President

বাংলাদেশের তরুণদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী একটি কর্মের সংস্থান, একটি চাকরি পাওয়া। সবাই কি পান? পান না। প্রতিবছর যে ২২ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, তাঁদের একটা বড় অংশ শেষ পর্যন্ত পছন্দের চাকরিটা জোগাড় করতে পারেন না। তবে তাঁদের প্রচেষ্টা তো থেমে থাকে না।

 

আমার কাজের বড় অংশের সঙ্গে তরুণদের যোগাযোগ। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল রূপান্তরের কারণে কর্মবাজারের নানামুখী তৎপরতার কথা জানানো। বলেছি এখন নিয়োগকর্তারা যত না বেশি কর্মীদের সার্টিফিকেট দেখেন, তার চেয়ে বেশি দেখেন তাঁদের সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা ও দল বেঁধে কাজ করার যোগ্যতা। এগুলো না থাকলে অনেক সময় বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানটা কাজে লাগে না। বলেছি গুগল, ফেসবুক, উবার কিংবা মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানি ও তাদের নিত্যনতুন উদ্ভাবন পাল্টে দিচ্ছে কর্মজগৎ এবং সেখানকার মিথস্ক্রিয়ার সমীকরণগুলো। এখন এমন মিডিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা কিনা কোনো কনটেন্ট তৈরি না করেই বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মিডিয়া। বলেছি সে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। শিক্ষাজীবন থেকেই নিজেকে তৈরি করতে হবে। অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি দরকার প্রাক্তনীদের সঙ্গে যোগাযোগ, কর্মবাজার সম্পর্কে জানাশোনা।

 

তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে রাতের ট্রেনে ঢাকায় ফিরেছি। আমাদের কম্পার্টমেন্টে দেখা হলো এক তরুণের সঙ্গে। তিনিও ঢাকা যাচ্ছেন। তবে আমার মতো নীড়ে ফিরছেন না। যাচ্ছেন নিয়োগ পরীক্ষা দিতে। এমন পরীক্ষা তিনি দিয়ে যাচ্ছেন তিন বছর ধরে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন, তবে নিজের পছন্দের চাকরি পাননি। তাই নিয়মিত শুক্রবারের প্রথম আলো পড়েন। কারণ, ‘চাকরিবাকরি’ পাতায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি থাকে। সেটা দেখতে হয়, আবেদন করতে হয়। দেশের একাধিক চাকরির পোর্টালে নিজের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়ে রেখেছেন। সেখান থেকেও ডাক পান।

 

কিন্তু দুঃখ করে বললেন, সব নিয়োগ পরীক্ষা ঢাকাতেই হয়। ঢাকাতে তাঁর থাকার কোনো জায়গা নেই। যখনই পরীক্ষা থাকে, এমন করে রাতের ট্রেনে বা বাসে করে ঢাকায় আসেন। কমলাপুরের পাবলিক টয়লেটটিতে প্রাতঃক্রিয়া সেরে নিজেকে প্রস্তুত করে রওনা হয়ে যান কখনো বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা আইডিয়াল কলেজের উদ্দেশে। পরীক্ষা দিয়ে কখনো বিকেলের ট্রেনে বা বাসে আবার ফিরে যান নিজ শহরে।

 

আমার মনে পড়ল প্রায় প্রতি শুক্রবার আমার বাসার কাছে আইডিয়াল কলেজের সামনে এ তরুণদের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তরুণীদের কারও কারও সঙ্গে অভিভাবকেরাও থাকেন। হয়তো অনেকেই রাতের ট্রেন বা বাসে করে ঢাকায় এসেছেন। তাঁরা উদ্বিগ্ন মুখে কলেজের গেট খোলার জন্য অপেক্ষা করেন। কয়েক দিন আগে একটি ব্যাংকের পরীক্ষায় প্রায় আড়াই লাখ নিয়োগপ্রত্যাশী পরীক্ষা দিয়েছেন। ঢাকা শহরে একসঙ্গে তাঁদের পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই দুই বেলায় পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

