নিজস্ব প্রতিবেদক: আশরাফুল ইসলাম (৩০)। চার বছর আগে বাংলাদেশের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সিএ পড়তে পড়েত লন্ডনে চাকুরী করতে চলে যান। সেখানকার একটি রেস্টুরেন্টে চাকুরীও করেন চার বছর ধরে। তার পর নিজ দেশের নিজ গ্রাম যশোর জেলার গদখালীতে চলে আসেন। এর পরে শুরু করেন জারবেরা ফুলের চাষ। এখান থেকে এখন তিনি প্রতিবছরে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুনাফা অর্জন করেন বলে জানালেন এ সফল ফুল চাষী।

তিনি জানান, শুধু তিনি নন। এলাকার হাজারো শিক্ষিত বেকার ফুল চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে। তাদের দেখা দেখি তিনিও এ ফুল চাষে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি আরো জানান, ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে সুদূর লন্ডন গিয়েছিলেন চার বছর আগে। কিন্তু সেখানে অর্থ উপার্জন করা এখন অনেক কঠিন। তাছাড়া সেখানে বিদেশী শ্রমিকরা নানা হয়রানীর শিকার হন। একারণে তিনি বছর খানেক আগে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এর পর থেকে নিজ গ্রামের মাঠে বাবার দেওয়া দেড় বিঘা জমিতে ফুল চাষ শুরু করেন। সেখান থেকে খরচ-খরচা বাদে এখন তার প্রতিবছরে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা উপার্জন হচ্ছে।

গদখালী মটবাড়ি এলাকার স্কুল শিক্ষক আব্দুল সাত্তার জানান, বাংলাদেশে সব সময়ে ফুলের কদর থাকে না। বাংলাদেশের বিজয় দিবস,১৪ ফ্রেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালবাসা দিবস ও ২১ ফ্রেব্রুয়ারী আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস, বসন্ত বরণ উপলক্ষে ফুলের চাহিদা থাকে খুব বেশি। যে কারণে অধিকাংশ চাষীরা এ দিনগুলোকে সামনে রেখে ফুলের চাষ করে থাকে। এ দিনগুলোর এখনো প্রায় এক থেকে তিন মাস বাকি। এরই মধ্যে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ফুলের স্বর্গ নামে পরিচিত গদখালীতে কৃষকরা ফুল চাষে ব্যস্ত সময় পার করছে। এবছর আমিও এক বিঘা জমিতে গ্লার্ডিয়াস ফুল রোপন করেছি। উৎপাদানও ভাল হয়েছে। ক্ষেত থেকে একদিন পর একদিন ফুল তুলছি। তবে এখন দাম একটু কম।

যশোর শহর থেকে বেনাপোল সড়ক হয়ে নতুন হাট পেরুলেই শুরু হয় ঝিকরগাছা উপজেলা। বেনাপোল যাওয়ার সময়ে রাস্তার দু’পাশে তাকালে চোখ জোড়ানো ফুলের সব বাগিচা লক্ষ্য করা যায়। এ বাগান পরিচর্যার নয়নাভিরাম দৃশ্য চোঁখে পড়ে শার্শা উপজেলার কিছু অংশ পর্যন্ত। তবে ইদানিং ঝিকরগাছা উপজেলার পাশের উপজেলা চৌগাছা এলাকায়ও বেশ কিছু ফুল চাষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঝিকরগাছার গদখালীসহ ও শার্শা উপজেলায় দুই হাজার একরেরও বেশি জমিতে ফুল চাষ করে স্থানীয় কৃষকরা। এসব ক্ষেত থেকে প্রতিবছর ২০ কোটি টাকা মূল্যের ফুল উৎপন্ন হয়ে থাকে।

464646

পথের দু’পাশে বিস্তৃত দিগন্ত তাকালে দেখা যাবে কৃষকরা নানা ধরনের ফুল চাষে ব্যস্ত সময় পার করছে। সব কৃষকরে একটা মাত্র লক্ষ্য বছরের বিশেষ দিনগুলো আসার আগেই ফুল উৎপাদান করা। কারণ সারা বছরতো আর ফুলের তেমন চাদিহা থাকে না তাই। বছরের বিশেষ দিন ছাড়া উৎপাদিত ফুলের দাম না থাকায় তা নষ্ট হয়ে যায় ক্ষেতেই। এসব কৃষকরা বাড়ির চার ধারে সৌখিন ফুল প্রেমিক নয় । তারা শুধু মাত্র বানিজ্যিক ভিত্তিত্বে জমিতে ফুল চাষ করে থাকেন। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফুলের ক্ষেত। ফুলই এখানকার প্রধান অর্থকারী ফসল। বিশেষ দিনগুলো এলে এলাকার আকাশে-বাতাসে ফুলের মিষ্টি সৌরভ ছড়ায়। সর্বত্র মৌমাছি মধূ আহরণের জন্য গুঞ্জন করে। প্রজাপতির ডানার জৌলুশ আর রঙের অফুরান্ত শোভা ছড়ায় এলাকায়। এসব ফুল বাগানের সামনে দাড়ালে বিশ্বাসই হতে চায় না জায়গাটা আমাদের রক্ত, ক্লোদ আর কোলাহলে ভরা মাটির পৃথিবীরই একটা টুকরা। এসব ফুলের মধ্যে রয়েছে সাদা রজনীগন্ধা, লাল রজনীগন্ধা,রঙ-বেরং এর গ্যালাডিয়াস, গোলাপ আর গাঁদা ফুল।

