President

আহমেদ কামরুল মোর্শেদঃ মহামতি লালনের সমুন্নত সৃজন-শৈলীর স্বরূপ সাধারণ্যের সম্যকভাবে উপলব্ধি করা যেমন দুরূহ, তেমনি লালন বাণীর অমৃত মর্মকে সম্যকভাবে বিশ্লেষণ করা গবেষকগণের জন্যও খুবই দুরূহ। কারণ মহান লালনের বাণী অবিকৃতভাবে উদ্ধার করাই যে আজ দু:সাধ্য! স্মৃতিনির্ভর শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে আমরা যেভাবে আজ লালন বাণীর লিখিত পাঠটিকে পাচ্ছি, অনিবার্যভাবেই সেখানে প্রচুর ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। বিস্মৃতি পরায়ণ মানবস্মৃতি, শ্রুতিলিখনে নিয়োজিত লেখকের ভাষাজ্ঞান কিম্বা ঐ শ্রুতিলিখনের সঠিক সংরক্ষণের অভাবজনিত কারণে সৃষ্ট জটিলতা (যেমন- অস্পষ্টতা, কালি লেপ্টে কিম্বা মুছে যাওয়া), লিখিত ভাষ্যটিকে ছাপার সময় মান-সম্মত সম্পাদনার অভাব এবং সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ সম্পাদক গবেষকদের লোকোত্তর দর্শন প্রসঙ্গে ধারণকৃত প্রভূত সীমাবদ্ধতা, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কারণে মহামতি লালনের বাণী এবং দর্শন অধুনা খুবই জনপ্রিয় হলেও তাঁর নিখুঁত ভাষ্যটি কার্যত কিছুটা বিকৃতভাবেই উপস্থাপিত হয়ে চলেছে। লোকসঙ্গীত সংগ্রাহকগণের আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্বেও স্মৃতিনির্ভর শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে প্রবাহিত লালন সঙ্গীতকে যেমন পূর্বে উল্লেখকৃত কারণে অবিকৃতভাবে সংগ্রহ করতে একদিকে যেমন অপারগ হচ্ছেন, তেমনি এর সাথে যুক্ত হয়েছে সচেতনভাবে সৃজিত উদ্দেশ্যমূলক বিশেষ মতবাদসমূহের সংযোজন-বিয়োজন। ফলে মূল ভাষ্যটিকে উদ্ধার কাজটি যুক্তিসঙ্গত কারণেই এখন খুব দু:সাধ্য।

আমরা অত্র নিবন্ধে একজন সম্যকগুরু স্বনামধন্য সুফি দার্শনিক প্রয়াত (২০০৬, ২২ সেপ্টেম্বর) সদর উদ্দিন আহমদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনার আলোকে দশকোত্তর নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে মহামতি লালনের মোহাম্মদী দর্শনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং প্রসঙ্গত উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে বিধৃত তাঁরই রচিত একটি নির্বাচিত সঙ্গীতের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুফি তথা তরিকাপন্থী ভাবধারার আলোকে উপস্থাপনের প্রয়াস নিচ্ছি।

“কী আইন যে আনলেন নবী সক্কলের শেষে (!)

রেজাবন্দির সালাত-জাকাত

           (সেহ) পূর্ব হতেই জাহের আছে (!!)”

টীকাঃ আইন—বিধি-বিধান, ব্যবহার শাস্ত্র। রেজাবন্দী—স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য বন্দনা বিশেষ। আরবী-ফারসিতে শব্দটির সঠিক উচ্চারণ ‘রেজামান্দি’; কিন্তু বাংলায় অপভ্রংশতাজনিত কারণে এটি ‘রেজাবন্দি’ হিসেবেই প্রচলিত। সালাত—প্রভু বা আপন রবের সাথে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা। ফারসি শব্দ ‘নামাজ’ আরবি সালাতের বিকল্প শব্দ হিসেবে উপমহাদেশে বহুল প্রচলিত। জাকাত—পরিত্যাগ, বিসর্জন। জাহের—জারী থাকা, প্রচলিত থাকা, ইত্যাদি।

ব্যাখাঃ সর্বশেষ নবী মোহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মোস্তফা (আ.সা.মো.) নবুয়ত ধারার সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন বিধায় স্বভাবতই প্রশ্ন উথিত হয়, তাঁর অনুসারীদের পথ প্রদর্শনের জন্য পরবর্তীকালের প্রেক্ষাপটে তিনি কোন বিশেষ বিধান বা নির্দেশনা জারী করলেন! কালের বিবর্তনে যুগে যুগে পথভ্রষ্ট মানুষের পথপ্রদর্শনের জন্য এক-একজন নবীর আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু শেষ নবী নবুয়তের ধারার সমাপ্তি ঘোষণা করলেন বিধায় বিকল্প কোন বিধান প্রতিস্থাপন করলেন! সেমোটিক বা আরবি অধ্যুষিত জনপদের প্রত্যেক নবীগণই প্রতিবার তাঁর অনুসারীদের জন্য সমকালীন অনুসঙ্গ বিবেচনার প্রেক্ষাপটে একটি নিজস্ব সালাত-জাকাত পদ্ধতির সাহায্যে স্রষ্টার সন্তুষ্টি বা নৈকট্য লাভের বিশেষ বিধি-বিধান জারী করেছেন। তাহলে শেষ নবীর জারীকৃত বিশেষ বিধি-বিধান কোনটি, যা পূর্বেকার নবুয়তের ধারা বহাল থাকাকালীন অবস্থায় আগত অন্যসব নবী বা পথপ্রদর্শকগণের জারীকৃত বিধি-বিধান থেকে কার্যত পৃথক!

