সেলফি নিতে গিয়ে প্রায় অসুরের ঘাড়ে চেপে বসেছিলেন দুই তরুণী। পিছন থেকে মৃৎশিল্পী হাঁ-হাঁ করে না উঠলে ‘বেচারা’ মহিষাসুরের হাতটা বোধহয় আস্ত থাকত না!

প্রতিমার চোখ আঁকবেন কী! ঘন ঘন ফ্ল্যাশের দাপটে শিল্পীই ঠিক মতো চোখ খুলতে পারছেন না!

বোধনের বাকি পাঁচ দিন। রবিবার হিন্দুস্থান পার্ক, শিবমন্দির, ত্রিধারা, সমাজসেবীর মতো শহরের নামী কয়েকটি পুজোর উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু আমজনতার জন্য মণ্ডপ এখনও খুলে দেওয়া হয়নি। তাতে অবশ্য কুছ পরোয়া নেই বাঙালির। এ দিন কুমোরটুলি থেকেই কার্যত প্রতিমা দর্শন শুরু করেছেন তাঁরা। সরু গলিতে উৎসাহী লোকেদের ভিড়ে রীতিমতো নাকাল হয়েছেন শিল্পী থেকে কুলি-মজুরেরা।

এই ভিড়ের সঙ্গে নতুন ‘উপদ্রব’ জুড়েছেন শখের ফোটোগ্রাফাররা। মোবাইল বা ক্যামেরা হাতে ঢুকে পড়ছেন স্টুডিওতে। ঘন ঘন ফ্ল্যাশ মারছেন, ঘিঞ্জি ঘরে ঠাসা প্রতিমার মাঝে নানা দিক থেকে ছবি তুলছেন। উপরি পাওনা মহিষাসুরের সঙ্গে ‘সেলফি’!

মোবাইল ক্যামেরা ও সেলফির উপদ্রবের কথা গত বছরেই টের পেয়েছিলেন পুজোকর্তারা। বেশ কিছু পুজো মণ্ডপের ভিতরে ‘নো সেলফি জোন’ চিহ্নিত করা হয়েছিল। এ বার সেই ঢেউ পড়েছে কুমোরপাড়ায়। পরিস্থিতি এমনই ঘোরালো যে ফোটোগ্রাফারদের ঢোকা বন্ধ করতে ঘরের সামনে নোটিসও টাঙিয়ে দিয়েছেন শিল্পীদের অনেকে।

গত ক’দিন ধরে আকাশের মুখ উজ্জ্বল। এ দিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি দেখে চিন্তায় পড়ে যান অনেকে। বেলা বাড়তেই ফের রোদ বেরিয়ে এসেছে। তার পরেই কুমোরটুলির ঘর থেকে বের করা হতে পারে একের পর এক প্রতিমা। কোনওটি যাবে হুগলি, কোনওটির গায়ে ঝুলছে ‘খড়্গপুর আইআইটি’ লেখা চিরকূট। সাবধানের মার নেই! তাই রোদ থাকলেও সপরিবার দুর্গাকে মুড়ে ফেলা হয়েছিল পলিথিনের চাদরে।

দুপুরের পর থেকে প্রতিমা যেমন বেরোতে শুরু করেছিল, তেমনই পায়ে পায়ে ভিড় বাড়তে শুরু করছিল কুমোরটুলিতে। কেউ এসেছেন প্রতিমা নিতে, কেউ বা ছেলের হাত ধরে ঢুকে প়ড়েছেন ঠাকুর দেখাতে। ভিড়ের লাভ ওঠাতে হাজির ঘুগনি, ঝালমুড়ি, দিলখুশ, কুলফি মালাইও। বিকেলে মায়ের হাত ধরে কুমোরটুলিতে ঢুকছিল বছর দশেকের অংশু। সামনে ভিড় দেখে অংশুর মা বলে উঠলেন, ‘‘হাত ছাড়লেই হারিয়ে যাবি কিন্তু!’’

এ দিনই প্রতিমা নিতে এসেছিলেন বাগুইআটির এক আবাসনের বাসিন্দারা। মাঝারি মাপের একচালা প্রতিমা বের করতে যাবেন এমন সময় তাঁদের ঘিরে ফেললেন জনা কয়েক যুবক। না কোনও চাঁদা বা তোলাবাজির জুলুম নয়, মিষ্টি মুখের প্রতিমা দর্শন ও ছবি তোলার আব্দারেই আটকে পড়েছিলেন তাঁরা। শেষমেশ অনুনয়-বিনয় করে ছাড় পেলেন আবাসনের বাসিন্দারা। ভিড় ও প্রতিমার মণ্ডপে গমনের চাপ সামলাতে কুমোরটুলিতে মোতায়েন ছিল পুলিশও।

ভিড়ের মধ্যে এ দিন কুমোরটুলি সরগরম ছিল দরদামেও। প্রতিমা নিয়ে যেতে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা জানেন ঘিঞ্জি গলি থেকে প্রতিমা বের করার সাধ্য একমাত্র কুমোরটুলির কুলিদেরই রয়েছে। পাঁচশো নাকি হাজার! কত দরে প্রতিমা স্টুডিও থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠবে তা নিয়েই দরাদরি চলছিল পটুয়াপাড়ার গলিতে। প্রতিমা নিতে আসা এক যুবক বললেন, ‘‘প্রতিবার তো তোমরাই প্রতিমা বয়ে দাও। এত বেশি চাইছ কেন?’’ পাল্টা জবাব এল, ‘‘দাদা, এই এক বারই তো দেবেন। প্রতিমা পৌঁছে গেলে কী আর আমাদের মনে রাখেন?’’ কুমোরটুলির কুলিরা হয়তো জানেন না, এ বছর তাঁরাও মহানগরের থিম পুজোর অংশীদার। হাজরা পার্কের পৌর কর্মচারী সমিতি সর্বজনীন দুর্গোৎসবে থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে প্রতিমার যাতায়াতের বাহন এই সব কুলিদেরই।

চড়া দরদাম হয়েছে প্রতিমাসাজের দোকানগুলিতেও। পাঁচ ফুট লম্বা রাংতার মালার দাম ৪০০ টাকা। তিন ফুটের দাম ৩৫০! প্রতিমা কিনতে এসে লোকজনেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বার সাজের দাম অনেক চড়া। উপায় না থাকায় তা-ই কিনতে হচ্ছে তাঁদের। দাম যে কিছুটা বেড়েছে তা মানছেন দোকানিরাও। তাঁরা বলছেন, প্রতি বছরই কাঁচা মালের দাম বাড়ছে। প্রতিমার সাজের দামও তাই বাধ্য হয়েই বাড়াতে হয়েছে।