President

শিশুদের জন্য রচিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ’ ছড়াটির মধ্যে একটি অসাধারণ দার্শনিক বক্তব্য আছে তা হয়ত শিশুরা বুঝতে পারে না। বড়রাও ছড়াটি শিশুদের মতো করে শিশুদের জন্যেই পড়ে। ছড়াটির শুরুতে আছে—‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সবগাছ ছাড়িয়ে/উঁকি মারে আকাশে, …কিন্তু দার্শনিক বক্তব্যটি আছে শেষ কয়েক লাইনে— ‘…তার পরে হাওয়া যেই নেমে যায়/পাতা-কাঁপা থেমে যায়, ফেরে তার মনটা—/যেই ভাবে মা যে মাটি তার/ভাল লাগে আর বার/পৃথিবীর কোণটা।’ অর্থাত্ আমরা যে যত বড়ই হই না কেন মা-মাটিতেই আমাদের শিকড়, শিকড় উপড়ে গেলেই ছিন্নমূল হওয়ার অভিশাপ।

স্যার আইজ্যাক নিউটনের (১৬৪৩-১৭২৭) জন্ম যদি বিলাতে না হয়ে বাংলাদেশে হতো তখন তার মাথায় আপেল না পড়ে তাল পড়ত। অবশ্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তির আবিষ্কারের জন্য নিউটনের মাথায় তাল পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না, বাঙালির প্রবাদ ‘সালিশ মানি কিন্তু তালগাছটা আমার’ থেকেই সেটা করতে পারতেন। কারণ ১৬৬৫ সালে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আবিষ্কারের আগেও যেমন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছিল তেমনই মানুষের স্বার্থপরতাও ছিল। ‘তালগাছটি আমার’ প্রবাদটির মর্মকথা হচ্ছে স্বার্থপরতা। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে পৃথিবী নামক গ্রহটি সবকিছুকে নিজের দিকে টানে। অতএব সামষ্টিক (ম্যাক্রো) মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ব্যাষ্টিক (মাইক্রো) ভার্সন হচ্ছে স্বার্থপরতা। অ্যাডাম স্মিথকে (১৭২৩-১৭৯০) বলা হয় আজকের বাজার অর্থনীতির জনক। ব্যক্তিস্বার্থই বাজার অর্থনীতির প্রাণ। অ্যাডাম স্মিথের ১৭৭৬ সালে প্রকাশিত ‘দি ওয়েলথ অব নেশন’ বইয়ে অবাধ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে যে অদৃশ্য হাত বা ‘ইনভিজিবল হ্যান্ড’-এর কথা বলেছেন সেটাও আসলে ‘ব্যক্তিস্বার্থ’। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত স্বার্থপর হবেন বা নিজের স্বার্থই দেখবেন। অ্যাডাম স্মিথ জোর দিয়ে বলেছিলেন, মানুষ স্বার্থপর হতে বাধ্য। মানুষের স্বার্থপরতার দর্শনটি স্মিথকে শিখিয়েছিলেন হেলভেসিয়া (১৭১৫-১৭৭১) নামক এক ফরাসি দার্শনিক। এই ফরাসি দার্শনিকের কাছ থেকে তিনি অনেক কিছুর সঙ্গে এ বিষয়টা তিনি ভালোভাবে শিখেছিলেন। তিনি স্মিথকে বলেছিলেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সঙ্গে স্বার্থপরতার সম্পর্কের কথা। তাই মানুষ জন্মগতভাবে এবং শেষ পর্যন্ত স্বার্থপর হতে বাধ্য। অতএব আমরা যেভাবেই হোক তালগাছ পেতে চাইবোই। যে যাই বলুক নেওয়ার সময় ‘সকলের তরে সকলে আমরা’, আর দেওয়ার সময় ‘প্রত্যেকে আমরা নিজের তরে’।

বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তবে ধর্মভীরু না হয়ে থাকা প্রাকৃতিকভাবেই বেশ কঠিন এবং এমন লোকের সংখ্যাও কম। প্রকৃতির বিশালতার তুলনায় বিপদসঙ্কুল মানুষের পক্ষে অন্য কিছু ভাবাটাই বরং অস্বাভাবিক। ধর্মভীরু লোক যদি নিরক্ষর হয়, কোনো শিক্ষার আলো যদি না থাকে, তবে সে শেষপর্যন্ত ধর্মান্ধ হতে বাধ্য। কারণ নানা উসকানিমূলক কথাবার্তা যা বলা হবে, তাতেই সে প্রলুব্ধ হবে। কাজেই ধর্মভীরুর সঙ্গে নিরক্ষরতা যোগ হলে সে ধর্মান্ধতে পরিণত হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। দুনিয়াতে যারা সাম্প্রদায়িক হামলা, দাঙ্গা ছড়াচ্ছে, তাদেরও একটি দর্শন রয়েছে। তা হলো ‘সালাফি’ মতবাদ। যে ধরনের জীবন-যাপন ও অনুশাসনে তারা বিশ্বাস করে, তার বাইরের কোনো আচার অনুশাসন থাকতে পারবে না। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা নিজের ধর্মের লোকদের বেশি আক্রমণ করছে। আজকের জঙ্গিদেরও একটা দর্শন রয়েছে, যেমন ছিল বা আছে মার্কসবাদী ও লেনিনবাদীদের। কাজেই ধর্মীয় উন্মাদনা বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সাময়িক মোকাবিলা করা যাবে, কিন্তু নির্মূল করা যাবে না। তাহলে একে মোকাবিলা করা যাবে কিভাবে? এজন্য আবার সেই দর্শনেই ফিরে যেতে হবে। পৃথিবীতে অনেক দার্শনিক রয়েছেন, যারা ধর্মান্ধতা এবং মৌলবাদের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধর্মীয় সন্ত্রাস দমনের দর্শনটা কী হবে? অনেক তাত্ত্বিক দর্শনের পর্যালোচনার পর আমার মনে হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শনই আমাদের পথ দেখাতে পারে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে এসে রেসকোর্স ময়দানে প্রথম বক্তব্য রাখেন তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, আমি মানুষ।’ তাঁর এই বক্তব্যকে আমরা যদি একটি দার্শনিক মতবাদ হিসেবে গ্রহণ করি তাহলে ধর্মীয় উন্মাদনা অনেকাংশেই কমে যাবে। এই অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন হযরত শাহজালাল, খান জাহান আলী, বায়েজিদ বোস্তামীর মতো সুফিসাধকরা। অর্থাত্ আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুফিবাদীদের হাত ধরেই মুসলমান। কাজেই ‘মানুষ, বাঙালি, মুসলমান’ এই মিশ্রণটি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত সালাফি মতবাদ মোকাবিলা করা সম্ভব। কেবল ‘র্যাব’, ‘সোয়াত’, ‘কোবরা’ দিয়ে এই সব সাময়িক দমন করা গেলেও নির্মূল করা যাবে না।

টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে। ২০২১ সালে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। ২০৪১ সালে আমরা ধনী রাষ্ট্র হব। বিশ্বব্যাংকের সূচক রয়েছে, কত ডলার হলে ধনী দেশ হওয়া যায়। আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়লে আমরা ধনী দেশে পরিণত হব। কিন্তু ইরাক, সিরিয়া, জর্দান তো ধনী দেশ ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো ডলারের হিসাবে অনেক আগে থেকেই ধনী দেশ ছিল। কিন্তু এখন সেই ধনী দেশগুলোর কী অবস্থা? কাজেই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দর্শনের উন্নয়ন হওয়া দরকার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলার কথা বলেছেন। তবে তাঁর সোনার বাংলা বলতে ডলারে সমৃদ্ধ দেশ মনে করার কারণ নেই। সোনার বাংলা বলতে তিনি এই বাংলায় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান সবার সহাবস্থানের মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে বুঝিয়েছেন। একটি বহুবাচনিক বা বহুত্ববাদী সমাজ কল্পনা করেছিলেন; হাইরাইজ বিল্ডিং ও মোবাইল ফোন আর ডলারের হিসাব করেননি। কাজেই আজকে আমাদেরকে সেই দর্শনে পৌঁছাতে হবে, যাতে করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হানাহানিসহ উগ্রবাদী সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে পারি। যাতে আমরা সবাই এক সঙ্গে থাকতে পারি। জাতির জনক এমন একটি সোনার বাংলার স্বপ্নই দেখেছিলেন, বাঙালিত্বই আমাদের ভিত্তিভূমি—পাতা কাঁপা থেমে গেলে যার ওপর তাল গাছ দাঁড়িয়ে থাকে। আর বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন আমাদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যাকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যত্ বাংলাদেশ আবর্তিত হবে।

-অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

১৬ এপ্রিল, ২০১৭ ২১:১৭ পি.এম