মহামতি লালন কর্তৃক উত্থাপিত এই প্রশ্নটি খুবই মৌলিক। ইসলামি শাস্ত্রে প্রচলিতভাবে নবুয়তের উত্তরাধিকারী হিসেবে যেভাবে খেলাফত (খোলাফায়ে রাশেদিন) প্রথাকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বলে জানা যায়, সেটি প্রশ্নবিদ্ধ একটি পদ্ধতি বলেও ইতিহাসেই দেখতে পাওয়া। নবীজীর ওফাতের পর মোহাজির ও আনসারগণের একাংশের একটি গোলোযোগপূর্ণ সভার সিদ্ধান্ত অনুসারেই খেলাফতের সূচনা হয়। অর্থাৎ খেলাফতপন্থাকে নবীজির নির্দেশিত পথের বহির্ভূত একটি নতুন সংযোজন হিসেবেই ইতিহাস বিধৃত করছে। অথচ সমগ্র মানবমন্ডলীর সর্বশেষ নবী হিসেবে তিনি গোটা মানব সমাজের পথ চলার সর্বকালীণ ব্যবস্থাপত্রই প্রদান করে গিয়েছেন বলে ইসলামি শাস্ত্রে উল্লেখ দেখা যায়। তাহলে নেতা নির্বাচনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে মীমাংসা না করার কোনো যুক্তিকে এক্ষেত্রে বিশ্বাস করা খুবই কঠিন। কারণ নবীজির ওফাতকালীন সময়ে তৎকালীন একটি প্রবল পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ (মূতার যুদ্ধ) যেমন চলছিল (প্রকৃতার্থে বিশাল রোমান বাহিনীকে ধোঁকা দিয়ে মুসলিম বাহিনী কোনোক্রমে পালিয়ে এসেছিলো), তেমনি অপর একটি প্রবল পরাক্রমশালী পারস্য সম্রাটও নবীজির ইসলামী দাওয়াতের প্রত্যুত্তরে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে তাঁর মস্তক কেটে নিয়ে আসার জন্য হুকুম জারী করেছিলেন। অন্যদিকে জনৈক মুসায়লামা ইবন্ হাবীব এবং আসওয়াদ ইবন্ কাব (উভয়েই নবীজির সাহাবী বলে প্রচলিত মতবাদে চিহ্নিত) নিজেদেরকে নবী বলে দাবী করেছিলেন। যে কারণে অন্তিম সময়ে নবীজি ফেতনা-ফ্যাসাদ চতুর্দিক থেকে ধেয়ে আসছে বলে আক্ষেপও করেছেন! একইভাবে মুহাজির ও আনসারগণের মধ্যেও প্রচুর মুনাফেক ও পক্ষ পরিবর্তনকারী সুযোগ-সন্ধানীদের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। অতএব একজন বিচক্ষণ সত্যদ্রষ্টা, সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হিসেবে শেষ নবী তাঁর অনুসারীদের পথ প্রদর্শন এবং ঐক্যবদ্ধ রাখা তথা সৃষ্ট চরম বিশৃঙ্খলাকে মোকাবেলা করার জন্য কোনো সুযোগ্য নেতা নির্বাচনের গুরুত্বকে অবহেলা করবেন, তা বস্তুত অবিশ্বাস্য বলেই প্রতীয়মান হয়। এ বিষয়টিই মহামতি লালন অত্র সঙ্গীতের সূচনা পর্বে আত্মজিজ্ঞাসার চিত্রকল্পে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। বস্তুত এই জিজ্ঞাসা সত্যসন্ধানী মানবাত্মা মাত্রেরই!কার্যত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেই নবীজির অনুসারীদের শিয়া, সুন্নি, কুর্দি, ওহাবী, খারিজী, আহলে বাইত প্রভৃতি উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ার বাস্তবতা আজও চলমান দেখা যাচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ‘ছিয়া সিত্তা’ (শুদ্ধ ছয়) হাদিসের অন্তর্গত বলে স্বীকৃত মুসলিম শরীফে উল্লেখ দেখা যায় যে নবীজি বলেছেন, হযরত মুসা (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.) এর অনুসারীগণ যেরূপ বাহাত্তর (৭২) কাতারে বিভক্তিতে বিচ্ছিন্ন, তাঁর অনুসারীগণও তদ্রুপ তিয়াত্তর (৭৩) কাতারে বিভক্তিতে বিচ্ছিন্ন থাকবে এবং এই তিয়াত্তুর উপদলের মধ্যে কেবলমাত্র একটি ধারাই সঠিক পথকে অনুসরণ করবে। অতএব মহামতি লালনের উত্থাপিত পূর্বোক্ত জিজ্ঞাসাটি একটি ধ্রুপদী জিজ্ঞাসা, যা সত্যসন্ধানী মাত্রকেই প্রবলভাবে আলোড়িত করতে বাধ্য।

“ঈসা মুসা দাউদ নবী

বেনামাজি কারে কবি (?)

শেরেক-বেদাত ছিলো সবই (!)

           (তবে) নবীজি কি জানান এসে (!!)”

টীকাঃ নবী—আরবি শব্দ ‘নাবা’ থেকে নবী শব্দের উৎপত্তি। সংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শনকারী, আহবানকারী ইত্যাদি অর্থে স্রষ্টার পক্ষে প্রতিনিধিত্বকারী একজন মনোনীত পবিত্র সত্বা। বেনামাজি—নামাজবিহিন ব্যক্তি, সালাত প্রতিষ্ঠাকারী নন এমন ব্যক্তি। সালাতকে ভারতবর্ষে প্রচলিতভাবে নামাজ বলা হয়, পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সালাত শব্দের অর্থ সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা। সংযোগ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা (স্রষ্টার সাথে) ভিন্ন নবীগণ কি করে স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা (ওহি) প্রকাশ করতে পারেন? কার্যত নবী মাত্রই ‘দায়েমী সালাত’ অর্থাৎ সার্বক্ষনিক সংযোগ প্রতিষ্ঠাকারী সিদ্ধ ব্যক্তিত্ব হতে বাধ্য। শেরেক—অংশীকরণ, অংশীবাদিতার অপরাধ। বেদাত—নবী প্রচারিত পথ-পদ্ধতিতে কোনো সৃজিত নতুন সংযোজন বা বিকৃতিকরণ।

