এমনিতেই ঢাকার রাস্তায় নিয়ম-শৃঙ্খলার অভাব প্রকট। কে কার আগে যাবে, কে কাকে আটকে রাখবে, সেসবের প্রতিযোগিতা চলে।

আর রাতের রাস্তায় তো নিয়মকানুনের বালাই-ই নেই। রাত সাড়ে ১০টার পর বেশির ভাগ রাস্তায় কোনো ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। অনেক রাস্তায় সিগন্যাল বাতি জ্বলে না, জ্বললেও তা মানা হয় না। বিশেষ করে বাস-ট্রাকগুলো এ সময় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আবার কিছু ধনীর দুলাল আছে, তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে রাস্তায় গতির প্রতিযোগিতা করে। কখনো কখনো নেশাগ্রস্ত হয়েও গাড়ি চালায়। ফলে রাতে ঢাকার রাজপথ রীতিমতো মৃত্যুকূপে পরিণত হয়। পরিসংখ্যানও তা-ই বলে। ঢাকায় যত দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৭০ শতাংশই ঘটে রাত সাড়ে ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে। অথচ এ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

ট্রাক মালিকদের সংগঠনের সূত্রে জানা যায়, রাতে ট্রাকের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা আছে। বাস্তবে প্রায় কোনো ট্রাকচালকই তা মানে না। একইভাবে অন্যান্য যানবাহনেরও গতিসীমা নির্ধারণ করা আছে। রাতের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা রাস্তায় তা মেনে চলার মতো মানসিকতা ঢাকার রাস্তায় গাড়িচালকদের আছে বলে মনেই হয় না। এ সময় প্রাইভেট কার ১০০ কিলোমিটার কিংবা তারও বেশি গতিতে চলে থাকে। গত মাসে রাত ২টার দিকে হাইকোর্টের কাছে ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা কয়েকজনকে চাপা দেয় একটি জিপ। হাসিনা ও সাহেরা নামে দুই নারী ঘটনাস্থলেই মারা যান। জানা যায়, চাপা দেওয়ার আগে জিপটি ৮০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে চলছিল। গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় মদ্যপ এক তরুণ গাড়ি চালানোর সময় এক প্রবীণ দম্পতিকে চাপা দিলে তাঁদের মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান সাংবাদিক আবদুল্লাহ ফারুক। একই বছরের ১২ অক্টোবর রাতে গুলশানের রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কয়েকটি রিকশাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল এক ধনীর দুলাল। গুরুতর আহত হয়েছিল চারজন। গত বছরের ২৫ নভেম্বর তেজগাঁওয়ে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় নিহত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা হাবিবুর রহমান। এই পরিসংখ্যান অনেক দীর্ঘ এবং আপাতদৃষ্টে মনে হয় তা কেবল দীর্ঘই হতে থাকবে। কারণ এসব রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো আমাদের চোখে পড়ছে না।

সব দেশেই রাস্তা আছে এবং সেসব রাস্তায় যানবাহন চলাচল করে। উন্নত অনেক দেশে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন রাস্তায় চলে। কিন্তু সেসব দেশে এমন বিশৃঙ্খলা হয় না। তার কারণ সেসব দেশে রাস্তার শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়। কেউ নিয়মকানুন না মানলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দুঃখজনক হলো, আমাদের এখানে আইন আছে; কিন্তু আইন মানার মানসিকতা কম, মানানোর ব্যবস্থা আরো কম। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এই মৃত্যুকূপের পরিধি কেবল বাড়তেই থাকবে।