President

শেখ হাসিনা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী। কেউ যদি শেখ হাসিনার অর্জনগুলো মূল্যায়ন করতে চান- এর একটি দীর্ঘ তালিকা প্রণয়ন করা যাবে। সেই দীর্ঘ তালিকার কয়েকটি হলো- দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, সিটমহল বিনিময় ও স্থলসীমা নির্ধারণ, দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় অভূতপূর্ব সাফল্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধি, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণসহ অনেকগুলো মেগা প্রকল্প গ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনা, জঙ্গিবাদ দমন ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ প্রভৃতি। তবে আমার মতে গত ৩৫ বছরের শীর্ষপদে রাজনৈতিক অবস্থান থেকে শেখ হাসিনা দেশের জন্য কাজ করছেন। সেই কাজের কিছু পরিচিতি নিম্নরূপ।

স্বাস্থ্যখাতে আমাদের অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে গ্রামীণ বা তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্তস্বরূপ প্রাধ্যন্য পাচ্ছে। মানুষ বিনামূল্যে চিকিত্সাসেবা পাচ্ছেন। গ্রামীণ ক্লিনিক সেবা চালু করা হয়েছে। যা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কারণে চারদলীয় জোট সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। বর্তমানে বিনা চিকিত্সায় লোক মারা গেছে, এমনটি কোথাও দেখা যায় না। আমাদের গড় আয়ু এখন ৭১.৮ বছর। শিক্ষাখাতেও সাফল্য অর্জিত হয়েছে। দেশে প্রাথমিক শিক্ষার হার বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা কমেছে। বইয়ের একটি সংকট ছিল। তা দূর হয়েছে। প্রত্যেক বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে নতুন বই বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। দেশে উচ্চ শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবায় মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষাখাতে সমতা অর্জনের মাত্রা বেড়েই চলছে। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে মঙ্গা বলতে আর কিছু নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পুষ্টি এবং ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বেড়েছে। দেশের খাদ্যাভাবের এক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলতে আমরা কেবল পেট ভরে ভাত খাওয়াকে বুঝতাম। কিন্তু এখন তার পরিবর্তন হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা মাছ, ডিম, দুধ এবং মাংস উত্পাদনে সাফল্য দেখিয়েছি। মিঠা পানির মাছ উত্পাদনে আমাদের দেশ পৃথিবীতে চতুর্থ। নদী নালা, খাল বিল জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ার পরও আমাদের মাছ উত্পাদনের পরিমাণ বেড়েছে।

কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি ও ফলের উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে ভাতনির্ভর খাদ্যাভ্যাস কমে সুষম খাদ্য নিরাপত্তার দিকে আমরা অগ্রসরমান। আমরা এখন সুষম খাদ্য খাচ্ছি। এমনকি গ্রামেও এখন পোল্ট্রি ফার্ম রয়েছে। সেখানেও ছেলে-মেয়েরাও মুরগির মাংস ডিম খেতে পারছে। অর্থাত্ শহরের খাদ্যাভাবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গ্রামেও একই খাদ্যাভাস দেখা যাচ্ছে। কৃষিখাতে আমরা যথেষ্ট সুফল পাচ্ছি। শস্য উত্পাদন বেড়েছে। স্বাধীনতার পরে অনেক ধানি জমি থাকার পরও সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পাদন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন চাষযোগ্য জমি অর্ধেক হওয়ার পরও ১৫ কোটি ৭৯ লক্ষ মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেও আমরা বিদেশে খাদ্য রফতানি করতে পারছি। নানা কারণে জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার পরেও আমরা দ্বিগুণ খাদ্য উত্পাদন করতে পারছি। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, উচ্চ ফলনশীল বীজ এবং কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করার জন্যই এ অবস্থায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সরকার কৃষকদের সকল চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের বড় অঙ্কের টাকা খাদ্য আমদানি করতে ব্যয় হতো। কিন্তু বর্তমানে তা না হওয়ার কারণে রিজার্ভ বেড়েই চলছে। খাদ্য মানেই ভাত, এই ভাবনা থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দৈনিক খাবারের তালিকায় দেশে উত্পাদিত অনেক পুষ্টিকর খাবার যুক্ত হয়েছে। ফলমুল চাষের ক্ষেত্রেও দেশে বৈপ্লবিক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর ফল গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। বাজারে বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যাচ্ছে। তা মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে।