ব্যাখাঃ ঈসা, মুসা, দাউদ (সর্ব আ.) মানের উচ্চ পর্যায়ের কেতাবপ্রাপ্ত নবীদের কাউকেই বেনামাজি বলার কোনো সুযোগ আছে কি? বস্তুত নবী মাত্রই স্রষ্টার সাথে সার্বক্ষণিক সংযোগকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠাকারী এবং স্রষ্টার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ভিন্ন অন্য কোনো কিছুকেই অনুসরণ করেন না। আবার সব নবীরাই সমসাময়িক বিভ্রান্ত জনপদবাসীর যাপিত জীবন কিম্বা ধর্মোপসনা থেকে শেরেক এবং বেদাতকে পরিশুদ্ধ করার মিশন পরিচালনা করেছেন। অতএব সালাত-জাকাত-সিয়াম, হজ-কোরবানী প্রথা কিম্বা সমসাময়িক কালের জনগোষ্ঠীর শেরেক-বেদাত থেকে পরিশুদ্ধকরণের পদ্ধতির প্রচলন শেষ নবীর জন্য কেবল নয়, সর্বযুগে সকল নবীদের মধ্যেই প্রচলিত ছিলো! তাহলে সর্বশেষ নবী হিসেবে নবীজি কোন বিশেষ ব্যবস্থার প্রবর্তনের মাধ্যমে নবুয়তের ধারাকে সমাপ্ত বলে ঘোষণা করলেন!

“তওরাত যবুর ইঞ্জিল কেতাব

বাতিল হয় সে কিসের অভাব (?)

পয়গাম্বর কার খাস কি ভাব (?)

           (আমি) ভেবে কোনো নেইনে দিশে (!!)”

টীকাঃ তওরাত—হযরত মুসা (আ.) এর উপর নাযিলকৃত আল্লাহ প্রদত্ত আসমানি কেতাব বা ধর্মগ্রন্থ, যা ইহুদি ধর্মমতাবলম্বীরা (পরবর্তীতে নাযিলকৃত অন্যান্য আসমানি কেতাবসমূহকে অস্বীকার করে) এখনো অনুসরণ করে থাকে। যবুর—হযরত দাউদ (আ.) এর উপর নাযিলকৃত আল্লাহপ্রদত্ত আসমানি কেতাব।যবুর কেতাবের বিশেষ অনুসরণকারীদের কোনো নিশানা এখন পাওয়া যায় না বলেই গবেষকরা দাবী করেন। সম্ভবত: পূর্ববর্তী আসমানি কেতাব তওরাত কিম্বা পরবর্তী আসমানি কেতাব (যবুর পরবর্তী) ইঞ্জিল অনুসারীদের দ্বারা যবুর অনুসারীরা আত্মীকৃত হয়েছেন। অবশ্য কেউ কেউ মনে করেন, সম্প্রতি (২০১৫ সালে) ইরাক ও তুরষ্ক সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ইয়াজিদি সম্প্রদায়টি (যারা কট্টর শরিয়াপন্থী আইএস জঙ্গীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন) কালের প্রবাহে কিছুটা বিকৃতি সংযোজিত অবস্থায় যবুর কেতাবের অনুসারী। ইয়াজিদি সম্প্রদায় সঙ্গীত বন্দনার সাহায্যে স্রষ্টার উপাসনা করে থাকেন, যা হযরত দাউদের সুরেলা কণ্ঠের যবুর পাঠের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দৃশ্যত: প্রতীয়মান বলে তাঁরা মনে করেন। ইঞ্জিল—বাইবেল। হযরত ঈসা (আ.)এর উপর নাযিলকৃত স্রষ্টাপ্রদত্ত আসমানি কিতাব, যা খ্রিষ্টান ধর্মমতানুসারীরা (তওরাত ও যবুরকে রহিত বা বাতিল করা হয়েছে জ্ঞানে) অনুসরণ করে চলেছেন। পয়গাম্বর—নবী, প্রেরিত পুরুষ, কেতাবপ্রাপ্ত রাসুল। দিশে—দিশা, সঙ্কেত, সংজ্ঞা, নির্দেশ, বিবরণ, কর্তব্যনির্ধারণ, ইত্যাদি।

ব্যাখ্যাঃ তওরাত, যবুর, ইঞ্জিল কিতাবসমূহ সেমোটিক ধারার বর্ণনানুসারে ১০৪টি আসমানি কেতাবের মধ্যে (কোরানসহ)খুবই মশহুর বা বিখ্যাত এবং শ্রেষ্ঠতর আসমানি কেতাব। এর প্রতিটিই একই অল্লাহর থেকে সংশ্লিষ্ট নবীদের সমসাময়িক প্রেক্ষিত বিচার করে সমকালীন জনগোষ্ঠীকে হেদায়েত বা পথপ্রদর্শনের নিমিত্তে নাযিলকৃত। অথচ এদের প্রতিটিই পূর্ববর্তীটিকে প্রকারন্তে অনুসরণরহিত করে দৃশ্যত: নতুন কোনো পথ-পদ্ধতিতে স্রষ্টার উপাসনার নির্দেশ জারী করেছে। অবশেষে শেষ আসমানি কিতাব ‘কোরান’ নাযিলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী নবীগণের উপর নাযিলকৃত কেতাবসমূহকে অনুসরণরহিত বলে জানিয়েছে (শরিয়াপন্থীদের দাবী)। প্রজ্ঞাবানরা বিশ্বাস করেন, শেষ নবীর মাধ্যমে নবুয়তের ধারাকে আরও প্রলম্বিত করা হলে পূর্ববর্তী সময়ের মতোই প্রত্যেক নবীর অনুসরণকারীরাই যেমন পৃথক একটি সৃজিত মতবাদের সৃষ্টির মাধ্যমে নিজ নিজ কেতাবকেই একমাত্র সঠিক (ভ্রান্তিকর ভাবে) বলে দাবী করেছে, তেমনি করতো। উল্লেখ্য বর্তমান কালে ইহুদি, নাসারা (খ্রীষ্টান), মুসলমানরা পরস্পর ঘোরতর মতভেদ ও বিদ্বেষে লিপ্ত হয়ে পড়তো এবং একে অন্যকে অস্বীকার করে ক্রমাগতভাবে রক্তক্ষয়ী আত্মকলহে নিমজ্জিত হয়েই আছে। পূর্ববর্তী নবীগণের অনুসারীদের মধ্যে দ্বান্দিক অবস্থান নিরীক্ষণপূর্বক একটি নতুন পথ-পদ্ধতির মাধ্যমে সমগ্র মানবকূলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার নিমিত্তে আল্লাহকর্তৃক নবুয়তের সমাপ্ত ঘোষণা করার প্রেক্ষিতেই সর্বশেষ নবীকে প্রেরণ করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাবানরা বিশ্বাস করেন।

