিড বাড়িটি প্রবেশের আগেই বহু দূর থেকে আপনাকে হাতছানি দেবে। দূর থেকে তাকালে মনে হবে, অসাধারণ একটি প্রতিকৃতি যেন কাগজ দিয়ে তৈরি। বাড়িটির চারপাশে রয়েছে সবুজ ঘাসের গালিচা, তার ওপর নানা রঙের ফুল গাছের সমারোহ। আর সৌন্দর্য বিলিয়ে দেওয়া ঝাউ গাছ, সেই সঙ্গে পাখির কলতান, আশপাশের প্রাকৃতির সৌন্দর্য যেকোনো পর্যটককে মুগ্ধ করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এ যেন শান্তিরও বাড়ি। ফটক দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে রবীন্দ্র সংগীতের মৃদু সুরের মুর্ছনা আপনাকে স্বাগত জানাবে। বাড়িটির ওপর থেকে নিচ তলার ষোলটি কক্ষজুড়েই রয়েছে কবিগুরুর কুঠিবাড়ীর জীবনের বিভিন্ন চিত্রকর্ম, চিঠিপত্রের অনুলিপি, কবিগুরুর নিজ হাতে আঁকা চিত্র। যেগুলো এখনো রচনা করে চলেছে কবিগুরুর স্মৃতির পৃষ্ঠা থেকে পৃষ্ঠা, উঠে এসেছে ছেলেবেলা থেকে রবীন্দ্রনাথের জীবনের নানা চিত্র।

এ ছাড়া রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার করা সোফা, আলমারি, লোহার সিন্দুক, আরাম চেয়ার, খাট-পালং। যেগুলোর ওপর দৃষ্টি পড়তেই আপনাকে নিয়ে যাবে ১৮ শতকের পুরোনো জমিদারি ঐতিহ্যে। আর সেখানে যত্নে রাখা হয়েছে আট বিহারার পালকি। কথিত আছে, স্থলপথে পালকি ভ্রমণ ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। সেখানে রয়েছে চপলা ও চঞ্চল নামে দুটি স্প্রিডবোট এবং পদ্মাবোট নোঙর। লক্ষণীয় হলো যে, প্রদর্শনীগুলো বহুবছরের পুরোনো হলেও নিবিড় তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করায় এগুলোর উজ্জ্বলতা এখনো দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয়।

বাড়িটির পশ্চিম পাশে রয়েছে কবিগুরুর প্রিয় দীঘি ও বকুলতলা। যে জায়গাটি সাক্ষী হয়ে আছে কবিগুরুর অসংখ্য গান-কবিতার সঙ্গে। বাড়িটির পূর্ব দিকে রয়েছে মার্বেল পাথরে খদিত রবীন্দ্রনাথের চিত্র ও রবীন্দ্র রচিত কিছু বাণী, যা আপনাদের অভয়বাণী দেবে। বাড়িটির সামনে রয়েছে খোলামঞ্চ, যেখানে প্রতি বছর রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর একটু সামনেই রয়েছে ফাঁকা মাঠ, যেখানে মেলার আয়োজন করা হয়। তার পাশেই রয়েছে অনেক দোকান। যেখানে রয়েছে কারুকার্যে খচিত রবীন্দ্রনাথের প্রতিমূর্তি, একতারা, কাঠের নানা শোপিস। কুঠিবাড়ির সবখানে মিশে আছেন রবীন্দ্রনাথ।

যা দেখতে পারেন

শিলাইদহ কুটিবাড়ির সাথে ঘুরে আসতে পারেন লালনের আখড়া থেকেও। লালনের কুঠিবাড়ি থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে। কুঠিবাড়ি থেকে সিএনজি বা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় করে মিলিত হতে পারেন লালন সাইজির ছেউরিয়া গ্রামের আরশিনগরে। যেখানে চিরনিন্দ্রায় শুয়ে আছেন লালন শাহ ও তাঁর মা মতিজান ফকিরানী এবং সাঁইজির ৩২ জন সাথী। এখানে রয়েছে আধুনিকায়ন লালন একাডেমি। লালন আঙিনায় উত্তরসূরি বাউল সম্রাটের গানের আসন বসিয়ে থাকেন। সেখানে আপনার ভ্রমণ বিলাসের কিছুটা সময় কাটিয়ে নিতে পারেন।

লালন শাহের মাজার থেকে সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটায় গিয়ে কিছুটা জিরিয়ে নিতে পারেন। অর্থাৎ লালন শাহের আখড়া থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে ওই ভিটা।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে কুষ্টিয়ায় যেতে পারেন। এ জন্য গাবতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে এসবি সুপার ডিলাক্স, হানিফ, শ্যামলী, একেজে ট্রাভেল বাসে উঠতে পারেন। এসি বাসে খরচ পড়বে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা। আর নন-এসি বাসে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা থেকে প্রতিদিন চিত্রা ও সুন্দরবন নামের দুটি ট্রেন ছেড়ে যায় কুষ্টিয়ার উদ্দেশে। কমলাপুড় থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছাড়ার সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিট এবং চিত্রা ছাড়ার সময় সন্ধ্যা ৭টা। তবে ট্রেনে গেলে আপনাকে নামতে হবে কুষ্টিয়ার পোড়াদাহতে। সেখান থেকে মাত্র ২০ টাকায় কুষ্টিয়া শহরে আসতে হবে। এই শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে শিলাইদহ গ্রাম। সেখানে যেতে খরচ হবে মাত্র ৩০ টাকা। কুঠিবাড়িতে প্রবেশ করতে আপনাকে দিতে হবে মাত্র ২০টা। সব মিলিয়ে আপনার খরচ হবে ৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

কুঠিবাড়ির আশপাশে থাকার জন্য রয়েছে ডাকবাংলা। পূর্ব অনুমতি থাকলে সেখানে রাত্রি যাপন করতে পারবেন। তবে কুষ্টিয়া শহরে থাকার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেলসহ রয়েছে অনেক থাকার স্থান। যেখানে আপনার বিশ্রামাগার হতে পারে আরামদায়ক। যেমন আজমেরি হোটেল, দিশা গেস্ট হাউজ, হোটেল আল আমিন, হোটেল গোল্ডস্টার ও হোটেল রিফিউ।


টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

০৮ অক্টোবর, ২০১৭ ১৫:০১ পি.এম