আসন্ন বাজেট ঘোষণাকে সামনে রেখে ‘স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে কর সুবিচার নিশ্চিতসহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বাজেট বৃদ্ধি চাই। এই দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার (১৬ মে) সকাল ১১.০০ মিনিটে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বেসরকারী নাগরিক সংগঠনের জোট সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র উক্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন । সুপ্র’র চেয়ারপার্সন এস এম হারুন অর রশিদ লাল সভাপতিত্বে করেন। সুপ্র সাধারণ সম্পাদক এম এ কাদের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সম্মেলন পত্র পাঠ করেন সুপ্র’র ভাইস চেয়ারপার্সন মঞ্জু রাণী প্রামাণিক।

সম্মেলনে বক্তারা  বলেন যে, সম্প্রতি প্রত্যক্ষ করকে (মূলত আয়কর) প্রাধাণ্য দিয়ে বাজেটের আয়ের একটি বড় অংশ প্রাক্কলন করা হচ্ছে যেটা নি:সন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এক্ষেত্রে কর প্রশাসনকে আরো দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যাতে করে সরকারকে ঘুরে ফিরে সেই পরোক্ষ করের উপরই নির্ভর না করতে হয়। এছাড়া আগামী ১ জুলাই, ২০১৭ হতে চালু হতে যাওয়া নতুন মূসক আইন সম্পর্কে তারা বলেন সকল পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে সব স্তরে একই হারে ভ্যাট প্রদান করতে হবে। সুষ্ঠু ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের স্বার্থে এনবিআর ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা সমন্বয় প্রয়োজন কেননা ব্যবসায়ীরা যদি সততা ও নৈতিকতা নিয়ে এগিয়ে না আসেন তাহলে নতুন ভ্যাট আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন মুখ থুবড়ে পড়বে। আর ক্ষতিগ্রস্থ হবে ভোক্তা অর্থাৎ জনসাধারণ। তাছাড়া মূসক যেহেতু হিসাবভিত্তিক কর ব্যবস্থা এবং নতুন আইনে প্রতিটি মূল্য স্তরে কর রেয়াত বিবেচনায় রেখে কর নির্ধারণ করতে হবে, সেহেতু দ্রব্য ও সেবা মূল্যের প্রতিটি স্তরে হিসার সংরক্ষণের সক্ষমতা সব ব্যবসায়ীদের একই ভাবে আছে কিনা সেটাও মূখ্য বিবেচ্য বিষয়। অতএব নতুন আইন বাস্তবায়নের আগে এ বিষয়গুলি খতিয়ে দেখতে হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নতুবা আইনের সুফল ভোক্তারা কখনোই পাবে না বরং বঞ্চিত হবে ন্যায্যতা থেকে। করব্যবস্থাকে ন্যায্য তথা বঞ্চনামূক্ত করতে হলে ভ্যাট আহরণে সরকার ও কর্তৃপক্ষকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

বক্তারা বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সমন্ধে বলেন যে, প্রায় প্রতি বছরের বাজেট ঘোষণায় কালো টাকা সাদা করার একটা সুযোগ থাকে। এটি দূর্নীতির আশ্রয়ে অর্জিত সম্পদকে বৈধ করার একটি প্রক্রিয়া। সুপ্র মনে করে বারবার এহেন সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে কালো টাকা উপার্জনের প্রতি উৎসাহ দেখানো হয়। এতে করে অবৈধ পথে সম্পদ অর্জনের মাত্রা সমাজে বেড়ে যায়। দূনীতি প্রতিরোধ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এ ধরনের পদক্ষেপ একটি বাধা হিসাবে কাজ করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাজেটে কালো টাকা সাদাকরণের এ ধরনের পদক্ষেপের আমরা জোর বিরোধিতা করছি। সুপ্র’র প্রত্যাশা দূর্নীতি প্রতিরোধ তথা সুশাসনের স্বার্থে আসন্ন বাজেটে কালো টাকা সাদাকরণের সুযোগ রহিত হবে।

বাজেট বাস্তবায়ন সমন্ধে বক্তারা বলেন, বাজেট যথাসময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ। বাস্তবায়নের ঘাটতির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯৩ শতাংশ বাজেট বাস্তবায়িত হয়েছিল। ক্রমান্বয়ে তা কমতে কমতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নেমেছে সাড়ে ৭৮ শতাংশে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বাজেট শতভাগ বাস্তবায়িত না হলে কাক্সিক্ষত সুফল কখনওই পাওয়া যাবে না। শুধু তাই নয় ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র (এসডিজি) কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণও ব্যাহৃত হবে।  তাই কেবল বাজেট বরাদ্দ দিলেই হবে না, নাগরিক প্রদত্ত করের অর্থে প্রণীত বাজেটের সুষ্ঠু ও গুণগত বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। যাতে করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ অত্যাবশ্যকীয় সকল সেবাখাতসমূহে নাগরিকদের গুণগত সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।  ।

সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক্স ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ ও সুপ্র সচিবালয়ের কর্মীবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে সুপ্র’র সুনির্দিষ্ট সুপারিশগুলো হলো:

* কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা আনয়নের মাধ্যমে দরিদ্রবান্ধব ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
* দরিদ্রবান্ধব জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে;
* কালো টাকা সাদার সুযোগ রহিত করতে হবে;
* নাগরিকের করের টাকায় বাজেট নাগরিকের অংশগ্রহণেই প্রণীত হতে হবে, এজন্য কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে জনঅংশগ্রহণমূলক জেলা বাজেট দিতে হবে।
* টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনে শিক্ষায় জিডিপি’র ৬% বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
* শিক্ষা বাজেট থেকে সামরিক শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য বাজেট পৃথক করতে হবে।
* চাহিদা অনুযায়ি অঞ্চলভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ এবং পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

* জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে কমপক্ষে জিডিপি-এর ৩% বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি বাজেটের সুষম বন্টন এবং বাজেট ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
* শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের বাণিজ্যীকরণ বন্ধ করতে হবে।
* টেকসই কৃষি উন্নয়নে চাহিদাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন।
* ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জীবনচক্র ভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর কার্যকর বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এস আর/নীরব/কে আই/ ১৬ মে ২০১৭