বস্তুত যে কোনো মহাপুরুষের প্রদত্ত কোনো বিশেষ নির্দেশনা কিম্বা দর্শনকে সম্যকভাবে অনুসরণ করা সমকালীন জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যত দু:সাধ্য হয়ে পড়ে। বরং কয়েক প্রজন্ম ধরে ধারাবাহিকভাবে ঐ মহাপুরুষের দেশনাকে ক্রমাগতভাবে চর্চা কিম্বা অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল ধীরে ধীরে ঐ দেশনার মর্মটিকে কোনো জনগোষ্ঠীর সাধারণ্যে পক্ষে আত্মীকরণ করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষিত বিচার করেই শেষ নবীকে সমগ্র মানবজাতির নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য অন্যান্য সকল নবীগণ কেবলমাত্র স্বজাতির জন্য (যেমন, বনি ইসরাইলদের সম্প্রদায়ের জন্য, আদ সম্প্রদায়ের, সামুদ সম্প্রদায়ের জন্য, ইত্যাদি) নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে সকল নবীরাই (কয়েকটি বিরল ব্যতিক্রম যেমন- মুসা (আ.) কর্তৃক আল্লাহর অনুমোদন সাপেক্ষে তাঁর ভাই হারুণ (আ.) কে রাসুল ঘোষণা, ইব্রাহীম (আ.) কর্তৃক তাঁর ভাই লুত (আ.) কে আল্লাহর অনুমোদন সাপেক্ষে রাসুল ঘোষণা, ইত্যাদি) সয়ম্ভূ বা নিজেই নিজের নবীত্বকে ঘোষণা করেছেন। নবুয়ত ঘোষণার কোনো সমন্বিত পথ-পদ্ধতির প্রচলন ইতিপূর্বে ছিলো না (পূর্বের প্রচলিত পথের সুযোগ গ্রহণ করে নবীজির ইহলৌকিক জীবনের অন্তিম সময় তাঁরই সাহাবী পরিচিতি সম্বলিত দুই ব্যক্তি মুসায়লামা ইবন হাবীব এবং আসওয়াদ ইবন কাব নিজেদেরকে নবী বলে দাবী করেছিলেন)। ফলে সকল নবীগণই মহান আল্লাহর পক্ষে গোটা মানবজাতিকে একই দর্শনের আলোকে সত্য ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি সত্যনিষ্ঠ সমাজব্যবস্থায় সুদৃঢ় মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ করে অটুট ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছেন। কিন্তু প্রতিজন নবীর অনুসারীগণ তাঁর অবর্তমানে পূর্ববর্তী ও পরবর্তীজনের থেকে পৃথক একটি ‘কওম বা গোষ্ঠীতে যথারীতি বিভক্ত হয়েছে এবং আদর্শগত পার্থক্যের অজুহাতে একে অন্যকে ঘৃণা করেছে। এমনকি কখনো বা একে অন্যকে ধ্বংস করতে চেয়েছে।