 

সে কবে থেকে শুরু হয়েছে কে জানে। কিন্তু বিসিএস পরীক্ষা ছাড়া প্রায় সব নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরিপ্রত্যাশীদের সারা দেশ থেকে ঢাকায় ডেকে আনা হয়। এ ব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা কেউ ভাবছে এমন কোনো নজির আমি দেখি না।

 

অথচ ইচ্ছে করলেই ডিজিটাল ও অনলাইন পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রথম ধাপের বাছাইটা সম্পন্ন করে ফেলা যায়। এ প্রস্তাব লেখার আগে আমি গত কিছুদিনের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখেছি। তাতে আমি নিশ্চিত হয়েছি এ পরীক্ষাটা অনায়াসে চাকরিপ্রত্যাশীরা নিজের বাসা কিংবা কোনো ডিজিটাল সেন্টারে বসে দিতে পারেন। পরীক্ষাগুলো অবশ্যই অনলাইনে হবে এবং নিয়োগপ্রত্যাশীরা নিজেদের বইপত্র এবং ইন্টারনেট ঘেঁটে পরীক্ষার উত্তর দিতে পারবেন। না, এতে যে উদ্দেশ্যে এ পরীক্ষা নেওয়া, তার কোনো ব্যত্যয় হবে না। প্রথমত, পরীক্ষার প্রশ্নটি এমন হবে, যিনি জানেন আর যিনি ঘাঁটাঘাঁটি করে উত্তর বের করবেন, তাঁদের সহজে পৃথক করা যাবে। দ্বিতীয়ত, এমন ব্যবস্থাও করা সম্ভব যে একই সঙ্গে একাধিক প্রার্থী পরীক্ষা দিতে বসলেও তাঁদের প্রশ্নের ক্রম একই হবে না। ভালো প্রোগ্রামিং যুক্তি প্রয়োগ করে এ কাজটা অনায়াসে করা যাবে। শুধু তা-ই নয়, অনলাইনে এই পরীক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীর প্রাপ্ত নম্বর জানা যাবে। ফলে পরের ধাপের জন্য প্রার্থী বাছাই করা সহজ হবে। এখনো ঠিক তা-ই হচ্ছে, প্রথম পরীক্ষাটা মূলত একটি ‘বাদ দেওয়ার পরীক্ষা’। পার্থক্য হলো অনলাইন পদ্ধতিতে প্রাথমিক বাছাইয়ের ফলে ঢাকায় ডেকে আনা সম্ভাব্য প্রার্থীদের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

 

বর্তমানে দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অবকাঠামোর যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। দেশের সব ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার রয়েছে, স্কুলগুলোতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, বাজারগুলোতে রয়েছে সাইবার সেন্টার আর দেশের প্রায় আড়াই কোটি লোক নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করেন। এ থেকে বোঝা যায় যে নিয়োগপ্রত্যাশীদের ৯০ শতাংশই তাঁর এলাকায় বসেই এ পরীক্ষা দিতে পারবেন।

 

যেহেতু পরীক্ষাটি অনলাইনে হবে, কাজেই অনলাইনে আবেদন গ্রহণের মাত্র কয়েক দিন পরেই এই পরীক্ষা নিয়ে ফেলা যাবে। নিয়োগ কর্মকাণ্ডও সংক্ষিপ্ত সময়ে সমাপ্ত হবে।

 

যে তরুণেরা প্রতি বৃহস্পতিবার মায়ের পা ছুঁয়ে এসে রাতের গাড়িতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন, তাঁদের দুঃখ-বেদনার কথাটা আমরা কেউ বুঝতে পারি না। আমরা আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণদের তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ দিতে পারছি না, কিন্তু প্রযুক্তির সামান্য ব্যবহার করে আমরা তাঁদের কষ্ট অনেক লাঘব করে দিতে পারি।

 

মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

১৬ এপ্রিল, ২০১৭ ২৩:০৭ পি.এম