জাফর উল্লাহ সোহেল : বিকেলে অফিসের সুবাদে দুপুরে খাওয়ার পর একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। বসন্তের এই বিকেলে একটু তন্দ্রার সুযোগ কিন্তু কম পাওয়া না। আরামের তন্দ্রাটা হঠাৎ ছুটে গেলো একটা পাবলিসিটি বা মাইকিং শুনে। এক তরুণের অনভ্যস্ত কণ্ঠে ঘোষণা : ‘সুপ্রিয় এলাকাবাসী, আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহিদ দিবস। এ উপলক্ষে মতিঝিল এজিবি কলোনির আইডিয়াল জোনে স্থাপিত শহিদ মিনারে ফুল দেয়ার আয়োজন করা হয়েছে। এলাকার সব বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও সংগঠনকে এখানে ফুল দেয়ার অনুরোধ করা যাচ্ছে। আয়োজনে চেতনায় একুশে সংগঠন ও মতিঝিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও অঙ্গ সংগঠন।’
বিষয়টা বুঝতে এমনিতে অসুবিধা হবার কথা নয়। দু’দিন ধরে বাসার কাছেই শহিদ মিনারে ধোয়া-মোছা আর চুনকামের তৎপরতা চলছে। সোমবার বিকেল অবধি সরকার প্রধানের ছবি আর স্থানীয় নেতাদের ছবিসহ কালো আর সাদা রঙের ডজন দুয়েক ব্যানারও জড়ো করা হয়েছে মিনারের পাশে। খটকা কিছুটা লাগলো মাইকিংয়ের ধরন দেখে।
প্রথম কথা হলো, ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে ভাষা শহিদদের স্মরণে নির্মিত শহিদ মিনারে ফুল দিতে যাবেন সচেতন বাঙালি মাত্রই।এজন্য মাইকিং কেনো করতে হলো?
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মাত্র ২-৩ কিলোমিটারের মধ্যে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের অবস্থান হবার পরও সেখানে না গিয়ে বা সেখানে যাওয়াকে একরকম নিরুৎসাহিত করে পাড়ার ভেতরেই ফুল দেয়ার আয়োজন করাটা কতোটা যুক্তিযুক্ত?
প্রশ্নগুলো কেনো এলো সেটা বলি- আমার বাসায় স্কুল পড়ুয়া দু’জন শিক্ষার্থী আছে। একজন হাইস্কুলে, আরেকজন প্রাইমারিতে। দু’জনই মতিঝিল এলাকার নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। বড় জনকে দেখলাম একদিন মেলায় যাবার জন্য বেশ তোড়জোড় করছে। মা-বাবাকে টাকার জন্য অস্থির করে তুলেছে। বললাম কী ব্যাপার, মেলায় যাবার জন্য এতোটা উতলা হলে কেনো ? সে বললো, বন্ধুরা যাচ্ছে। অনেক ঘুরবো। আমি বললাম, কী কী বই কিনবে। সে বললো, বই তো কিনবো না, এমনি ঘুরবো, সেলফি তুলবো! আমি তো বোকা বনে গেলাম। আচ্ছা ঠিক আছে, বলো তো দেখি বইমেলার নাম একুশে বইমেলা কেনো রাখা হলো? সে বললো, ‘কেনো এই যে ২১ ফেব্রুয়ারি আমগো স্বাধীনতা দিবস না, হেল্লাইগাইতো ওই দিন বন্ধ থাকে, মেলা তো এজন্যই হয়!’। দ্বিতীয়বার আমি আর বোকা হলাম না। আমি বুঝলাম বিষয়টা। আমাদের শিক্ষার তুঘলকি উন্নয়নের এটা যেনো আরেকটি উদাহরণ।
যাহোক, যে জন্য এই উদাহরণ আনলাম সেটি হলো, আমরা আমাদের নতুন প্রজন্মকে ‘২১’ কী, এই শিক্ষাটুকু দেয়ার চেয়ে, একুশের চেতনা লালন করতে শেখানোর চেয়ে, ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানানোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি ঢোল পিটিয়ে ফুল দেয়ার আয়োজন করাকে। কী সার্থকতা এর, কী এর অর্জন? যে পাড়ার সচেতন রাজনীতিকেরা, চিন্তাবিদরা, শিক্ষিত অভিভাবকরা ভাষার মাসে এই উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয় যে, আমাদের সন্তানদের একুশ’কে জানাতে কিছু একটা করা দরকার, একটা সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতা বা একটা রচনা প্রতিযোগিতা কিংবা একটা আলোচনা সভা করা দরকার, সেখানে মাইকিং করে ফুল দেয়ার আয়োজন যে সংশ্লিষ্টদের প্রচার-প্রচারণা আর স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিবিধ উদ্দেশ্যে পরিপূর্ণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