ফুল উৎপাদনের স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য যোগ্য হলো ঝিকরগাছা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের মাগুরা গ্রাম, গদখালি ইউপির হাজের আলী, কামারপাড়া, গদখালি, পটুয়াপাড়া, নবীনগর, বোধখানা, ফতেপুর, জাফরনগর, মেঠোপাড়া, পানিসরা, ইউপির টাওরা, পানিসরা, চাপাতলা, সৈয়দপাড়া, বৈচিতলা, কৃষ্ণচন্দপুর, নরানঙ্গালী, কুলিয়া, গাবড়োপুর, নাভারন ইউপির হাড়িয়া, বাইশা, চাঁদপুর, আমিনি, শরীফপুর, নির্বাসখোলা ইউপির নিশ্চিতপুর, শির্য়দা, আরসিংড়ি, শার্শা থানার শার্শা ইউপির মাটিপুকুর, জিরেনগাছা, শ্যামলগাছি, ধলদারামপুরসহ আশপাশের এলাকা জুড়ে যে ফুল চাষ শুরু হয়েছে তার পরিধি দিন দিন বাড়ছে। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এসব গ্রামের কৃষকরা রজনীগন্ধা, গোলাপ, গ্লাাডিয়াস, জারবেরা ফুলের চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য লড়ে যাচ্ছেন।

এলাকার প্রবীন ফুল চাষীদের সাতে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে প্রথম যশোরের ঝিকরগাছা থানার পানিসরা গ্রামের কয়েকজন যুবক ব্যবসায়ী ভিত্তিতে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ শুরু করেন। এর আগে দেশে বৃহৎ পরিসরে রজনীগন্ধা চাষের কোন খবর পাওয়া যায়নি। তবে বাড়ির আঙিনায় শখের বশবর্তী হয়ে রজনীগন্ধা ফুলের চাষ করেছেন অনেকেই।

4545455

ঝিকরগাছা এলাকার নার্সারি ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান সর্দার জানান, নিজের নার্সারীতে ফুলের চারা বিক্রি করতেন। প্রথম দিকে এলাকার ফুল প্রেমিক লোকজন তা কিনে নিয়ে বাড়ির টবে পুতে রাখতেন। এর পর পরই কয়েক জন যুবক বেশি সংখ্যক ফুলের চারা জমিতে রোপন করে ফুল বিক্রির আশায়। তার পর থেকে ঐসব যুবকদের অনুসরণ করে এলাকার বেকার যুবকরা ফুল চাষের দিকে ঝুকে পড়ে। আস্তে আস্তে তা এলাকায় বানিজ্যিক চাষে রুপ নেয়। বর্তমানে দেশের ফুলের বাজারের সত্তর শতাংশ ফুলই ঝিকরগাছা উপজেলায় উৎপাদন হয়ে থাকে। এখানকার ফুল বিগত কয়েক বছর দেশের বাইরেও রপ্তানী হচ্ছে বলেও তিনি জানান । তিনি আরো বলেন আশির দশকে বাবার সাথে বিভিন্ন ফুলের বীজ ও চারা আনতে ভারতে যেতেন। সেখান থেকে বীজ ও চারা নিয়ে এসে নার্সারীতে চারা উৎপাদন করতাম ও পরে তা বিক্রি করতাম এলকার বিভিন্ন হাটবাজারে।

কথা হয় সৈয়দপুর গ্রামের ফুলচাষী আবদুস সোবাহানের সাথে। তিনি বলেন, জুলায়-আগাষ্ট মাসে এক বার চারা রোপন করা হয়েছিল। কিন্তু অতি বৃষ্টির কারণে সেই সব ফুলের ক্ষেত্র প্রায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। আবার সেপ্টেম্বর ও অক্টবরে আবারো ফুলের চারা অনেকে রোপন করেছেন। অনেক কৃষক এখনো ফুলের চারা রোপন করেছে। অনেকের গাছে ইতোমধ্যে দু’একটি ফুলও ফুটেতে শরু করেছে।

গদখালীর ফুলচাষী রহমান জানান, বর্তমান সময়ে সব ফুলই সারা বছর উৎপাদন করা যায়। তবে বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন কম হওয়ায়। প্রতি বিঘা জমিতে গোলাপ ফুলের চাষ করতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। রজনীগন্ধা ফুলের চাষ করতে খরচ হয় ৪০ হাজার টাকা। এক বিঘা গ্লার্ডিয়াস ফুলের চাষ করতে খরচ হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এক বিঘা জারবেরা ফুলের চাষ করতে খরচ হয় ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার মত। গ্লাাডিয়াস ফুল ১ বার লাগালে তা প্রায় ৫/৭ বছর বিরামহীন ভাবে ফুল দেয়। ৩ বছরে এক বিঘা গ্লাাডিয়াাস ফুল থেকে ২৫ লাখ টাকা বিক্রি করা সম্ভাব বলেও তিনি জানান। গ্লার্ডিয়াস এক বছর লাগালে একই মোথায় দু’থেকে তিন বছর ফুল পাওয়া যায়। তাছাড়া গোলাপ ও রজনী গন্ধা এক বছর ফুল দিয়ে গাছ মারা যায়।

গদখালি ফুলচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, এবছরে অতি বৃষ্টির কারণে অনেক কৃষকের ফুলের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। এলাকার কৃষকরা সাধারণত বিশেষ কয়েকটি দিনের জন্য ফুল উৎপাদন করে থাকেন। এ বিশেষ দিনগুলো চলে গেলে কৃষকদের ফুল পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। ফুল যাতে নষ্ট না হয় সে জন্য সকারের নিকট কৃষকদের ফুল সংরক্ষণের জন্য গদখালীতে হিমাগার স্থাপনেরও দাবি জানান তিনি।