সার্বিক বিবেচনায় পূর্ববর্তীতে প্রতিবারই সৃষ্ট অব্যবস্থাপনা ও দর্শনগত পরস্পরের সৃজিত অনৈক্যকে দূরীকরণের নিমিত্তে এবং গোটা মানবজাতিকে একই নবীর উম্মত বা অনুসারী করে বিশ্বব্যাপী একটি অটুট ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের আবর্তে গোটা মানবসমাজকে নিবন্ধিত করার মানসে ইতিপূর্বে নাযিলকৃত সকল আসমানি কেতাবসমূহকে সংশ্লেষণ করে ‘কোরান’কে সর্বশেষ আসমানি কেতাব হিসেবে নাযিল করা হয় এবং সর্বশেষ নবী হিসেবে হযরত মোহাম্মদ (আ.সা.মো.) প্রেরণ আল্লাহ নবুয়তের পদ্ধতিকে সমাপ্ত বলে ঘোষণা করেন। এবং শেষনবী ভাষা-বর্ণ-আচার-আচরণের বৈচিত্রে পরিপূর্ণ গোটা মানবজাতিকে স্থান-কালের মাত্রা বিবেচনায় ধারাবাহিকভাবে সত্য ও ন্যায়ের পথে নেতৃত্ব প্রদানের নিমিত্তে মাওলা বা ইমাম মনোনীত করার মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বকারী মনোনীত নেতৃত্বের ধারাবাহিক পথ-পদ্ধতির সূচনা করেন, যাকে মাওলাইয়াত বা ইমামত বা বেলায়েতের ধারা বলা হয়। অর্থাৎ নবুয়তের সমাপ্ত ঘোষণা করে শেষ নবী তাঁর প্রতিনিধিত্বকারী মনোনীত নেতৃত্বের নতুন আইন বা বিধানের সূচনা করে অনাগত কালের জন্য রেসালাতের (প্রতিনিধিত্বের) ধারাকে প্রলম্বিত করেন, যা কার্যত খুবই বিজ্ঞানসম্মত এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একটি কার্যকরপন্থা বলে ইসলামী ধর্মশাস্ত্রবিদদের অনেকেই মনে করেন। এই ধারার শাস্ত্রবিদগণের মধ্যে প্রখ্যাত সুন্নীপন্থী আলেমগণ প্রণীত পুস্তাকিদিতে (যেমন ১. ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’, খন্ড-২, পৃষ্ঠা-১৪; এবং ইবনে কাসির প্রণীত অন্য দুটি গ্রন্থ ‘তারিখে ইবনে কাসির, খন্ড-৫, পৃষ্ঠা-২০৯; ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’, খন্ড-৭, পৃষ্ঠা-২০৯; ২. ‘তাফসিরে দুররে মনসুর,’খন্ড- ৩, পৃষ্ঠা-১১৭; অথবা খন্ড-৩, পৃষ্ঠা-১৯; ৩. বোখারী শরীফ হাদিস ‘হামিদীয়া লাইব্রেরী প্রণীত’ খন্ড-৫, পৃষ্ঠা-২৮০: ৪. আলহাজ্ব ফজলুল করীম অনুদিত ‘আল হাদিস মিশকাত আল মাসাবী’ এর ৫৪৮ নং হাদিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফাউন্ডেশন প্রণীত ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’, খন্ড-১০, পৃষ্ঠা ৩০৭; ইত্যাদি) এবং সকল ‘আহলে বাইত’ এবং শিয়াপন্থী আলেমগণ রচিত গ্রন্থাদিতে দশম হিজরীতে হজ সমাপ্ত অন্তে মদিনা ফেরার পথে খুম নামক স্থানের একটি জলাশয়ের পাশে নবীজি কর্তৃক হযরত আলীকে ‘মাওলা’ মনোনীত করার মাধ্যমে নবুয়তের যবনিকা টেনে মাওলাতন্ত্রের সূচনা করার ঘটনাটির উল্লেখ দেখা যায়। বিশেষ করে সুফি দার্শনিক সদরউদ্দিন আহমদ চিশতী প্রণীত ‘মাওলার অভিষেক’ এবং বেনজীর হক চিশতী প্রণীত ‘বেহুঁশের চৈতন্য’ দান এবং সৈয়দ আমির আলী (শিয়াপন্থী) রচিত ‘স্পিরিট অফ ইসলাম’, ‘হিষ্ট্রি অফ সারসেনা’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত উল্লেখ দেখা যায়।

একইভাবে ‘হাদিসে সাকলাইন’ নামে পরিচিত সর্বসম্মত একটি হাদিসে (মুসলিম-৭খন্ড, পৃষ্ঠা-১২২; তিরমিজি-২খন্ড, পৃষ্ঠা-৩০৭, নাসাঈ-পৃষ্ঠা-২০; মিশকাত, ৩ খন্ডের ১৪, ১৭, ২৬, ৫৯ এবং ৪ খন্ডের ৩৬৬,৩৭১ ও ৫ খন্ডের ১৮২, ১৮৯ পৃষ্ঠা; মোসনাদে আহমদ) উল্লেখ রয়েছে, নবীজী তাঁর উম্মতদের পথ প্রদর্শনের জন্য দুটি ভারী বস্তু বা বিষয় রেখে গেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে, যার একটি কোরান এবং অন্যটি আহলে বাইত। কিন্তু এ বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টির প্রয়াসে পরবর্তীতে নবীজির বিদায় হজের ভাষণে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘আহলে বাইতের’ পরিবর্তে ‘সুন্নাহ’ শব্দটিকে প্রতিস্থাপন হতে দেখা গেছে। বস্তুত ‘আহলে বাইতে’র শ্রেষ্ঠত্ব প্রসঙ্গে কোরানের ৪২ নং সুরা শুরা- এর ২৩ নং বাক্যে দেখা যায়, আল্লাহ রাসুলকে তাঁর সমগ্র রেসালতের বিনিময় হিসাবে তাঁর অনুসারীদের জন্য ‘আহলে বাইত’দের প্রতি নিজ প্রাণের চাইতেও অধিক ভালোবাসা দাবী করতে বলেছেন। আবার কোরানের ৩৩ নং সুরার (আহযাব) ৩৩ নং বাক্যে আল্লাহ বলছেন, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ চান, আহলে বাইত, তোমাদের থেকে সকল অপবিত্রতা দূর করে পরিপূর্ণরূপে পবিত্র করে দিতে”। একইভাবে কোরানের অন্যত্র ‘আয়াতে মুবাহেলা’ বলে খ্যাত এর বর্ণনায় দেখা যায়, নাজরানবাসী খ্রিষ্টান নেতাদের সাথে বাহাস বা বিতর্কে নবীজি তাঁর আহলে বাইত হিসেবে হযরত আলী, হযরত ফাতেমা, ইমাম হাসান, ইমাম হোসেনকেই তাঁর নিকটজন বলে পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করেছেন (নিবন্ধের আকারকে সংক্ষিপ্ত করার লক্ষে অন্যান্য উদহারন উপস্থাপন থেকে বিরত থাকতে হলো)। অন্যদিকে কোরানের অন্যত্র (৪ নং সুরা নেসার ৫৯ নং বাক্য) উল্লেখ দেখা যায়, মহান আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর রাসুলকে অনুসরণের পাশাপাশি উলিল আমরগণকে (উলিল আমর- আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসন পরিচালনার অধিকারী ব্যক্তি। জনগণের নির্বাচন অথবা মনোনয়ন দ্বারা উলিল আমর মনোনীত করা যায় না। এরূপ শাসনকর্তা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দ্বারা মনোনীত এবং তাঁদেরই প্রতিনিধিত্বকারী, যাকে কেউ কেউ আহলে বাইত, আহলে রাসুল, অলি-আউলিয়া-গাউস-কুতুব মর্যাদার বলে মনে করেন) অনুসরণ করতে বলেছেন।

