President

জুলিয়ান ফদ্ধান্সিস ১৯৭১ সালে অক্সফাম-ইউকে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এ বছরে তিনি ভারতের বিহারে একটি পল্লী উম্নয়ন প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা অভিযান শুরুর পরপরই তিনি কয়েকটি সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। ততদিনে তিনি জেনে গেছেন, দলে দলে শরণার্থী প্রবেশ করছে ভারতের ভূখ-ে, প্রাণভয়ে। তিনি ব্রিটেনে অক্সফামের সদর দপ্তরে এ-সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠাতে থাকলে সেখান থেকে কেউ একজন মন্তব্য করেছিল- 'জুলিয়ান ফদ্ধান্সিস তরুণ ও অনভিজ্ঞ। সম্ভবত ভারতের প্রচ- গরমে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এ কারণেই এমন রিপোর্ট পাঠাচ্ছে।' তবে তাদের ভুল ভাঙতে দেরি লাগেনি। অক্সফাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ হিসেবে যে শরণার্থী সমস্যা, তার সঙ্গে দ্রুতই জড়িয়ে পড়ে।


সে সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। সবচেয়ে বেশি শরণার্থী ছিল পশ্চিমবঙ্গে। আর পশ্চিমবঙ্গের প্রধান একটি শরণার্থী শিবির ছিল সল্কল্ট লেক বা লবণ হ্রদ এলাকায়। ফদ্ধান্সিস লিখেছেন, সেখানে প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল। বর্ষায় সল্কল্ট লেক ও অন্যান্য শরণার্থী শিবিরের পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে পড়েছিল। কলেরা ও অন্যান্য ধরনের রোগ ছড়িয়ে পড়েছিল।
আগস্টে শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর জন এফ কেনেডি। তার মনে হয়েছিল, গোটা পশ্চিমবঙ্গই যেন শরণার্থী শিবির। খাবার, চিকিৎসার জন্য সর্বত্র লম্বা লাইন। তিনি চোখের সামনে মানুষদের মৃতু্যর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন। একটি শরণার্থী শিবিরের চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'সবচেয়ে বেশি কী প্রয়োজন?' উত্তরে তিনি বলেন, 'ক্রিমেটরিয়াম'- শবদাহ করার মেশিন।


এমন উত্তরে উপস্থিত সবাই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি নাগরিক ১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। শরণার্থীদের জীবনের যন্ত্রণা আমাদের উপলব্ধিতে আছে। সে সময়ে যারা আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল, সেই ভারতের সমস্যাও আমরা উপলব্ধি করি। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ছিল পাকিস্তানের শাসকদের পক্ষে। তারা ইয়াহিয়া বাহিনীকে অস্ত্র ও অর্থ জুগিয়েছে। নৈতিক সমর্থনও দিয়েছে। সাহস ও ভরসা দিয়েছে। এই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, গোটা বিশ্ব ভারতে আসা শরণার্থীদের যে সহায়তা দিচ্ছে; যুক্তরাষ্ট্র তার থেকেও বেশি দিচ্ছে একা। এর উত্তর এসেছিল তখন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে। তারা সমস্বরে বলেন, প্রধান দায়ভার বহন করছে ভারত সরকার এবং সে দেশের জনগণ। আর সিনেটর কেনেডি বলেছিলেন, আমরা রোগের কারণ দূর করতে চাই; রোগের পরিণতি নয়। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করুক। কারণ এই অস্ত্র পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ব্যবহার করছে বলেই লাখে লাখে শরণার্থী প্রবেশ করছে ভারতে।


সিনেটর কেনেডি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের নাগরিক। তিনি শরণার্থী সমস্যার সমাধানে উম্নত দেশের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। যেমন শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর তিনি পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞান দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কীভাবে গুঁড়া দুধ শিশুদের খাওয়াতে হবে, সেটার উল্লেখ থাকতে হবে গাইড বইয়ে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন তাকে বোঝান, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া লাখ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুকে এমন কোনো সুবিধা প্রদান করা কঠিন, যা তিনি ভারতের নাগরিকদের দিতে পারছেন না। সিনেটর কেনেডি শিশুদের দুধ প্রদানের ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন। এর উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ভারতের বেশিরভাগ অংশেই শিশুদের এ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বাংলাদেশ এখন উদ্বিঘ্ন। আমাদের কক্সবাজার জেলায় লোকসংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। জাতিসংঘের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, মিয়ানমার থেকে ১০ লাখের বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিম্ন এলাকায় তারা ছড়িয়ে পড়বে- এমন শঙ্কা রয়েছে। আমাদের তো ভারতের মতো কোনো সল্কল্ট লেক নেই, যেখানে একসঙ্গে আড়াই লাখ লোককে স্থান করে দেওয়া যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলায় পাহাড় কেটে মানুষের বসতি গড়ার ফলে যে বিপর্যয় ঘটছে, সেটা আমরা ক্ষণে ক্ষণে টের পাচ্ছি। কক্সবাজারেও সমস্যা। আমাদের পর্যটনের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে এই জেলা। সেখানে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। বড় বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছে। সৈকতের তীরঘেঁষে মেরিন ড্রাইভ সড়ক হয়েছে, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে। সেখানেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত।


