President

আগের কলামের সাথে সম্পর্ক ২৯ মার্চ, ১২ এপ্রিল, ১৯ এপ্রিল ও ২৬ এপ্রিল কলামের ধারাবাহিকতায় আজ ওই আলোচনার সমাপ্তি টানব। কিন্তু পাঠক সম্প্রদায়ের মানসপটে বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য গত সপ্তাহের কলামের শেষাংশের ১১টি লাইন হুবহু উদ্ধৃত করছি এবং সেখান থেকেই আজকের আলোচনা শুরু করব। উদ্ধৃতি শুরু। ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বা নিরাপত্তাজনিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত থিওরি আছে; ওই থিওরিকে বাস্তবে বা মাটিতে সরেজমিন প্রয়োগ করলে কথাটি এ রকম দাঁড়াবে : ভারত যদি নিজের নিরাপত্তা চায় তাহলে ভারতকে বাংলাদেশের নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে; বাংলাদেশ যদি নিজের নিরাপত্তা চায় তাহলে বাংলাদেশকে ভারতের নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। এই আলোচনা আগামী সপ্তাহে চলবে।’ উদ্ধৃতি শেষ। শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনেক অবদানের মধ্যে মাত্র দুই-তিনটি উল্লেখ বা সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি। এই আলোচনা বোঝার সুবিধার্থে, শিলিগুড়ি প্রসঙ্গটি আলোচনা করছি। ভারত নামের বিশাল দেশটি, আক্ষরিক অর্থে না হলেও কার্যত দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ড হলো বড় খণ্ড, বাংলাদেশের পশ্চিমে। দ্বিতীয় খণ্ড তুলনায় ছোট এবং বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বে অবস্থিত। এই দুই খণ্ডের মধ্যে যাতায়াতের জন্য বা এই দু’টি খণ্ডকে সংযুক্ত করে যে জমি সেটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত পঞ্চগড় জেলার উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে বিস্তৃত। সেই সংযোজনকারী ভূখণ্ডে ভারতের যে বিখ্যাত শহরটি অবস্থিত তার নাম শিলিগুড়ি। সে জন্যই ওই ভূখণ্ডের নাম শিলিগুড়ি করিডোর। শিলিগুড়ি পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের দার্জিলিং জেলায় অবস্থিত। ইংরেজি শব্দ করিডোরের মানে বারান্দা। এই করিডোর উত্তর-দক্ষিণ চওড়া বা প্রশস্ততা কম-বেশি ২০ মাইল। ভারত নামের বিশাল দেশের দুই দিকের দু’টি খণ্ডকে সংযোজনকারী এই করিডোর সব ধরনের কৌশলগত বা রণকৌশলগত প্রয়োজন মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত ও অপ্রতুল। যদি এই করিডোরের উত্তর দিক থেকে বিদেশী কোনো হানাদার বাহিনী চাপ প্রয়োগ করে এবং দক্ষিণ দিক থেকে বাংলাদেশ চাপ প্রয়োগ করে, তাহলে এই করিডোর বন্ধ হয়ে যাবে তথা ভারতের দু’টি খণ্ডের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি হবে। কেন, পরবর্তী দু’টি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করলাম। উত্তর-পূর্ব ভারত এবং চীন বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বে ভারতের যে খণ্ড, তার সবচেয়ে উত্তর-পূর্বে অবস্থিত প্রদেশের নাম অরুনাচল। অরুনাচলে সাথে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হচ্ছে বিশাল শক্তিধর রাষ্ট্র গণচীনের। মানচিত্রের এই অংশে ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘ দিনের বিরোধ বিদ্যমান। ১৯৬২ তে এই অঞ্চলে ভারত ও চীনের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল; ভারত বিপর্যস্ত হয়েছিল। অরুনাচল ও চীনের মধ্যে যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত, সেখানে একটি অংশ উভয় দেশের মধ্যে বিতর্কিত। এই অঞ্চলে চীন এবং ভারতের মধ্যে আর একটি যুদ্ধ অসম্ভব নয়, যদিও কাম্য নয়। ’৬২ সালে ভারতের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ ছিল, অপর্যাপ্ত সৈন্যসংখ্যা, যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনকে সমর্থন দেয়ার জন্য যে লাইন অব কমিউনিকেশন বা সরবরাহ সড়ক ছিল সেটার দুর্বলতা ইত্যাদি। ’৬২ সালের পরে ক্রমান্বয়ে ভারত ওই অঞ্চলে সামরিক ভৌতকাঠামো এবং লাইন অব কমিউনিকেশনের প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে। কিন্তু ১৯৬২ সালে যেমন, এই ২০১৭ সালেও তেমনি শিলিগুড়ি করিডোর চিকন বা অপ্রশস্তই রয়ে গেছে। তফাৎ হলো ১৯৬২ সালে শিলিগুড়ি করিডর ছিল, উত্তর পাশে নেপাল-স্বাধীন সিকিম-ভুটান এবং দক্ষিণে পূর্ব পাকিস্তানের দিনাজপুর জেলার পঞ্চগড় মহকুমা; ২০১৭ সালে হলো উত্তর পাশে নেপাল-ভারতীয় সিকিম-ভুটান এবং দক্ষিণে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা। ১৯৬২ সালে ঘটনা চক্রে