এস এম নূর মোহাম্মদ : সন্তানকে ভালোবাসেনা এমন মা-বাবা পাওয়া দুষ্কর। শুধু মানুষ নয়, সকল প্রাণীর মধ্যেই সন্তানের প্রতি ভালবাসার অভাব নেই। তাদের সুখেই মা-বাবার সুখ। তাদের দুঃখেই দুঃখি মা-বাবা।

সন্তান মানুষের মতো মানুষ হলে মা-বাবা সম্মানিত। আবার বিপথে গেলেও তার দায় প্রকারান্তরে মা-বাবাকেই নিতে হয়। তাই নিজের সন্তানকে অবহেলা নয়, সুশিক্ষার মাধ্যমে সমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা আমাদের কর্তব্য।

সন্তানের মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা মা-বাবা তথা পরিবারের। বিপথে যাওয়ার পেছনেও মা-বাবা তথা পরিবারের অসচেতনতাই দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এতে নতুন মাত্রা দিয়েছে গুলশানে রেস্টুরেন্টে হামলা, শোলাকিয়ার ঈদ জামায়াতের পাশে হামলা, শ্যামলীর জাহাজ বাড়ির জঙ্গি দমন অভিযান, টঙ্গীতে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং কুমিল্লায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা।
আর জঙ্গিবিরোধী প্রায় প্রতিটি অভিযানেই তরুণদের সম্পৃক্ততা মিলছে। এসব ঘটনায় পুরো দেশবাসীর মতো নাড়া দিয়েছে আমাকেও। বিশেষ করে এসব জঙ্গিবাদে তরুণদের জড়িয়ে পড়াটা রাষ্ট্রের জন্য একটি ভয়াবহ বার্তা। কেননা তরুণরাই আগামী দিনের কর্নধার। তারা জঙ্গিবাদের ধিকে ঝুকলে জাতির হাল কে ধরবে ?
জঙ্গিবাদের এসব ঘটনার পর সচেতন মহল থেকে শুরু করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এখন পারিবারিক বন্ধনের কথা বলছেন। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে এখন সবখানেই একান্নবর্তি পরিবার ভেঙ্গে একক পরিবার গড়ে উঠেছে। এসব পরিবারের কর্তারা দুজনই অধিকাংশ সময় ব্যবসা বা চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। খোজ নিতে পারেননা সন্তানদের। যে কারণে বিপথে যাচ্ছে সন্তানরা।

আমি সন্তানদের মানুষ করে তোলার ব্যাপারে কিছু পরামর্শ তুলে ধরবো। প্রথমইে বলবো সন্তান জন্মের পর একটি অর্থবোধক সুন্দর নাম রাখুন। নামটা অনেক সময় মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্টের বাহ্যিক রুপ হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে সন্তানকে সে অনুযায়ী প্রথম থেকেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া উচিত। তাকে বুঝানো উচিত বড় হয়ে ৃ এটা হতে হবে। তবে সে ক্ষেত্রে সন্তানের সক্ষমতার কথা চিন্তা করতে হবে।

পৃথিবীর সকল ধর্মেই সাম্য, মানবতার কথা তথা মানুষের কল্যাণের কথা বলা আছে। তাই সন্তান যে ভাষায়ই পড়া-লেখা করুক না কেন, যে বিষয়েই পড়–ক না কেন শুরুতে অবশ্যই তাকে নিজ নিজ ধর্মের সঠিক শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে পরবর্তিতে কেউ ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে বিপথে নিতে পারবে না।

সন্তানকে ভাল কাজে উৎসাহ দিন। তাকে বুঝান সক্ষমতা অনুযায়ী সারা জীবন ভাল কাজ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনে বড়দের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে। বাচ্চারা অনুকরণ প্রিয়। তাই ছোটদের সামনে যত খুশি সম্ভব আপনিও ভাল কজ করুন। এজন্য ছোট-খাট উপহারও দিতে পারেন উৎসাহের জন্য। আপনি হয়তো হাজারো কর্মব্যস্ততার মধ্যে সময় কাটান। তারপরও সম্ভব হলে প্রতিদিনই সন্তানের পড়া-লেখার খোঁজ নিন। আর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সন্তানের বিষয়ে কথা বলুন।