একটি নির্মোহ নিরীক্ষণে (প্রাপ্ত তথ্যাবলীর) দেখা যায়, আহলে বাইতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব হযরত আলী তাঁর জন্মলগ্ন থেকে বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যে অনন্য। তিনিই পবিত্র কাবা ঘরের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী একমাত্র মানব সন্তান, মাতৃদুগ্ধের পরিবর্তে সর্বপ্রথম নবীজির জিহ্বার লালা বা রস পান করে চক্ষু উন্মোচনকারী কিম্বা আশৈশব রাসুলের গৃহেই লালিত-পালিত হওয়া এবং রাসুল্লার নয়নমনি মা ফাতেমাকে বিয়ে করার গৌরব কিম্বা ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের (এই পৌত্রদ্বয়কে রাসুল নিজ পুত্র বলেই সম্বোধন করতেন) পিতৃত্ব এবং এমনিতর আরও বহু কারণে হযরত আলীর শ্রেষ্ঠত্ব নবীর অনুসারীগণের মধ্যে সুচিহ্নিত হয়ে আছে। অথচ হযরত আলীর সাথে সম্মান কিম্বা নেতৃত্বের প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইসলামি শাস্ত্র এবং ইতিহাসে যাদের নাম দেখা যায় তাঁদের সকলেই প্রথমে মূর্তিপূজারী ছিলেন এবং পরিণত বয়সে (চল্লিশ উত্তীর্ণ) তাঁরা ইসলামকে গ্রহণ করেছিলেন। অতএব উপর্যুক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে এটা কি সুষ্পষ্ট নয় যে হযরত আলীর সাথে সার্বিক বিবেচনায় তুলনা করার মতো অন্য কোনো ব্যক্তিকে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা উদ্দেশ্যমূলক ও সৃজিত হতে বাধ্য? বস্তুত নবীজি পরম যত্নে তিল তিল করেই হযরত আলীকে তাঁর সর্বোত্তম অনুসারী রূপে তৈরী করেছিলেন এবং তাঁর মাধ্যমেই নবুয়তের উত্তরাধিকার মাওলইয়াত, ইমামত বা বেলায়াতের ধারার দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দূ:খের বিষয়, নবীজির দেহত্যাগের অন্তিমকালে হযরত আলীর ঐ নেতৃত্বকে অস্বীকার করে একটি পরিকল্পিতপন্থায় বিদ্রোহ সংগঠন করা হয় এবং নবীজির ওফাতের পর তাঁর পবিত্র দেহকে ফেলে রেখে প্রভাবশালী একটি চক্র তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে ‘খেলাফতের’ সৃষ্টি করে এবং প্রথম দুই খলিফাকে নির্বাচিত ঘোষণা করার পর (তিনদিন পর) নবীজির পবিত্র দেহের খোঁজ-খবর করতে আসেন। প্রকাশ থাকে হযরত আলী, মা ফাতেমা এবং আরো কয়েকজন সাহাবীর (যেমন সালমান ফারসি, আবুজার গিফারি, ইয়াসির আম্মার, মিকদাদসহ গুটিকয়)উপস্থিতিতে তাঁকে দাফন করা হয়েছিলো বলে কোনো কোনো ইতিহাসের বর্ণনায় দেখা যায়।

অতএব নবীজির শেষ নবী হিসেবে নবুয়তকে মাওলাইয়াত দ্বারা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশে তাঁরই মাধ্যমে মনোনীত মাওলা হিসাবে হযরত আলীকে প্রকাশ্যে দায়িত্ব প্রদান এবং পরবর্তীতে পূর্ববর্তী মাওলাকর্তৃক পরবর্তী মাওলাকে মনোনয়ন এবং একই ধারাবাহিকতায় মোহাম্মদী দর্শনকে ক্রমাগতভাবে বিশ্বব্যাপী মানবতার মুক্তির পথ হিসেবে স্থান-কালের মাত্রায় চিরস্থায়ী পদ্ধতি রূপে সার্বজনীন একটি বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসটিকে শুরুতেই সংঘবদ্ধ কায়েমী স্বার্থ উদ্দেশ্যমূলকভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে। কিন্তু মোহাম্মদী দর্শনকে বুঝতে চাইলে সর্বশেষ নবীর উত্তরাধিকারকে সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে স্বভাবতই চক্রান্তকারীদের দ্বারা তাদের সৃজিত মত ও পথ দ্বারা সাধারণ্যের বিভ্রান্ত হতেই হবে, মহামতি লালন এ কথাটিই তাঁর অপূর্ব সৃজনশৈলীতে উপস্থাপন করেছেন, যা অত্র সঙ্গীতের শেষ স্তবকে স্পষ্টতরভাবে বিধৃত হয়েছে।

“ফোরকানের ঐ দরজা ভারি

কিসে হয় সে বুঝতে নারি (,)

(অধম) লালনে রয় স্রেফ আচারী (!)

(তাই তো) বিচারে গোল বাঁধিয়েছে (।।)”

টীকাঃ ফুরকান—‘ফরক’ শব্দ থেকে ফোরকান শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ প্রভেদকারী জ্ঞান; সৃষ্টি রহস্যের নিগূঢ় জ্ঞান। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা, শের্ক-তৌহিদ ইত্যাদি সবকিছুর ফরককারী বা প্রভেদ নির্ণয়কারী মহাজ্ঞানকে ফোরকান বলে। দরজাভারি—‘ফোরকান’ অভিধার মহাজ্ঞানে প্রবেশের গভীরতর সক্ষমতা। নারি—‘না পারা’ অর্থে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ। স্রেফ—কেবল, শুধুমাত্র। আচারী—আচার-অনুষ্ঠানে নির্ভরশীল, আনুষ্ঠানিকতায় বিশ্বাসী, আচরণগত আনুষ্ঠানিকতায় নিমজ্জিত। গোল—গোলমাল, সংকট।

