President

সঞ্জয় ঘোষ: মার্জনা করবেন। জ্ঞানতাপস আধুনিক ভারতের স্বনামধন্য অন্যতম পথপ্রদর্শক, ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম একবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘কল মি মি.কালাম’। বলাবাহুল্য তাঁর মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব ও কৃতিত্বের কারণে সবাই অনেক সম্মানসূচক শব্দ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর নামের পূর্বে ব্যবহার করতে চাইতো। কিন্তু সাদামাটা জীবনযাপনের মতো প্রতিটি ক্ষেত্রেই সর্ববিধ বাহুল্যতাকে তিনি পরিতাজ্য মনে করতেন।

১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ৃ রাজ্যের রামেশ্বরমে একজন দরিদ্র নৌকার মাঝি জয়নুল আবেদিনের ঘরে সাত সন্তানের মধ্যে কণিষ্ঠতম হিসেবে কালাম ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। তাঁর মা আশিয়াম্মা একজন সাদামাটা গৃহবধু ছিলেন। কিন্তু সেই মা-ই তাঁর এই অধ্যাবসায়ী একনিষ্ঠ কর্মচঞ্চল শেষ সন্তানটিকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতেন, ‘কালামের সুনাম একদিন বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে যাবে’। সাত সন্তানের জন্য ভাত রাঁধার পাশাপাশি কনিষ্ঠটির জন্য বানাতেন বাড়তি কয়েকটি রুটি। উল্লেখ্য শিশু কালাম ভোর ৪টায় উঠে বিনা পারিশ্রমিকে অংক শিক্ষকের কাছে পাঠ নিতে যেতেন। এজন্য তাঁর মা আরো আগেই ঘুম থেকে জেগে উঠতেন। শিক্ষকের কাছ থেকে ফিরতেন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে। তখন বাবার সাথে নামাজ আদায়ে মসজিদে যেতেন, নামাজের পর আরবি পাঠশালায় কোরান শিক্ষা নিতেন। তারপর ছুটে যেতেন রেল প্লাটফর্মে, খবরের কাগজ বিতরণের কাজের মাধ্যমে কিছু উপার্জনের জন্য।

নৌকা বানানো ছেলেটাই মিসাইল বানালেন!

পিতা জয়নুল দুটি দ্বীপের মধ্যে ভাড়া করা একটি নৌকার সাহায্যে যাত্রী পারাপার করতেন। নিজেদের একটি নৌকা থাকলে দরিদ্র পিতার উপার্জন কিছুটা বেশী হবে চিন্তা থেকেই কালাম তাঁর পিতার জন্য একটি উন্নত নৌকা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বিখ্যাত একটি গ্রন্থ ‘My journey: transforming dreams in to action’ এ তিনি নৌকা বানানোর মাধ্যমেই প্রকৌশল দুনিয়ার ধারণা কি করে তাঁর মধ্যে প্রথিত হয়, তা বলেছেন।

বিমানবাহিনীর পাইলট হতে পারেন নি, জাতির পাইলট হয়েছিলেন

পিতা চেয়েছিলেন পুত্র একজন কালেক্টর অর্থাৎ আইসি এস কর্মকর্তা হোক। তবে পুত্র তৎকালীন তরুন কালাম পেশা হিসেবে পছন্দ করেছিলেন যুদ্ধ বিমানের পাইলট জীবনকে। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এই ব্যথিত বাল্যকালেই তখন তিনি দেখা পান ‘স্বামী শিবানন্দের। স্বামীজি তাঁকে বললেন, ‘তুমি যে কারণে জন্মগ্রহণ করেছ, সে গন্তব্যস্থলকেই গ্রহণ করো, আর তা নিয়েই ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করো। হতে পারে তুমি এ পথের নও, হয়তোবা তুমি এয়ার ফোর্স অফিসার হওয়ার জন্য জন্মাওনি। তোমার গন্তব্য হয়তোবা আরও মহান কোনো পথে, সে পথ তুমি এখনো খুঁজে না পেতে পারো কিন্তু তা অবশ্যই পূর্বলিখিত। নিজের অস্তিত্বের সন্ধান করো আর অস্তিত্বের কারণ খুঁজে বের করো’ (wings of Fire দ্রষ্টব্য)। ব্যর্থতার গ্লানি এক নিমিষেই মুছে গিয়েছিলো। তিনি ভারতের সেরা বিজ্ঞানী হলেন, রাষ্ট্রপতি হলেন…

আকাশে উড়ার গল্প বলা

২০১৪ সালে সর্বশেষ বাংলাদেশে এসেছিলেন মি. কালাম। দেশের তরুণ সমাজকে অনুপ্রাণিত করে তিনি যে গল্প বলেছিলেন, সেটি নিম্নরূপ:

“তোমাদের যখন পেলামই তখন আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মূলত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি আমি আজ আলোকপাত করবো। সেগুলো হলো: ১)জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ, ২) জ্ঞান আহোরণ, ৩) অনেক বড় সমস্যায় পড়লেও লক্ষ্য থেকে সরে না আসা এবং ৪) কোনো কাজে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোকেই নেতৃত্বগুণে সামাল দিতে পারা। আমার শিক্ষাগুরু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিব সুব্রামনিয়াম একদিন একটি পাখির ছবি এঁকেছিলেন। তারপর অনেকক্ষণ ধরে শিখিয়েছিলেন পাখি কীভাবে আকাশে ওড়ে। বলেছিলেন, ‘কালাম, কখনো কি উড়তে পারবে এই পাখির মতো’? সেই থেকেই আমার আকাশে ওড়ার স্বপ্নের শুরু। উড়তে গেলে ঠিক কি করতে হবে, সেটি আমি বলবো না। সেটা তোমরা নিজেরাই ঠিক করে নেবে। তবে আমি তোমাদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে পারি। কথাগুলো তোমরা আমার সাথে বলো, ‘সব সময় জীবনের অনেক বড় লক্ষ্য রাখবো। মনে রাখবো ছোট লক্ষ্য অপরাধের সমান। আমি অব্যাহতভাবে জ্ঞান আহরণ করে যাবো। সমস্যা সমাধানের অধিনায়ক হবো। সমস্যার সমাধান করবো। সমস্যাকে কখনো আমার ওপর চেপে বসতে দেবো না। যতো কঠিণ সময়ই আসুক না কেনো কখনোই হাল ছেড়ে দেবো না। এভাবেই আমি একদিন উড়বো’।

জীবনের কিছু খন্ডচিত্র

১) শিলং এর শেষ যাত্রাপথে মি. কালামকে এসকর্ট করে যাওয়া সামনের গাড়ীটিতে মেশিনগান নিয়ে দাঁড়িয়ে এক জওয়ান। মি. কালামের চোখ তার দিকেই। মি. কালাম তাঁর ছায়াসঙ্গী সৃজনপাল সিংহকে বারবার বলে শেষ পর্যন্ত ওয়ারলেসের মাধ্যমে ঐ জাওয়ানকে বসার অনুরোধ পাঠাতে সক্ষম হলেন। কিন্তু নিয়মের বেড়াজালে আটকে গেল অনুরোধ। জাওয়ান পুরোটা পথ নিয়মরক্ষা করে আড়াই ঘন্টা দাঁড়িয়েই গেলেন। শিলং পৌঁছেই মি. কালাম ঐ জাওয়ানের খোঁজ নিলেন।তার নাম এস এ লাপাং। খবর পেয়েই ছুটে এলেন লাপাং। মি. কালাম তার সাথে হাত মিলিয়ে ক্ষমা চাইলেন। বললেন, ‘আমার জন্যই এতটা পথ এভাবে আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হলো! নিশ্চয়ই ক্লান্ত লাগছে? আমার সঙ্গে বসে কিছু খেয়ে যান’। ভ্যাবচাকা ভাবটা কাটাতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন লাপাং। তারপর বললো, ‘স্যার, আপনার জন্য তো আমি ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসে দাঁড়াতে পারি’!

২) একবার এক মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর চেয়ারটি অন্যসব চেয়ার থেকে বড় হবার কারণে ঐ চেয়ারে তিনি বসতে অস্বীকার করেন এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ একটি চেয়ারেই বসেন।

৩) নিজের ঘরে কোনোদিন টিভি বসাননি তিনি। অবশ্য প্রতিদিনই রেডিওতে ‘আকাশবাণী’ শুনতেন।

৪) সময় সুযোগ পেলেই দুটি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতেন। একটি কোরান, অন্যটি ভবগত গীতা।

৫) শিশু প্রেমিক কালাম প্রতিদিন শিশুদের থেকে গড়ে ৩০০ ই-মেইল পেতেন। রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি ক্ষুদ্র কক্ষ নিজের থাকার জন্য নির্বাচিত করে নির্ধারিত বড় কক্ষটিকে শিশুদের জন্য একটি গ্যালারী করে দেন। সেখানে শিশুদের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়।

৬) ভবন কম্পাউন্ডে একটি জীববৈচিত্রের পার্ক, ভেষজ বাগান করেন।

৭) প্রতিদিন সকাল ৬-৩০ নাগাদ বিছানা ছাড়তেন এবং রাত ২-০০ নাগাদ বিছানায় বিশ্রামে যেতেন। আড়ম্বরবিহিন অত্যন্ত সাদামাটাভাবে জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন।

অপূর্ণ আশাজনিত কষ্ট

মি. কালামের অপূর্ণ আশাজনিত কিছু কষ্টের মধ্যে অন্যতম ছিলো তাঁর বাবা-মার জীবদ্দশায় তাদের ঘরে ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎতের ব্যবস্থা না করতে পারার দু:খ।

এছাড়া তিনি সবসময় দেশের শত কোটি মানুষের মুখে হাসি দেখতে চেয়েছিলেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উন্নতি ও তরুণদের ক্ষমতায়নও তিনি দেখতে চেয়েছিলেন।