পাকিস্তানিরা শিলিগুড়ি করিডোরকে ডিস্টার্ব করেনি; এখন ২০১৭ সালে ভারত নিশ্চিত হতে চায় যে, বাংলাদেশ ডিস্টার্ব করবে না। এর জন্য দরকার গাঢ় বন্ধুত্ব। ভারতের সাতটি প্রদেশে ইনসারজেন্সি ভারতের যে খণ্ড বাংলাদেশের উত্তরে এবং পূর্বে অবস্থিত, তাকে আমরা উত্তর-পূর্ব ভারত বা নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া বলি। এই উত্তর-পূর্ব ভারতে, মোট সাতটি প্রদেশ বা রাজ্য আছে, তাই রূপক অর্থে এই অঞ্চলটিকে বলা হয় সেভেন সিস্টার্স (সাত বোন)। প্রত্যেকটিতেই কোনো-না-কোনো প্রকারের ইনসারজেন্সি বহাল ছিল; এখন কোনো রাজ্যে কম, কোনো রাজ্যে বেশি এবং একটি রাজ্য প্রায় বিলুপ্ত। এই ইনসারজেন্সি দমনের লক্ষ্যে, উত্তর-পূর্ব ভারতে যাতায়াতের জন্য, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্য যে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন, তার ভিত্তিমূল হলো শিলিগুড়ি করিডোর। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের মাটি ব্যবহার করেছিল বিভিন্ন প্রয়োজনে। বাংলাদেশের পাবর্ত্য চট্টগ্রামে, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা শান্তিবাহিনী, বাংলাদেশ বা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক গেরিলা যুদ্ধ বা ইনসারজেন্সি পরিচালনা করেছে, সে সময় শান্তিবাহিনী ভারতের মাটি ব্যবহার করেছে। ভারত সরকার দীর্ঘ দিন অভিযোগ করত, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন গেরিলা গোষ্ঠী নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অথবা চলাচলের জন্য বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে। বাংলাদেশের সরকারগুলো বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে; বাস্তবতার নিরিখেই। কিন্তু বারো-তেরো বছর আগে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের পর, এই বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে ও নিরাপত্তার অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতে ও পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গত সাড়ে আট বছর ধরে বিরাজমান রাজনৈতিক সরকার, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তাই করেছে। আমি এর সমালোচনা করছি না। বাংলাদেশের এই সহযোগিতার কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতে দীর্ঘ বিশ-ত্রিশ-পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে যেসব ইনসারজেন্সি চলে আসছিল, সেইগুলো প্রায় স্তিমিত। বাংলাদেশের এই অবদানের মূল্য অপরিসীম। উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি প্রদেশ, ভারতের জন্মলগ্ন থেকেই অনুন্নত ছিল। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলের শাসনব্যবস্থা এমনই ছিল যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন মুখ্য লক্ষ্য ছিল না। অতএব এই অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে, ভারতীয় মূলধারার সঙ্গে সমন্বিত করতে বা একাত্ম করতে যে উদ্যোগ প্রয়োজন, সেই উদ্যোগের প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো যোগাযোগব্যবস্থা। মালামাল বলতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বা ভৌতকাঠামো উন্নয়নের জন্য বা বাজারব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তাই। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে অথবা কলকাতা বন্দর থেকে কোনো মালামাল উত্তর-পূর্ব ভারতে সড়ক বা রেলপথে নিতে হলে, একমাত্র ব্যবস্থা হলো শিলিগুড়ি করিডোরের মাধ্যমে যাওয়া। শিলিগুড়ি করিডর পার হওয়ার পর, আসাম রাজ্য বা মেঘালয় রাজ্য কাছেই পড়ে; কিন্তু ত্রিপুরা রাজ্য, মিজোরাম রাজ্য, মনিপুর রাজ্য, নাগাল্যান্ড রাজ্য এবং অরুনাচল রাজ্য অনেক দূরেই পড়ে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো এই যে, শিলিগুড়ির পরে সড়কপথ দুর্গম অঞ্চলের ও পার্বত্য ভূমির মধ্য দিয়ে যায়। অর্থাৎ সড়কপথ আছে সত্য কিন্তু এই পথ দিয়ে সব কিছু চলাচল করা সম্ভব নয়। এই দূরত্ব ও বিপজ্জনক পথ এড়ানোর বা কমানোর একমাত্র শর্টকার্ট রাস্তা হলো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে চলাচল করা। এরূপ ব্যবস্থাকে ‘ট্রানজিট’ বলে। ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ত্রিপুরা রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করার প্রয়োজনে যেসব ভারী মেশিনারিজ প্রয়োজন সেগুলো কোনো মতেই ত্রিপুরাতে নেয়া যাচ্ছিল না। এই কঠিন অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটে বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশের সহযোগিতার কারণে। সড়কপথে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে, একপর্যায়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় তিতাস নদীর ওপর মাটি দিয়ে বাঁধা বা সড়ক বানিয়ে, ওই সড়কের ওপর দিয়ে ওই ভারী যন্ত্রপাতি বহনকারী গাড়িবহর ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা পৌঁছে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডক্টর দেবপ্রীয় ভট্টচার্যের ভাষায়, অপ্রিয় শব্দ ট্রানজিটকে প্রিয় করা হচ্ছে বিকল্প শব্দ ‘কানেকটিভিটি’ ব্যবহার করে। এ ব্যবস্থার কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ট্রানজিটের অবদান অপরিসীম। অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশের অবদান অপরিসীম। এই কলামের সীমাবদ্ধতার কারণে অঙ্ক করে দেখানো সম্ভব নয় যে, এই ট্রানজিটের কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কতটুকু ত্বরান্বিত হচ্ছে বা ভারতের জিডিপিতে কী পরিমাণ অবদান থাকল? উত্তর-পূর্ব ভারত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবদান অতএব ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশে তথা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ভারতীয় ভূখণ্ডের নিরাপত্তার জন্য, যত প্রকারের ভূমির ওপর দিয়ে যোগাযোগ প্রয়োজন, সেই প্রয়োজন মেটাতে শিলিগুড়ি করিডোরের নিজস্ব নিরাপত্তা অপরিসীম। শিলিগুড়ি করিডোরের এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের কাছে একটি বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশ প্রয়োজন। গত ৯ বছরে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক ওই পর্যায়ে গেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা- এই দু’টি শব্দ যা বোঝায়, সেখানে ব্যাপক তফাৎ আছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় কিংবা সামরিক পরিভাষায় নিরাপত্তা একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। নিরাপত্তার অঙ্গনে অনেক আঙ্গিকের মধ্যে একটি হচ্ছে প্রতিরক্ষা বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। একটি দেশের বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা বা ন্যাশনাল সিকিউরিটি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর যেসব বিষয় প্রভাব বিস্তার করে তার মধ্য থেকে মাত্র কয়েকটি উল্লেখ করছি। এক. উজানের দেশ থেকে নেমে আসা নদীর পানির সুষম বণ্টন; দুই. সীমান্তের এপার-ওপার বিস্তৃত চোরাচালান ও মাদকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ; তিন. যুবসমাজের প্রশিক্ষণ ও বেকারত্ব দূরীকরণ; চার. প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু রাখা; পাঁচ. উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত দ্রব্যের উৎপাদন বা আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা; ছয়. উপযুক্তভাবে দেশপ্রেমে সিক্ত, উন্নতমানের সরঞ্জামে সজ্জিত ও উচ্চমানে প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনি; সাত. উপযুক্ত আইনশৃঙ্খলার মাধ্যমে সামাজিক শৃঙ্খলা বহাল রাখা; আট. উপর্যুক্ত নীতিমালার মাধ্যমে শিল্প উন্নয়ন অব্যাহত রাখা; নয়. দুর্নীতি ও নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড দমনের মাধ্যমে জনগণের মনোবল উচ্চ রাখা ইত্যাদি। সম্মানিত পাঠক, একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ভারতের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং মানবসম্পদীয় সম্পর্ক রাখতে হবে। সামরিক সম্পর্ককে সম্মানজনক দূরত্বে রাখতে হবে। কারণ, ভারত নিকটতম প্রতিবেশী। পানি সরবরাহ ও ভারত ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের চাহিদা অনেক বেশি নয়। প্রথমেই যেটা চাই : অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টনের লক্ষ্যে গঠনমূলক আলোচনা বহাল করা হোক; অন্য নিকট প্রতিবেশী দেশগুলোকে শামিল করেই পরিকল্পনা করা হোক। গবেষকেরা ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী দিনে দেশে-দেশে, রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে যেসব বিষয়ের কারণে বিরোধ সৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পানি। পানি-ই জীবন; পানি ছাড়া খাদ্য উৎপাদন সম্ভব নয়, পানি