ব্যাখাঃ একাগ্র মনে ক্রমাগতভাবে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমেই (একজন ফোরকান প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে) কেবল ফোরকানের রহস্যময়তাকে ভেদ করা সম্ভব। মহাপুরুষগণের অগ্রবর্তী ধ্যান-ধারণাকে উপলব্ধি করা সাধারণ্যের জন্য সত্যিই খুব দু:সাধ্য। একজন মহাপুরুষ প্রদত্ত কোনো দেশনাকে আত্মস্থ করতে সাধারণ জনগোষ্ঠীকে কয়েক প্রজন্মব্যাপী ধারাবাহিক এবং বিরামহীন প্রয়াস গ্রহণ করতে হয়। সৃষ্টিরহস্যের নিগূঢ় তাৎপর্য কিম্বা লোকোত্তর ধর্মীয় বিধি-বিধানের তাৎপর্য অনুধাবনের ক্ষেত্রেও এ কথা একইভাবে প্রযোজ্য। নবুয়তের ঐতিহ্যের অবসান ঘটানোর কারণ হিসেবে বলা যায়, এর ধারাবাহিক পরম্পরতাকে কখনোই একসূত্রে গ্রোথিত করা যায়নি। বরং এক নবীর অনুসারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নবীর অনুসারী থেকে পৃথক এবং দান্দ্বিক অবস্থানে নিবদ্ধ হয়েছে বিধায় শেষনবী প্রণীত ধর্মদর্শনকে ক্রমাগতভাবে একটি মনোনীত ধারবাহিক নেতৃত্বের পরিচালনায় স্থান-কালের মাত্রায় স্থানীয় সামঞ্জস্যতা (যেমন: স্থানীয় ভাষা-সংষ্কৃতির আলোকে) বজায় রেখে ব্যাখ্যা প্রদানের নিমিত্তে সকল জাতি-ধর্ম-গোষ্ঠীর মানবমন্ডলীর জন্য মহান আল্লাহ শেষ নবীর মাধ্যমে মহান নবুয়তকে রহিত করে মাওলাতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। কালের বিবর্তনে যুগসন্ধিক্ষণে উত্থাপিত বিবিধ বিতর্ক কিম্বা একটি সমুন্নত দর্শনকে স্থানিক প্রেক্ষিতে প্রজ্ঞার সাথে ব্যাখ্যা করার প্রশ্নে, ইত্যাদি বিবিধ কারণে আল্লাহ নির্দেশিত পথে শেষনবীর ঐ প্রয়াসটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি বৈজ্ঞানিক প্রয়াসও বটে। কিন্ত শেষনবীর অনুসারীরা সমকালীন প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজসের চক্রান্তে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। হত্যা-নির্যাতন, হুমকীর মাধ্যমে ঐ চক্রটি কার্যত ত্রাসের একটি রাজত্বকে যেমন তৎকালীন সময়ে সৃষ্টি করেছিলো, তেমনি বিবিধ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অনুগত শ্রেণির আনুকুল্যতাকে কাজে লাগিয়ে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ্য হয়। অন্যদিকে শেষনবীর প্রকৃত অনুগতরা তাঁর ওফাতকালীন সময়ের শোকাতুর মানসিকতায় শক্তিধর ও ধনাঢ্য কায়েমী স্বার্থের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে অমনোযোগী ছিলেন এবং দৃশ্যত: নিষ্ক্রিয় থেকে একধরণের অপারগতা প্রদর্শন করেছেন বলেই ইতিহাসে বিধৃত হতে দেখা যায়। ঐ কায়েমী স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পনকারী একটি বিদ্বান বা আলেম সমাজ মোহাম্মদী দর্শনকে সচতুরভাবে কেবলমাত্র পারলৌকিক লাভ-ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে একটি চটুল ব্যাখ্যা প্রদান করে এবং ধার্মিকতাকে একমাত্র বাহ্যিক, ব্যবহারিক আচার-আচরণশীলতায় নিবদ্ধ করে ফেলতে সমর্থ্য লাভ করে। ফলশ্রুতিতে সমুন্নত মানবিকতা কিম্বা সৃষ্টিতে স্রষ্টার বিজ্ঞানময় বিকাশ রহিত অবস্থায় মোহাম্মদী দর্শন কেবলমাত্র পারলৌকিক বেহেশত-দোজখ, লাভ কিম্বা ভোগের ভিত্তিতে কাষ্ঠ আচার-আাচরণ সম্বলিত অবস্থায় নিপতিত হয়েছে।

অন্যভাবে একটি সুফিবাদী পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ইসলামের প্রচলিত আচার-ব্যবহার সম্বলিত শরীয়তের মধ্যেও গভীর দেশনা, যেমন: ১) সালাতের মাধ্যমে নিজ দেহে প্রাণশিরার চাইতেও নিকটবর্তী অবস্থানে অবস্থানরত (সূত্র: কোরানের ৫০ নং সুরা ‘ক্বাফ’ এর ১৬ নং বাক্য) আপন রবের সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা: ২) সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে যা কিছু বাঁধা –তাকে পরিত্যাগ (যাকাত) করা (সূত্র: কোরান বহুবার সালাত প্রতিষ্ঠার সাথেসাথেই সংযুক্ত করে যাকাত প্রদানের উল্লেখ রয়েছে)। উল্লেখ্য একটি হাদিসের মারফত জানা যাচ্ছে ‘সালাত মোমিনের জন্য মেরাজ স্বরূপ’ অর্থাৎ সালাত বা সংযোগ প্রতিষ্ঠা পেলেই স্রষ্টার সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ (মেরাজ) ঘটে; ৩) সিয়াম সাধনার দ্বারা যাবতীয় ইন্দ্রিয় প্ররোচণা (ক্ষুধা-পিপাসা, যৌন পিপাসা, বস্তুগত লিপ্সা, ইত্যাদি) থেকে বারিত থাকার মাধ্যমে আবাসিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই খন্ডকালীনভাবে আল্লাহময় হয়ে ওঠার তাৎপর্যতাকে অনুধাবনের সক্ষমতাকে অর্জন করা; ৪) হজ পালনকালীন সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা রহিত উম্মুক্ত অবস্থায় সার্বক্ষণিকভাবে আল্লহময়তাকে দৃঢ়ভাবে নিজ অস্তিত্বে সংরক্ষণ করা এবং ৫) কোরবানী অর্থাৎ সৃষ্টি জগতের কল্যাণে নিজ সত্বাকে সর্বতোভাবে উৎসর্গ করার মাধ্যমে ধার্মিকগণকে যে নিগূঢ় দেশনা বা দিক-নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে, প্রচলিত ইসলামী ভাবধারায় সেসবকে কার্যত সম্পূর্ণভাবে অবহেলা করে কেবলমাত্র সালাত-জাকাত-সিয়াম-হজ-কোরবানীর বাহ্যিক আচার-আচরণকেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে একচ্ছত্রভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ফলে সর্বত্যাগী সিদ্ধ পুরুষগণের (আহলে বাইতগণের) উৎসর্গীত নেতৃত্বের পরিচালনাধীন সত্যের মিশনটি স্বভাবতই প্রচলিত প্রকাশ্য ধর্মচর্চা থেকে বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে।

