পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ কানাডার আদালতে ‘গালগপ্প’ প্রমাণ হওয়ার পর দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের কাছে ‘সুবিচার’ কামনা করে চিঠি দিয়েছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। এতে তিনি লেলেন, বিশ্বব্যাংক মিথ্যা অভিযোগ তোলার পর প্রথম আলো তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে নেমেছিল। কিন্তু অভিযোগটি মিথ্যা প্রমাণ হওয়ার পর এখন পত্রিকাটি তার সম্মানের বিষয়টি নিয়ে চিন্তাই করছে না।

রবিবার সকালে সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনালের একজন অফিস সহকারী কারওয়ানবাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে গিয়ে চিঠিটি পৌঁছে দেন। আবুল হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী সমীর দাস জানান, প্রথম আলো কার্যালয় থেকে চিঠিটি রিসিভ করে ওই অফিস সহকারীকে জানানো হয়েছে, চিঠিটি সম্পাদকের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।

প্রথম আলোর যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর রহমান খান ও সোহরাব হাসান এবং প্রধান বার্তা সম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছিকেও এই চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে।

মতিউর রহমানকে আবুল হোসেন লেখেন, ‘বদলে যাও, বদলে দাও-প্রথম আলোর এই শ্লোগানকে ধারণ করে আমার প্রতি সুবিচার করবেন- এটাই কামনা করি। আশা করি প্রথম আলো সত্যের পথে হাঁটবে। মিথ্যে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ করে সত্য রিপোর্ট প্রকাশ করে নিজেকে বদলে দেবে। এই প্রত্যাশায় আপনাকে আমার এই পত্র লেখা।’

অবশ্য যোগাযোগ করা হলে প্রথম আলোর প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা কামরুল আহসান রুবেল দাবি করেন, তারা কোনো চিঠি পাননি। তিনি বলেন, ‘চিঠি আসলে আমার কাছেই আসবে।’

কিন্তু আবুল হোসেনের প্রতিষ্ঠানের কাছে তো রিসিভ কপি আছে-এই মন্তব্যের জবাবে প্রথম আলো কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা সম্ভবত কোনো ভুল অফিসে চিঠি দিয়ে গেছে।’

২০১০ সালে পদ্মাসেতুর কাজ শুরু হওয়ার আগে আগে পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ তোলে বিশ্বব্যাংক। এই অভিযোগে বেশ কয়েক বছর টানাপড়েনের পর ২০১২ সালের ৩০ জুন এক বিজ্ঞপ্তিতে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করার কথা জানায় বিশ্বব্যাংক। এরপর এই প্রকল্প থেকে সরে যায় এডিবি, আইডিবি ও জাইকাও। এরপর সরকার নিজ অর্থায়নে সেতুর কাজ শুরু করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় নষ্ট হয় পাঁচটি বছর। ২০১৩ সালে সেতুটি চালুর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করা হলেও এখন তা চালু হবে ২০১৮ সালের শেষে।

01
বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুতে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ তোলার পর সে সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের কট্টর সমালোচনা করেছে প্রথম আলো। তাকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক নানা লেখা ছাপার পাশাপাশি সরকারেরও কঠোর সমালোচনা করে দৈনিকটি।

তবে এই কথিত দুর্নীতি চেষ্টার ঘটনায় কানাডার আদালতে করা একটি মামলা খারিজ করে দিয়েছে সে দেশের আদালত। বিচারক অন্টারিও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ইয়ান নরডেইমার আদেশে বলেন, বিশ্বব্যাংকের আবেদনের বিষয়ে তার ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। এগুলোতে যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে সেগুলো ‘অনুমানভিত্তিক, গালগল্প ও গুজবের বেশি কিছু নয়।’

তবে পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান। বিশ্বব্যাংকের চাপের মুখে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় জেল খাটেন যোগাযোগ সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া।

এই বিষয়টির উল্লেখ করে মতিউর রহমানকে আবুল হোসেন লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংকের মিথ্যা ও অহেতুক ষড়যন্ত্রের অভিযোগের কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করায় নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করায় দেশীয় বাজেটে চাপ পড়েছে। দেশের অন্য উন্নয়ন কর্মসূচি সংকুচিত করতে হয়েছে। দেশের ইমেজ ও জনগনণের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ছেলেমেয়েদের যুক্তরাষ্ট্রের হোম অফিসে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তৎকালীন সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়াকে জেলে যেতে হয়েছিল। সর্বোপরি, আমাকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরে যাওয়াসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আমার সামাজিক ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়েছে।’