ছাড়া বৃক্ষায়ন বা সবুজায়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের নদীগুলোতে যদি পানির প্রবাহ কমে (যেমনটি গত দশ-বিশ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে) তাহলে, বঙ্গোপসাগরে পানি পড়বে কম; তা হলে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি নদীগুলো দিয়ে উজানের দিকে বা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হবে। লবণাক্ততা বেড়ে গেলে, মৎস্য উৎপাদন এবং কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই বাংলাদেশের বাঁচামরা নির্ভর করে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার অভিন্ন নদীগুলোর পানির সুষম বণ্টনের ওপর। ভারত সরকারের বা বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতীয় প্রদেশগুলোর পানিব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষগুলো অনেক বেশি তৎপর এবং আগ্রাসী। অপরপক্ষে বাংলাদেশ সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যতটুকু আগ্রাসী ভূমিকা প্রয়োজন, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অন্যান্য চাহিদা এক. বাংলাদেশের চতুর্দিকে, সীমান্তরেখার সমান্তরালে ভারত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। এর পরেও ভারত সীমান্ত এলাকায়, বিক্ষিপ্ত ও নগণ্য অজুহাতে, বাংলাদেশীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। আমরা চাই সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ হোক। দুই. বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিকূলে বাণিজ্য ঘাটতি উদ্বেগজনক। বাণিজ্য ঘাটতি না কমার পেছনে অনেক কারণ দায়ী; অন্যতম কারণ হলো ভারত কর্তৃক সৃষ্টি করা বা উপস্থাপিত বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্ক বাধা। পারস্পরিক নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে শুল্ক বাধাগুলো ক্রমান্বয়ে কমে এলেও, অশুল্ক বাধাগুলো বিভিন্ন আকৃতিতে বা বিভিন্ন রঙে বা বিভিন্ন মানে বা বিভিন্ন অজুহাতে বহাল থাকতেই থাকে। একটা অশুল্ক বাধা দূর হলে, আরেকটা সৃষ্টি হয়। এর প্রতিকার প্রয়োজন। আমরা চাই ভারত বাংলাদেশ থেকে মালামাল আমদানিতে অযথা বাধা সৃষ্টি না করুক। তিন. প্রসঙ্গ আকাশ মিডিয়া। সাম্প্রতিক পৃথিবীতে এটা যেমন অতি শক্তিশালী একটি উন্নয়ন-সহায়ক মাধ্যম, জাতিগঠন-সহায়ক মাধ্যম তেমনি নিজের বা পরের সংস্কৃতি ও মনোবল ধ্বংসকারী আগ্রাসী একটি মাধ্যমও বটে। বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ভারতের আকাশে আন অফিসিয়ালি বা পরোক্ষাভাবে নিষিদ্ধ; বাংলাদেশের আকাশে, ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো সাদরে আমন্ত্রিত মেহমানের মতো। আমরা চাই ভারতীয় আকাশ মিডিয়া বাংলাদেশের আকাশে নিয়ন্ত্রিত থাকুক। চার. আমরা চাই ভারতীয়রা বাংলাদেশে বৈধভাবে বিনিয়োগ করুক, বৈধভাবে চাকরি করুক এবং বৈধভাবে নিজ দেশে টাকা ফেরত পাঠাক। পাঁচ. আমরা চাই বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী যেন সংযত ও ভদ্রজনোচিত আচরণ করে। ছয়. আমরা চাই এনার্জি সেক্টরে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ আদান-প্রদান বা নিতান্তই বাংলাদেশ আমদানি করুক। সাত. আমরা চাই জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগিতা হোক। সমাপনী কথা মোট ২২টি এমওইউ বা চুক্তি বা ব্যবস্থাপনা স্বাক্ষর হয়েছে। জানা মতে, এগুলোর উদ্যোক্তা ভারত। এর মধ্যে চারটি প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত। আরো দু’টি বা তিনটি এমওইউকে পরোক্ষভাবে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বলা যায়। অন্যগুলো বিবিধ বিষয়ে। বাংলাদেশের মৌলিক বা ফান্ডামেন্টাল প্রয়োজনগুলো এই ডকুমেন্টগুলোতে নেই। সে জন্যই বলা হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরে, বাংলাদেশের প্রাপ্তি শূন্যের কোঠায়। বাংলাদেশের প্রাপ্তি শূন্য হবে এটা প্রধানমন্ত্রী মোদি জানতেন। তাই দৃষ্টি ডাইভার্ট করার জন্য অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় এবং ব্যতিক্রমধর্মী উষ্ণ সংবর্ধনা বা অভ্যর্থনা এবং আবাসন বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানালে আমরা অবশ্যই খুশি হই, গৌরবান্বিত অনুভব করি। কিন্তু শুধু খুশি ও গৌরব দিয়ে পেট ভরবে না, মন ভরবে না, সংসার চলবে না। লেখক : মেজর জেনারেল অব:; নিরাপত্তা বিশ্লেষক www.generalibrahim.com

০২ মে, ২০১৭ ১৯:২৯ পি.এম