তাসরুজ্জামান বাবু: একটা মজার গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। ইমাম সাহেব শুক্রবার দিন যথেষ্ট সময় নিয়ে পুকুর ঘাটে গোসল করছেন শরীরে সাবান ঘষে ঘষে। কিছুক্ষণ পর জনৈক জব্দুল মিয়া পুকুরে গিয়ে ইমামের আগেই গোসল শেষ করে উঠে পড়লেন। যাবার সময় ইমাম সাহেবকে বলে গেলেন, ‘হুজুর, একটু তাড়াতাড়ি করবেন, আজকে নামাজের দিন!’

বাস্তবতা এখন এরকমই। পহেলা বৈশাখ এলেই আমাদের মধ্যে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। না হলে যেন বাঙালিই নয় । সারা বছর বিদেশি পোশাক, বিদেশি ভাষা, বিদেশি সংস্কৃতির চর্চা চলে- কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, অথচ এদিন ‘একদিনের বাঙালি’ হওয়ার জন্য ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধিয়ে দেই। এ দেখি জুম্মাবারের নামাজি জব্দুল মিয়ার মতই হলো। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি পান্তা-ইলিশ খাওয়া বাঙালি সংস্কৃতির অংশ? আমরা কি শেকড়ের টানে পান্তা-ইলিশ খেয়ে দিনটি উদযাপন করি? এই শেকড় কত গভীরে প্রোথিত তা বের করার জন্য বহু কসরত করে অবশেষে ফলাফল যা পাওয়া গেল তা হল- এই সংস্কৃতির কোনো শেকড়-বাকড় নেই, এটি হাল আমলের ফ্যাশন এবং কর্পোরেট ধান্দাবাজি বৈ নয়।
কোনো দেশের সংস্কৃতি বলতে সেই দেশের আপামর জনতার নিত্যদিনের কৃষ্টিকে বোঝায়। সেক্ষেত্রে পান্তা-ইলিশ খাওয়াও দেশের সর্বশ্রেণির মানুষের পুরোনো ঐতিহ্য হওয়ার কথা। তার মানে কি আগে পুকুরে পুকুরে ইলিশ চাষ হতো নাকি তখন বাঙালি জাতি অনেক ধনী ছিল, কালক্রমে গরীব হয়ে গেছে? আসলে ইলিশের দাম কখনোই কম ছিল না, আর বর্তমানে তো ইলিশের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। এক সময় এদেশের লোক ‘মাছে ভাতে বাঙ্গালি’ বলে পরিচিত ছিল শুনেছি, কিন্তু ‘ইলিশে-ভাতে বাঙ্গালি’ ছিল বলে শুনিনি কখনো। অনেকে বলতে পারেন, ‘এই নিয়ে এত মাতামাতির কী আছে বাপু, খেলাম না হয় একদিন পান্তা-ইলিশ!’ বলি, দেশের দারিদ্র্য পীড়িত অধিকাংশ জনতাকে নিয়ে এভাবে ঠাট্টা করবেন না। আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে, এই দিন আমরা ঘটা করে খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে অপমান করছি না তো? নুন আনতে পান্তা ফুরায় যাদের তাদের পান্তার সঙ্গে ই-লি-শ! তাহলেও যদি কিছু সাযুজ্যতা থাকত তবু কথা ছিল, পান্তার সঙ্গে ইলিশ কোনোভাবেই সাযুজ্যপূর্ণ নয়।
বুদ্ধিমান বাঙ্গালির এই দেশে এমন জগাখিচুড়ী সংস্কৃতি ছিল বিশ্বাসই হয় না। এ যেন সেই গ্রাম্য প্রবাদ ‘ডাল দিয়ে পোলাও’ এর মতোই। পান্তা এদেশের গরীব জনগোষ্ঠীর একটি সাধারণ খাবার। তার সাথে ইলিশের মতো এরিস্টোক্র্যাটিক মাছের মিশ্রণ ‘গুরুচণ্ডালী দোষ’ বলেই প্রতীয়মান হয়। সম্প্রতি গবেষক ও বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আবুল মকসুদ পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য নিয়ে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের করে ফেলেছেন। তার এক লেখায় তিনি জানিয়েছেন, আমাদের চৌদ্দপুরুষ কোনো দিন কানেও শোনেনি যে বাংলা নববর্ষে ইলিশ মাছ দিয়ে মাটির সানকিতে পান্তাভাত খেতে হয়। গ্রামীন গরিবদের সঙ্গে এটি পরিহাস। বাস্তবতা হলো আশির দশকের প্রথম দিকে জেনারেল এরশাদের শাসনামলে কোনো কোনো কোল্ড স্টোরেজের মালিক তাদের মজুদ করা ইলিশ বেশি দামে বাজারে ছাড়ার মতলবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কের মাঝের মাওলানা ভাসানী সড়কে পান্তা-ইলিশের প্রবর্তন করেন। হঠাৎ করে দেখা গেল দামি গাড়ি নিয়ে বিত্তবানেরা লাইন ধরে পান্তা-ইলিশ খাচ্ছেন সকাল বেলা। সাধারণ মধ্যবিত্তের একটি বিচার-বিবেচনা বর্জিত অংশও ওই লাইনে গিয়ে সানকি হাতে দাঁড়িয়ে গেল। বাঙালি সংস্কৃতির নামে বাঙালির চিরকালের সংস্কৃতির ওপর এমন আঘাত হানা হলেও মাছ ব্যবসায়ীদের কল্যাণ প্রথাটি টিকে ছিল এতো‌দিন।
গত বছর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পান্তা-ইলিশ বর্জন করে তার শেকড় সচেতন রুচিবোধ ও জাত্যাভিমানী সাংস্কৃতিক মননের পরিচয় দিয়েছিলেন। এই তালিকায় ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসকও। পহেলা বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার যে হিড়িক পড়ে তার কারণে অনেক জাটকা নিধন হয়। এতে দিনদিন দেশের ইলিশ সম্পদ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। দিনটিকে কেন্দ্র করে অসাধু শ্রেণির ব্যবসায়ীরা ইলিশের দামও অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেয়। ফলে ক্রমেই ইলিশ সাধারণ লোকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই আমাদেরও সময় এসেছে এই অপসংস্কৃতি রুখে দেবার। শপিং মলগুলোতে ইলিশের অফার দেখে যেন সব ভুলে না যাই। পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ বর্জনের পেছনে তাড়না হিসেবে যেন থাকে সুগভীর দেশপ্রেম আর সাংস্কৃতিক মূলানুসন্ধান।
আশা করি, আমাদের তৎপরতা একদিন সংস্কৃতির নামে কর্পোরেট ধান্দাবাজি রুখে দেবে এবং দেশে জাতীয় মাছ ইলিশের প্রাচুর্য নিয়ে আসবে।

লেখকঃ যন্ত্রপ্রকৌশলী, বাংলাদেশ রেলওয়ে

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এস আর/কামরুল/নীরব/ ১০ এপ্রিল ২০১৭