President

এখনো বেঁচে আছেন তিনি। জীবন্ত কিংবদন্তি কুমুদিনী হাজং। টংক আন্দোলনে এক বাঁক ঘোরানো মুহূর্তের কুশীলব। অথচ বিস্মৃতির অতলে মলিন হয়ে আছেন এই মুখ। বয়সের ভারে ভুলে গেছেন সবকিছু। মাঝেমধ্যে কিছু স্মৃতি মনে আসে। তবে বেশির ভাগ সময়েই অগ্নিদিনের সেই স্মৃতিগুলো মনে করতে পারেন না। বয়সের জড়তা ভুলিয়ে দিচ্ছে সব।

সেই বিস্মৃতির মলিন হাওয়া লেগেছে তার উত্তরসূরিদের মধ্যেও। সেই গৌরবের অহংকারের ইতিহাস জানা নেই তাদের! অনেকেই বলতে পারেন না, কুমুদিনী হাজং কে ছিলেন, কী ছিলেন। এমনকি তাঁর পরিবারের এ প্রজন্মের সদস্যরাও বলতে পারে না তাঁর আন্দোলনের ইতিহাস। এলাকার তরুণরাও জানে না, কে ছিলেন তিনি? কী তাঁর বীরত্বের ইতিহাস?

ব্রিটিশ শাসকের মদদে জমিদারি শোষণ ব্যবস্থার যে চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছিল, তার বিরুদ্ধে কৃষকদের গড়ে ওঠা আন্দোলনের ভেতর টংক আন্দোলন অন্যতম। জমিদারদের একচেটিয়া শোষণ আর নির্দয় খাজনাপ্রথার বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালে শুরু হওয়া টংক আন্দোলনের সঙ্গে কুমুদিনী হাজংও আমাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছেন। যে মাটিতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল, সেখানকার তরুণরাই জানে না সেই সব উত্তাল দিনের কথা। তাদের জানানোর জন্যও নেই যেন কেউ।

কুমুদিনী হাজংয়ের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য সোমেশ্বরী নদীর তীরে বহেরাতলী গ্রামে তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। পথে পথে কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে। যে কয়জনের সঙ্গে কথা হয়, তাদের মধ্যে বেশির ভাগ তরুণই বলতে পারেনি কুমুদিনী হাজং কে। এখন তাঁকে খুঁজতেও আসে না কেউ।


বিরিশিরি ভ্রমণে আসা দর্শনার্থীদের রিকশায় ঘোরানোর কাজ করেন রিকশাচালক বাবুল। পর্যটকদের বিভিন্ন স্পট ঘোরাতে অন্যদের তুলনায় তিনি বেশি এগিয়ে। এলাকায় তাঁর পরিচিতিও আছে বেশ। প্রায় প্রতিদিনই দর্শনার্থী নিয়ে ঘুরে বেড়ান বিরিশিরির পথে পথে। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম কুমুদিনী হাজংয়ের বাড়ির খোঁজ কেউ করে কি না? কোনো পর্যটক নিয়ে কখনো গিয়েছেন কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে বাবুল বলেন, ‘না তো। তাঁর বাড়িতে কুনসুম (কখনো) যাওয়া হয় নাই। কেউ যাওয়ার কথাও বলে নাই। ধরেন, কেউ আইসা যদি যাইতে চাইত, তাইলে চিনাইয়া নিয়া যাইতে পারতাম।’

সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে কুমুদিনী হাজংয়ের বাড়ি যাওয়ার পথেই পরে বিপ্লবী রাসমনী হাজংয়ের স্মৃতিসৌধ। সেখানে কথা হয় স্থানীয় কয়েক তরুণের সঙ্গে। তাঁরাও বলতে পারেননি কুমুদিনী হাজংয়ের সেই অগ্নিঝরা ইতিহাসের দু-একটি বাক্য! তাঁর বাড়ির আঙিনাই জানে না যেন সেই সময়ের কথা!

ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন তাঁকে ছাড়িয়ে আনতে গিয়ে জীবন দেন বিপ্লবী নেত্রী রাসমনী হাজং। এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়ে মুক্ত করা হয়েছিল তাঁকে। সেই সূত্র ধরেই টংক আন্দোলন আরো বেশি জোরালো হয়।

সেসব ইতিহাস অতটা জানে না খোদ কুমুদিনী হাজংয়ের পরিবারের সদস্যরাও! কুমুদিনী হাজংয়ের বাড়ি পৌঁছে কথা হয় তাঁর নাতনিদের সঙ্গে। তারা কেউই জানে না সেই ইতিহাস। এমনকি স্কুলেও কেউ তাদের বলেনি কিছু!

তাঁর বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম, কিছুক্ষণ পরই ঘর থেকে ধীর পায়ে বের হয়ে আসেন কুমুদিনী হাজং। বসতে বললেন। আপ্যায়ন করতে চাইলেন। কথা শুরু ‍হতেই বলতে শুরু করেন প্রবীণ দেহে বাসা বাঁধা নানা রোগবালাইয়ের কথা। হাত নেড়ে জানিয়ে দিলেন সব ভুলে গেছেন। কিছু কিছু স্মৃতি মাঝেমধ্যে ফিরে আসে তাঁর।

একসময় অনেকে আসত। এখন মানুষ আসা বন্ধ করে দিয়েছে বলেন জানালেন পরিবারের সদস্যরা। আমাদের ইতিহাস সমাজ নির্মাণে টংক আন্দোলনে গুরুত্ব কতখানি, তা হয়তো পরিষ্কারভাবে পৌঁছানো যায়নি সবার কাছে। তাই তো অবহেলা-অযত্নে টংক আন্দোলনের ইতিহাসের মতোই পড়ে আছেন ঐতিহাসিক চরিত্র কুমুদিনী হাজং।


টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর

০৪ অক্টোবর, ২০১৭ ১৫:১৭ পি.এম