উপর্যুক্ত সার্বিক প্রেক্ষাপটের আলোকে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে একজন প্রচলিত সাধকের চিত্রকল্পে মহান লালন বিনয় করে নিজেকে একজন কেবল আচার-অনুষ্ঠানে নির্ভরশীল অন্ত:সারহীন অধম বা হতভাগ্য কাষ্ঠ-ধার্মিকরূপে উল্লেখ করে সুমহান ইসলামী চেতনার সার্বজনীন আবেদনটিকে উপলব্ধি করার অক্ষমতাকেই নিন্দা জ্ঞাপন করছেন, যা কার্যত মোহাম্মদী দর্শনের সার্বজনীনতাকে উপলব্ধি করার জন্যই একটি প্রাণবন্ত দেশনা।

পুনশ্চঃ বলাবাহুল্য প্রথম তিন খেলাফতের কালে নবুয়তের উত্তারাধিকার বেলায়েত, মাওলাইয়াত কিম্বা ইমামত প্রসঙ্গে বিরোধিতা খুবই সুকৌশলে একটি সৃজিত ধর্মীয় আবরণের অন্তরালে অতি সংগোপনে বহাল রাখা হয়েছিলো বলে গবেষণায় দেখা যায়। প্রথম খলিফার আমলে হযরত আলীকে খলিফার নিকট ‘বায়াত’ গ্রহণে বাধ্য করার জন্য অত্যন্ত হৃদয়-বিদারক ও অবমাননাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হলেও ঐ পরিস্থিতিতে উদ্ভূত গনরোষ থেকে বাঁচার লক্ষ্যে শেষ পর্যন্ত ঐ ‘বায়াত’ গ্রহণের নির্দেশকে রহিত করা হয় বলেও ইতিহাসে উল্লেখ দেখা যায়। যদিও ‘বাগে ফেদাক’ নামক খেজুর বাগানের উত্তরাধিকার থেকে মা ফাতেমাকে বঞ্চিত করা কিম্বা হযরত আলীকে আটক করে খলিফার দরবারে হাজির করার ঘটনার সময় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মা ফাতেমার গর্ভপাত এবং পাঁজরের হাঁড় ভেঙ্গে মৃত্যু বরণের মতো মর্মান্তিক ঘটনার উদহারণকে কিন্তু ঠিকই দেখা যায়। তৃতীয় খলিফার জীবনাবসানের পর একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে খেলাফতে অভিষিক্ত হতে নিতান্ত অনিচ্ছুক হযরত আলীকে মুমিনগণের রক্তপাতের ভয় দেখিয়ে চতুর্থ খলিফা হিসাবে ক্ষমতা গ্রহণে একদিকে বাধ্য করা হয়, অন্যদিকে সিরিয়ার গভর্নর পদে আসীন মোয়াবিয়ার প্রকাশ্য বিরোধিতার মাধ্যমে তাঁর নেতৃত্বকে অস্বীকারও করা হয়। পরবর্তীতে মোয়াবিয়া কর্তৃক নিজ মদ্যপ এবং লম্পট পুত্র ইয়াজীদকে উত্তরাধিকার মনোনয়নের মাধ্যমে ইসলামে রাজতন্ত্রের সূচনা ঘটে এবং কারবালার নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনার দ্বারা মাওলাতন্ত্র বা নবুয়তের উত্তরাধিকারকে নিশ্চিহ্ন করার ঘটনা সংগঠিত করা হয়েছিলো বলে ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায়।

প্রকাশ থাকে, ইয়াজীদের নিকট ‘বায়াত’ গ্রহণ অথবা মৃত্যুকে বেছে নেবার যে কোনো একটি বিকল্প থেকে ইমাম হোসেন একটি শোকাবহ করুণ দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর বা শহীদের পথকে বেছে নেবার পর থেকে অদ্যাবদি ইসলামের নামে আরব সম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্রমাগতভাবে ভোগ, বিলাসের মাঝে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করে রেখেছে বলে সমালোচক গবেষকরা দাবী করেন।

অন্যদিকে অত্যন্ত কষ্টকর বৈরী অবস্থার মধ্যেও ক্ষীণধারায় সুফি-অলি-আউলিয়া-দরবেশ-ফকিররা নিখাঁদ মোহাম্মদী দর্শনকে নিভৃত চর্চার মাধ্যমে পারস্য, ভারতসহ অন্যান্য কিছু অঞ্চলে প্রকৃত ইসলামী দেশনাকে প্রচার করে সত্যের পতাকাকে সমুন্নত রেখেছেন। মহামতি লালন সে ধারারই অনন্য একজন দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন মহাপুরুষ বলে আমাদের বিশ্বাস।

১৬ এপ্রিল, ২০১৭ ২২:৩৮ পি.এম