ইতোমধ্যে আমরা রাজনীতিতে অনেকগুলো বিষয় মীমাংসা করতে পেরেছি। ২০১৩ এবং ২০১৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল বিএনপির সহযোগী সংগঠন জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত এবং উন্নয়ন হোক- এটা তারা চায়নি। এখন আর যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর কোনো সুযোগ নেই। তাদের অনেকেরই ফাঁসি হয়ে গেছে, বাকিদেরও হবে। আন্দোলন করে আর যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো যাবে না। তা নিশ্চিত হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্টরা আর আন্দোলনে আগ্রহী হবে না। বর্তমানে আমাদের সামনে বড় হুমকি হচ্ছে জঙ্গিবাদ। তবে জঙ্গি তত্পরতা এক সময়ে শেষ হয়ে যাবে। কারণ মানব সভ্যতার ইতিহাস কখনো পিছনের দিকে যায় না, বরং তা সামনের দিকে অগ্রসরমান। একটি পর্যায়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেমে যাবে। কেবল সাময়িকভাবে এ জঙ্গি তত্পরতা রাষ্ট্রকে পিছনের দিকে টেনে ধরবে। এজন্য জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। জঙ্গি তত্পরতার বিরুদ্ধে জনগণকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কেবল অভিযান চালালে হবে না বরং জঙ্গিদের সমাজ থেকে সমূলে উত্খাত করতে হবে।

বর্তমান সরকারের আর একটি বড় সাফল্য হলো পদ্মা সেতু নির্মাণ। এটি নিয়ে নানা মহল থেকে ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়নে ৬.৫ কিমি দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। দেশি-বিদেশি চক্রান্তের কারণে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু থেকে দূরে সরে যায়। এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। যে সেতু বদলে দেবে দেশ সেই পদ্মা সেতু এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তবতা। দীর্ঘদিন থেকে আমরা মেগাসিটি, মেট্রোরেল, ট্যানেল এবং পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, ফ্লাইওভারসহ নানা বিষয় কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতাই শুনে এসেছি। এগুলো কেবল স্বপ্নই ছিল। বর্তমানে শেখ হাসিনা সরকার তা বাস্তবে রূপ প্রদান করছেন। মেট্রো রেল, মনোরেল এবং ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। চার লেন বিশিষ্ট সড়কপথ হচ্ছে। দাতা সংস্থাগুলো অর্থ প্রদানের জন্য আবার ফিরে এসেছে। বিশ্বব্যাংক-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে জাইকাও পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে সরে গিয়েছিল তারা বর্তমানে তিনটি সেতু নির্মাণে আগ্রহী। পরিসংখ্যানগত দিক থেকে দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ১০ কোটির মতো। প্রায় সাড়ে ৫ কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করছে- যা এক ধরনের বিপ্লব। মোটকথা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অসাধারণ সাফল্য আমরা দেখতে পাচ্ছি। তথ্য এখন সব জায়গায় সহজে পাওয়া যাচ্ছে। আর এই তথ্যের মাধ্যমে মানুষের ক্ষমতায়ন বাড়ছে। আমরা তথ্যসমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত হচ্ছি।

গণমাধ্যম বা মিডিয়ার বৈশিষ্ট্য হলো এটি এক একসময় এক একটি ইন্টারেস্টিং আইটেম খোঁজে। অর্থাত্ মানুষের কাছে দৃষ্টিগ্রাহ্য ও আকর্ষণীয় যা কিছু তার প্রতি ঝোঁক মিডিয়ার। স্বাভাবিকের পরিবর্তে অস্বাভাবিক ও উত্তেজনাকর বিষয়ের প্রতি তাদের দুর্বলতা বেশি। এগুলো খুঁজে বের করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে মিডিয়া সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে। এজন্য সকল মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করে, বিচার-বিশ্লেষণে আত্মনিয়োগ করে। গণতন্ত্র বিকশিত হওয়ার জন্য মিডিয়া উল্লেখযোগ্য স্তম্ভ। কিন্তু এই সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ সরকারের ভালো কাজের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও জনমনে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। নিজের ইচ্ছা-উদ্দেশ্য মেটানোর ব্যবস্থা করার ফলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা বিঘ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিংসা-বিদ্বেষ-অপপ্রচার বন্ধ করা এবং এ সবের পশ্চাতে যুক্ত ব্যক্তিকে স্বাভাবিক নিয়মে বিচারের অধীন করা। কেউ-ই আইনের ঊর্ধ্বে নন। এজন্য উস্কানিদাতা সাংবাদিক ও সেসব মিডিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ যৌক্তিক। সব মিলে উন্নয়নের ব্যাপক চিত্রই আমাদের সামনে জাজ্জ্বল্যমান।

লেখক: অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

১৬ এপ্রিল, ২০১৭ ২১:১৮ পি.এম