অবিস্মরণীয় ১০টি উক্তি

১) আপনার স্বপ্ন সত্যি করার আগে স্বপ্ন দেখতে হবে। ওটা স্বপ্ন নয়, যেটা আপনি ঘুমিয়ে দেখেন, স্বপ্ন তা-ই যা আপনাকে ঘুমোতে দেয় না।

২) শ্রেষ্ঠত্ব একটি অবিরাম প্রক্রিয়া। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়।

৩) প্রথম বিজয়ের পর বসে থাকবেন না। কারণ, দ্বিতীয়বার যখন আপনি ব্যর্থ হবেন অনেকেই বলবেন প্রথমটিতে শুধু ভাগ্যের জোরে সফল হয়েছিলেন আপনি।

৪) একটি দেশকে যদি দুর্নীতিমুক্ত করতে হয় ও দেশের সব মানুষকে যদি সুন্দর মনের করে গড়ে তুলতে হয় তাহলে আমি মনে করি সমাজের তিন ধরনের মানুষ সে কাজটি করতে পারেন। তারা হলেন- একজন বাবা, একজন মা এবং একজন শিক্ষক।

৫) সফলতার গল্পে কেবল একটি বার্তা থাকে কিন্তু ব্যর্থতার গল্পে সফল হওয়ার উপায় থাকে।

৬) বৃষ্টির সময় প্রত্যেক পাখিই কোথাও না কোথাও আশ্রয় খোঁজে। কিন্তু ঈগল মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে বৃষ্টিকে এড়িয়ে যায়।

৭) কেউ তার ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে না, তবে অভ্যাস বদলাতে পারে। আর অবশ্যই অভ্যাস ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

৮) আমি সুদর্শন নই। কিন্তু আমি আমার হাত তার জন্য বাড়িয়ে দিতে পারি, যার সাহায্য প্রয়োজন। সৌন্দর্য মানুষের হৃদয়ে থাকে, মুখে বা বাইরে নয়।

৯) কাউকে হারিয়ে দেয়াটা খুব সহজ, কিন্তু কঠিন হল কারও মন জয় করা।

১০) ছাত্রদের মাঝে অনুসন্ধান, সৃজনশীলতা, উদ্যোক্তা এবং নৈতিক নেতৃত্বের সক্ষমতা তৈরি করা উচিত শিক্ষাবিদদের।

রচিত গ্রন্থাবলী

মি. কালাম ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল লেখক। তিনি বেশ কিছু প্রণোদনামূলক ও প্রভাবশালী গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসবের মধ্যে ‘India 2020’ সর্বাধিক পঠিত ও প্রশংসিত। এ গ্রন্থে তিনি ২০২০ সালের মধ্যে ভারতকে সুপারপাওয়ার হতে হলে কী ধরণের পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে যেতে হবে সে বিষয়ে একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন। এছাড়াও বহুল পঠিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- Ignited minds, Mission India, Inspriring thoughts, The luminious sparks, Wings of Fire ইত্যাদি।

উপসংহার

কলেবর বৃদ্ধি করেও তাঁর সম্পর্কে সবটা লেখা এ অধমের পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় উপসংহার টানাই শ্রেয়। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন থাকাকালে বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি আহবান রেখে বলেছিলেন, ‘স্কুলের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে নীতি বিজ্ঞান (Ethics) কে অন্তর্ভূক্ত করার জন্য। নীতিহীন বস্তুবাদী এই নষ্ট সময়ে এর গুরুত্ব কতো, সেটা বলার কোনো প্রয়োজন আছে কি?

উইংগস অফ ফায়ারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা প্রত্যেকে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত একটি আগুন নিয়ে জন্মগ্রহণ করি। আমাদের প্রচেষ্টা হওয়া উচিত এই আগুনকে জানা এবং বিশ্বকে এর মঙ্গলের দিপ্তী দিয়ে পূর্ণ করা। বললেন, ‘একটি পাখি যখন উড়ে চলে তখন আকাশটাই তার সঙ্গী হিসেবে সে যেখানে গিয়ে বসে সেটাই হয় তার নিজের স্থান’ (এ ভাবনা থেকেই গ্রন্থটির নামকরণ)।

এ গ্রন্থের শেষ অনুচ্ছেদে বলেন, ‘অন্যদের কাছে নিজেকে একজন উদহারণ হিসেবে দাঁড় করানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি কারও কারও জীবন অন্যকে প্রেরণা দিতে পারে এবং চূড়ান্ত প্রশান্তিতে তার চেতনাকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সৃষ্টিকর্তার বিধানই আপনার উত্তরাধিকার। আমার প্রপিতামহ আবুল, পিতামহ পাকির, পিতা জয়নুল আবেদিনের বংশধারা আবদুল কালামেই এসে শেষ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তার মাধুর্য কখনও শেষ হবে না, কারণ এটি চিরন্তন।

অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘যদি সূর্যের মতো আলো ছড়াতে চাও, তাহলে আগে সূর্যের মতো জ্বলো’।

১৬ এপ্রিল, ২০১৭ ২০:৩৩ পি.এম