এই পর্যটনকেন্দ্র বিপম্ন হবে না তো!
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বছরের পর বছর সাফল্য দেখাচ্ছে। গোটা বিশ্বে এখন এটা স্বীকৃত। অতীতে ঝড়-বন্যা হলে সাহায্যের জন্য আবেদন যেত বিশ্বসমাজের কাছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃতিত্ব, তিনি এ পথে চলছেন না। নিজেদের সম্পদ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। হাওর এলাকায় অকাল বন্যা হয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের উল্লেখযোগ্য এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল পানিতে। বাংলাদেশ এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় কোনো দেশের কাছে হাত পাতেনি। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে প্রতিনিধি দল পাঠায়নি। রোহিঙ্গাদের সাহায্য প্রদানে বাংলাদেশ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রয়োজন পড়লে খাবার ভাগ করে খাব রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। এটাই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্পিরিট। এটাই পদ্মা সেতুর স্পিরিট। আমরা নিজেদের অর্থে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রমত্ত পদ্মায় সড়ক ও রেল সেতু নির্মাণ করছি। বিশ্বব্যাংক ভেবেছিল, বাংলাদেশ এটা পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল, বাংলাদেশ এ প্রকল্প হাতে নিলে অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। এ সময়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় একটি চক্র অন্যায়ভাবে সরকার পরিবর্তনেরও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ দেখিয়েছে, সে পারে।
তবে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। এর আগে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে শরণার্থীদের যখন ঢল নেমেছিল, তখন অনেকে এ সুযোগে অঢেল অর্থ কামিয়ে নিয়েছিল। শরণার্থীদের দুর্ভোগ হয়ে উঠেছিল কিছু লোকের ব্যাংক ব্যালান্স ভারী করার উপায়। তখন এনজিওদেরও তৎপরতা ছিল। তারা সক্রিয় ছিল, কারণ বিশ্ব থেকে অর্থ মিলেছে। পণ্য সহায়তা মিলেছে। এখন বিদেশি উৎস নেই, তাই মানবতার ডাকে তারা নেই। কেবল সেমিনার করে, টক শোতে হাজির হয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদানের মধ্যেই দায়িত্ব সীমিত।


সরকার ত্রাণকাজ সমল্প্বয়ের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দিয়েছে। এটা ভালো পদক্ষেপ। ত্রাণ কাজের সমল্প্বয় সাধনের জন্য কক্সবাজারে একজন পদস্থ কর্মকর্তা কিংবা পেশাজীবী অথবা সাবেক সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র করা যেতে পারে। সেখানে জেলা প্রশাসক আছেন। অনেক সরকারি কর্মকর্তাও আছেন। কিন্তু যে সমস্যা আমাদের সামনে এসেছে, নিরাপত্তা নিয়ে যে ঝুঁকি রয়েছে তাতে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা তা সামাল দিতে পারবেন বলে মনে হয় না।
একই সঙ্গে চাই সর্বাত্মক উদ্যোগ, যাতে মিয়ানমারের প্রতিটি নাগরিক তার নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারে এবং সেটা তখনই সম্ভব, যখন প্রাণের কোনো শঙ্কা থাকবে না- যখন সেখানে কাজের নিশ্চয়তা থাকবে। এই শরণার্থীরা যাতে ফিরে যেতে পারে সে জন্য বিশ্বসমাজের দায় আছে। বাংলাদেশের আরও কাজ আছে। আমাদের সব দল, সামাজিক শক্তি এবং বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্ম এ কাজে যুক্ত হবে, এটাই কাম্য।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এ আর/এস আর/এইচ কে

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২৩:১৮ পি.এম