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ যে মিথ্যা ছিল সেটি মতিউর রহমান আগে থেকেই জানতেন বলে চিঠিতে উল্লেখ করেন আবুল হোসেন। তিনি লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংক অভিযোগে প্রথমে বললো- পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। পরে বললো- দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। এর অর্থ দুর্নীতির প্রথম বক্তব্য থেকে বিশ্বব্যাংক সরে এলো। এরপরে বললো- দুর্নীতির অভিপ্রায় হয়েছে। এর অর্থ দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকেও বিশ্বব্যাংক সরে এলো। বিশ্বব্যাংকের তিনটি বক্তব্যই প্রমাণ করে পদ্মা সেতুতে কোন দুর্নীতি, দুর্নীতির ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির অভিপ্রায় হয়নি। এ সত্যটুকু বুঝার জন্য কানাডার আদালতের রায় কি প্রয়োজন ছিল? এ বিষয়টি আপনার মত অভিজ্ঞ লোকেরা, সাংবাদিকরা বুঝেন না বললে-সত্যের অপলাপ হবে।’

pdmaবিশ্বব্যাংক অভিযোগ তোলার পর পর আবুল হোসেনকে নিয়ে প্রথম আলোতে নানা নেতিবাচক খবর ও ব্যাঙ্গাত্মক লেখার বিষয়টিও উল্লেখ করেন সাবেক এই যোগাযোগমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত সততাকে, আমার সৎ উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে খবর প্রকাশ করেছেন। আমাকে অসৎ ও দুর্নীতিবাজ প্রমাণে, দুর্নীতির কালিমা লেপনের লক্ষ্যে আমাকে এবং আমার কাজ নিয়ে মিথ্যা রিপোর্ট করেছেন।’

সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী লেখেন, ‘মিথ্যা রিপোর্ট প্রকাশ করে আমাকে একজন অসৎ মন্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নিয়েছেন। বিশ্বব্যাংককে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন এবং আমাকে টার্গেট করে পদ্মা সেতু থেকে অর্থায়ন ফিরিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংককে সহযোগিতা করেছেন।’

প্রথম আলোতে অব্যাহত অসত্য প্রতিবেদনের জন্য পরিবারকে হেনস্তা হতে হয়েছে বলেও জানান আবুল হোসেন। তিনি লেখেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণের স্বার্থে আমাকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে আমাকে সরে আসতে হয়েছে। আমাকে জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছে। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনসহ আমার সব ব্যাংক একাউন্ট তদন্ত করা হয়েছে। কানাডায় আমার জামাতার ব্যাংক হিসাবও তদন্তের আওতায় এসেছে। আপনার ও আপনার পত্রিকার মিথ্যা রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে রাতে টকশোতে আমাকে অসততার ছাপ মারতে কতিপয় আলোচক মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।’

মতিউর রহমানকে আবুল হোসেন লেখেন, ‘আমি এমন কী অন্যায় কাজ করেছি, কি দুর্নীতি করেছি, কারো সাথে অসদাচারণ করেছি- যার জন্য আপনি ও আপনার পত্রিকা আমার বিরুদ্ধে এভাবে লিখতে পারেন? কোন বিচারেই, বিশেষ করে, কোন মূল্যবোধের বিচারে দোষী সাব্যস্ত বা আমাকে টার্গেট করে লিখতে পারেন না। এটা অন্যায়, এটা সত্যের প্রতি অপবাদ।’

কানাডা আদালতের রায় প্রকাশের পর আবুল হোসেন যে বিবৃতি দিয়েছিলেন সেটি প্রথম আলো ভালোভাবে প্রচার না করায় দুঃখ পেয়েছেন আবুল হোসেন। তিনি বলেন, এখন প্রথম আলোর উচিত তার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসা।

আবুল হোসেন লেখেন, ‘আমি মনে করি, সামগ্রিক বিষয়, বিশেষ করে, আমার প্রতি আপনার পত্রিকা যে অন্যায়ভাবে নেতিবাচক রিপোর্ট করেছে তা আমলে নিয়ে একটি সম্পাদকীয় লিখলে- আমার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আমি বিশ্বাস করি, এখনো আপনার পত্রিকা-প্রথম আলোর রিপোর্টকে পাঠক গুরুত্ব দেয়। আমার বিরুদ্ধে আপনার পত্রিকা অন্যায়মূলক আচরণে অনুতপ্ত হলে, বা আমার প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে- তার স্বীকার করলে পত্রিকার মান যাবে না বরং এ ধরনের লেখা পত্রিকার ভাবমূর্তি বাড়াতেও সহায়ক হবে।’

আবুল হোসেন লেখেন, ‘বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পর আপনি পদ্মা সেতুর দুর্নীতি নিয়ে পত্রিকায় লিখেছেন, আমার বিরুদ্ধে অসত্য রিপোর্ট লিখে আমার সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন-যা ছিল সত্যের অপলাপ। এখন যখন সত্য উদ্ভাসিত হয়েছে, সত্য প্রকাশিত হয়েছে-তখন সেই মিথ্যা ও অসত্য বক্তব্য প্রত্যাহার করাই তো সৌজন্যতার দাবি। সত্যের প্রতি অবিচল থাকা, সত্যের প্রতি নিজেকে আত্মসমর্পণ করা- সত্য প্রকাশে সাহসী হওয়াই তো সত্যিকার মানুষের পরিচয়। আমি আপনার পত্রিকায় সত্য প্রকাশের আশায় রইলাম।’

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/হায়াত/নীরব/এস আর/ ০৪ মার্চ, ২০১৭