সুতরাং পাড়া-মহল্লায় ফুল প্রদানের আয়োজনের অনেক ইতিবাচক দিক থাকার কথা থাকলেও প্রকৃত অর্থে তার কিছুই প্রতিফলিত হচ্ছে না। এর চেয়ে বরং কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে হাজারো মানুষের প্রভাত ফেরিতে যদি শিশু-কিশোরদের নেয়া যায়, সেখান থেকে তারা কিছুটা হলেও আন্দোলিত হতে পারে, কিছুটা হলেও বুকের ভেতরে জমতে পারে একুশের ভাবনা, একুশের চেতনা। নাগালে থাকলে সেই সুযোগটাই তো আগে নেয়া উচিত। আমার বাসার ছোট ছেলেটা কিন্তু সেই হাজার মানুষের নগ্নপায়ের স্রোতে মিশে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে যেতেই উতলা হয়েছে। কিন্তু, বাসার পাশেই যেহেতু ফুল দেয়ার আয়োজন, তার বাবা সে আবেদনে সাড়া দিলেন না।
এখন প্রশ্ন হলো, পাড়া-মহল্লার এই আয়োজন কি করাই যাবে না। অবশ্যই করা যাবে। গ্রামে গ্রামে বা শহরের পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় যেসব শহিদ মিনার গড়ে তোলা হয় সেসবে কিন্তু সব দিবসেই শহিদদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। রাজধানীর বাইরে তো স্থানীয়ভাবেই শহিদ মিনারে ফুল দিতে হবে। তাদের পক্ষে ঢাকায় এসে দেয়া সম্ভব নয়। কিংবা ঢাকার মধ্যেও যেসব এলাকা অনেক দূরের সেখানে স্থানীয় শহিদ মিনারেই ফুল দেয়া উচিত। সাধারণভাবে হয়ও তাই। আমাদের এসব শহিদ মিনারে কিন্তু ভাষা ও স্বাধীনতাযুদ্ধ দুটোতেই শহিদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় ও স্মরণ করা হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে কেবল ভাষা শহিদদেরই শ্রদ্ধা জানানোর নিয়ম এবং এই মিনার তাদের স্মৃতিতেই তৈরি।
সুতরাং যারা আশপাশে আছেন, তারা কেনো এই মিনারে যাবেন না। তাদের নতুন প্রজন্ম কেনো এখানে যাবার সুযোগটা হাতছাড়া করবে।
আরেকটি বিষয় হলো, পাড়ায় আয়োজন করা হচ্ছে ভালো, কিন্তু এই আয়োজন যদি নতুন প্রজন্মকে কোনো শিক্ষা না দিয়ে, কোনোভাবে তাদের ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগে আন্দোলিত না করে, তাদের ভেতরে একুশের চেতনা জাগ্রত না করে কেবল কিছু কিছু নেতার স্ট্যান্টবাজি হয়, রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি বা দেখানোর হাতিয়ার হয়, তবে কী লাভ, কাদের লাভ এই আয়োজনে। মাইকিং করে দাওয়াত করার আরো একটি তাৎপর্য কিন্তু খুঁজে নেয়া যায়। তা হলো, হয় এই এলাকার মানুষ জানে না আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, ফুল দিতে হবে, শহিদ মিনারে যেতে হবে অথবা এই এলাকার যারা যারা চিন্তা করছেন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে যাবার, তারা যেনো এখানেই স্থানীয়ভাবে ফুল দেন সে ব্যাপারে এক ধরনের চাপ তৈরি করা।
সুতরাং আমার মনে হলো বিষয়টি বেশ চিন্তার। নতুন প্রজন্মকে যেখানে প্রভাত ফেরিতে নিয়ে যাওয়াটা বেশি জরুরি, সেখানে এসব উদ্দেশ্য-প্রণোদিত আয়োজন তাদের এক প্রকার নিরুৎসাহিত করছে। রাজধানীর স্থানীয় শহিদ মিনারগুলোতে, অন্তত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের কাছের এলাকায়, বরং স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা যায়, একুশের শহিদ দিবসে নয়। এজন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা হওয়া উচিত প্রভাত ফেরি, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা হওয়া উচিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার।
লেখক- গণমাধ্যমকর্মী

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/হায়াত/নীরব/ এস আর/২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