মৌলি আজাদঃ ফেব্রুয়ারি একুশের মাস। বাঙালির অহংকারের মাস। আর সেই অহঙ্কারের সঙ্গে ১৪ ফেব্রুয়ারি এসে যুক্ত করে ভালোবাসার দিনকে। এ দেশটার জন্য আমরা যেমন সবাই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি ভালোবাসি ‘বাংলাদেশ’, তেমনি রক্তমাংসের নারী-পুরুষ হিসেবেও প্রিয় মুখটাকে দেখলে বা দেখার সুতীব্র ইচ্ছে হলে বুকের বাম পাশটা যদি চিনচিন করে ওঠে তবে তাই বা অস্বাভাবিক কী? দুজন নারীপুরুষের পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব সেখান থেকে ভালোবাসা অতঃপর পরিণয়- তা হতেই পারে। আসলে ভালোবাসা হলো পুষ্পের মতো সুন্দর-কোমল এক অনুভূতি। একমাত্র প্রেমে পড়ার পরই নারী আর পুরুষ( তা সে যে বয়সেরই হোক না কেন) বুঝতে পারে তার চেনা পৃথিবী সেদিন থেকে কতখানি বদলে গেছে!

এ পৃথিবীর সবকিছুই যেন তাদের কাছে অপরূপ হয়ে ধরা দেয়, তুচ্ছ কত বিষয় প্রেমিকার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপের পর প্রেমিকের কাছে হয়ে ওঠে ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’। নারী আর পুরুষ যখন প্রেমে পরে তখন হাজার মানুষের ভিড়ে যেন সে তার প্রিয় মানুষকে খুঁজে বেড়ায় আর তার প্রিয়র কণ্ঠস্বর যেন কাছে না থেকেও তার কাছে বাতাসে ভেসে আসে। বায়োলজিতে ভালোবাসার যত কঠিন সংজ্ঞাই থাকুক না কেন যখন কাঙ্ক্ষিত মানুষটির পিছনে ঘুরে ঘুরেও তার মনে ঢোকা না যায় সেই নারী বা পুরুষই তখন হাড়ে হাড়ে টের পায় ভালোবাসা পাওয়া যে কত কঠিন। সত্যিকারের ভালোবাসা পাওয়া আজকালকার এই ফাস্ট সোসাইটিতে একটু কঠিনই বুঝি।

আজকাল যোগাযোগের জন্য এত সুলভ মাধ্যম তৈরি হয়েছে যে সম্পর্ক তৈরি হতেও যেমন খুব বেশি বেগ পেতে হয় না আর সম্পর্কের শেষটাও যেন হয় খুব দ্রুত। ব্লক করে দিলেই বোঝা যায় সম্পর্কের খতমের কথা। যাকে পাওয়ার জন্য একসময় এত কাঠখড় পোড়ানো তাকে পাওয়ার পর সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যত্নের ঘাটতি কেন তবে? নাকি আকাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে পাওয়া হয়ে গেলেই আগ্রহটা নিম্নমুখী হয়ে ওঠে ক্রমশ? এক পক্ষ থেকে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য চেষ্টা করলে চলে কি? ভুলে গেলে কি চলে যে ভালোবাসা একটা কমিটমেন্ট? সেই কমিটমেন্টের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুজন মানুষের জীবনের নানারকম আশা আর স্বপ্ন। বলা যায় প্রেমে পড়ার পর দুজন মিলেই যে একটা পৃথিবী তৈরি করে নেয়। তাই প্রতিদিনই হবে যুগলের জন্য ভালোবাসার দিন (তা প্রেমিক/প্রেমিকা ও স্বামী- স্ত্রী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য)।

প্রতিদিনই দুজন দুজনকে বুঝুন। মানসিকভাবে কাছে আসুন। কিছুটা সময় দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকুন না (চোখ যে নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়)।

প্রয়োজনে দুজন দুজনকে স্পর্শ করুন। দামি কোনো গিফট দরকার নেই একটা লাল গোলাপ কি দুজন দুজনকে দেওয়া যায় না? ভুল বোঝাবুঝি হলে তৃতীয় মাধ্যমের দারস্থ না হয়ে নিজেরাই খোলামনে কথা বলে নিমিষে সমস্যাটা মিটিয়ে ফেলুন না ! ইগো ঝেড়ে ফেলে প্রয়োজনে একবার সরি বলুন। দেখবেন দুজনকে আবার প্রেমের বাধনে জড়াতে তা ম্যাজিকের মতো কাজ করছে। ভালোবাসলে কোনো ভয় বা লজ্জা থাকতে নেই। তবে হ্যাঁ কাউকে ভালোবেসে তাকে না পেলে নিজের ক্ষতি করাটা নিজেরই অপমান। হয়তো ক্ষত সারতে একটু সময় লাগবে। লাগুক না সময়। ক্ষতি কী? ঠিক সময়ে আপনার যোগ্য মানুষটি ঠিকই আপনার কাছে এসে ধরা দেবে। আর কোনো একজন মানুষের জন্যই তো এ পৃথিবীতে আমাদের আসা নয়, তাই না? ভালোবাসায় আঘাত পেলে প্রথমে নিজেকে ভালোবাসুন, চারপাশকে ভালোবাসুন। নিজেকে সৃষ্টিশীলতার মধ্যে রাখুন। দেখবেন ধীরে ধীরে কষ্ট ফিকে হতে শুরু করেছে। আর যাকে ভালোবাসি তাকে না পেলে তার ক্ষতির কথা মাথায় ঘূণাক্ষরেও যে চিন্তা করা যাবে না। কারণ ভালোবাসাকে অপমান করা যায় কি?

মনে মনে ভালোবাসা পুষে রাখা আর নয়। প্রিয় মানুষটার কাছে প্রকাশ করুন আপনার বুকের ভেতরে তার জন্য রাখা গভীর ভালোবাসা। এই ভ্যালেন্টাইস ডেতেই (এই বিশেষ দিনটিই হতে পারে ভালোবাসা প্রকাশের উপযুক্ত দিন। প্রতিদিন ভালোবাসলেও মনে রাখুন বিশেষ দিন, বিশেষ কিছুই বলে) প্রিয় মানুষটার ম্যাসেজ ইনবক্সে দিয়ে দিন কবি হুমায়ুন আজাদের কবিতার কিছু পংক্তি ‘যদি আর কাউকে কখনো জড়িয়ে ধরো সে যেন হই আমি/ যদি কোনো থরথর ঠোঁটে রাখ ঠোঁট, সেই ঠোঁট যেন হয় আমার পাগল ঠোঁট/ প্রিয় ভালোবাসি তোমাকেই আমি দিবাযামি, যেন আর কেউ নয়, হই শুধু আমি।

দেখুন না, আপনার জন্য উথালপাথাল করা কোনো জবাবই ইনবক্সে প্রতিউত্তর হয়ে আসে কি না এই ভ্যালেন্টাইনস ডেতে।

লেখক : সিনিয়র সহকারী সচিব (লিগ্যাল), বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/হায়াত/নীরব/ এস আর/১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