সন্তানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। এ জন্য মাঝে মধ্যে গিয়ে তাদের পাঠ দান দেখুন। শিক্ষকদের সম্পর্কে জানুন। প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করুন। সন্তানের বিষয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলুন। সুযোগ থাকলে শিক্ষককে বাসায় দাওয়াত করুন। শিক্ষককে ভাল মনে না হলে সন্তানকে তার কাছ থেকে দূরে রাখুন এবং তার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে জানান।

সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার সম্পর্ক ফ্রি করুন। আপনাকে অবশ্যই সন্তানের ভাল বন্ধু হতে হবে। যাতে করে সে তার ভাল লাগা, মন্দ লাগা সবই আপনাকে জানায়। এমনকি কোন কাজ করার কথা চিন্তা করলেও যাতে আপনার সঙ্গে পরামর্শ করে। মনে রাখবেন যার সন্তান মা-বাবার ভাল বন্ধু না, সেই সন্তান বিপথে যাওয়া খুবই সহজ। এজন্য একসঙ্গে বসে পরিবারের সব সদস্য খাওয়া-দাওয়া করা, সময় করে মাঝে মধ্যে ঘুরতে যাওয়া খুব কাজে দেয়।

সন্তান তার বন্ধুদের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখে। তাই তার বন্ধুদের সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। এ জন্য সন্তানের সকল বন্ধুদের দাওয়াত দিয়ে তাদের ব্যাপারে ধারণা নিতে পারেন। আপনার সব স্বজনদের সঙ্গেই সন্তানের পরিচয় করানো উচিত। সম্ভব হলে কাছের পরিচিত জনদের সঙ্গেও। এতে করে সে দূরে থাকলেও হয়তো পরিচিত কারো না কারো নজরে পড়বে। আর সবাই মিলে খোঁজ রাখলে সেটা সন্তানের জন্যই ভালো।
নিজে সাহিত্য চর্চা করুন এবং সন্তানকেও উৎসাহিত করুন। বই পড়া অভ্যাসে পরিণত করুন। আর এ জন্য নিজের বাড়িতে সাধ্যের মধ্যে একটি ছোট-খাট লাইব্রেরি করে ফেলতে পারেন। মনে রাখবেন একাডেমিক পড়া-লেখার পাশাপশি সন্তানকে আরও অনেক কিছুই শেখাতে হবে। একটা বয়স থেকে সন্তানকে পত্রিকা পড়ায় উৎসাহিত করুন। এতে করে সমাজের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে তার ধারনা অর্জন হবে এবং সচেতনতা তৈরি হবে।

নিজে মিতব্যায়ী হতে হবে এবং সন্তানকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে। এতে করে সন্তান শুরু থেকেই খরচের ব্যাপারে সচেতন হবে। ক্লাশের বাইরে বিভিন্ন সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে সন্তানকে উৎসাহিত করুন। এতে করে সে সমাজের অনেক বড় বড় মানুষের সঙ্গে ছোটকাল থেকেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং তার মধ্যে বড় হওয়ার প্রেরণাও জাগবে।

টিভি-কম্পিউটার যেমন আমাদের অনেক উপকারে আসে তেমনি এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। তাই এগুলো এমন স্থানে রাখুন যাতে সবার নজরে পড়ে। এককভাবে যাতে এগুলো ব্যবহার করা না যায়। সব সময় সন্তানের মানসিকতার দিকে খেয়াল রাখুন। কারণ একেক বয়সে একেক রকম চাহিদা তৈরি হয়। তবে হঠাৎ তার আচরণ পরিবর্তন মনে হলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খেয়াল করুন। বুঝার চেষ্টা করুন, কেন এ পরিবর্তন, কি কারণে সে পরিবর্তিত হচ্ছে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন।
সন্তানকে যতটা সম্ভব একা থাকা থেকে বিরত রাখুন। তার সাধ্যমতো বাড়ির ছোট-খাট কাজ করতে দিতে পারেন। এতে করে সংসারের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আগে থেকেই তার জানা-শুনা থাকবে। অবসর সময়ে সন্তানকে সফল মানুষদের গল্প শোনান। বড় হতে হলে কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় দরকার সেটা বুঝতে শিখান। প্রত্যেক সফলতার পিছনে কত সাধনা করতে হয়েছে সেটা তার অনুভুতিতে আনুন। যাতে করে সে কখনো সামান্য বিফল হলেও হতাশ না হয়। দেখবেন একদিন আপনার স্বপ্ন সত্যি হবেই।

লেখক। সাংবাদিক
noorjournalist24@gmail.com