ইসমাঈল সিরাজী: ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দলীয় ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে ব্যাপক সাড়া দেয় নতুন প্রজন্মের ভোটাররা। সে নির্বাচনে নিরঙ্কুশসংখ্যা গরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গত ৮ বছরে অনেক সাফল্য দেখালেও স্বয়ং আওয়ামী লীগের অধিকাংশ এমপি, মন্ত্রীরা এখনো নিজেদেরকে ডিজিটাল করতে পারেননি। তাদের অনেককে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগেও ফেসবুক বা ইমেইলেও পাওয়া দুষ্কর।

ডিজিটাল বাংলাদেশ হবে সরকারের সেই মন্ত্রী এমপি ৮ বছর পরেও এনালগ থেকে গেছেন। আমার এমপি ডটকমের ডাটাবেজ তৈরি করতে গিয়ে তাদের দেয়া তথ্য অনুসারে ৩৫০ এমপির মধ্যে ২৯৫ এমপির ফেসবুক আইডি বা পেজ থাকলেও সেগুলো ভেরিফাইড নয়। ভেরিফাইড ফেসবুক আইডি বা পেজ আছে এমন এমপির সংখ্যা মাত্র ৭। ভেরিফাইড টুইটার অ্যাকাউন্ট আছে মাত্র ২ জনের। ওয়েবসাইট আছে মাত্র ১৫ এমপির। এমপিদের মধ্যে ১৬৩ জনই ব্যবসায়ী। ফলে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একেবারেই নিষ্ক্রিয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এমপিদের গড় বয়স ৫৭ বছর এর মধ্যে প্রবীণতমের বয়স ৮৫ বছর ও সর্বকনিষ্ঠ এমপির বয়স ৩৩। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক দিয়ে এক-তৃতীয়াংশের রয়েছে স্নাতক ডিগ্রী, মাস্টার্স ডিগ্রী আছে এক-তৃতীয়াংশের ও পিএইডি ডিগ্রী আছে মাত্র ৪ জনের। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, জাতীয় সংসদের স্পীকার নারী হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ৭ শতাংশ নারী এমপি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে এসেছেন।

‘আমার এমপি’ টিম কর্তৃক পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, যে ৭ এমপির ভেরিফাইড ফেসবুক আইডি বা পেজ আছে তারা হলেন জুনাইদ আহমেদ পলক, শাহরিয়ার আলম, ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল, শিরিন শারমিন চৌধুরী, তারানা হালিম, ওবায়দুল কাদের (আইডি) ও দিপু মনি (আইডি)। সম্পূর্ণ ভাবে অনুপস্থিত আছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মাত্র ২ এমপির টুইটার অ্যাকাউন্ট আছে। তারা হলেন— জুনাইদ আহমেদ পলক ও সাবের হোসেন চৌধুরি। নন-ভেরিফাইড টুইটার অ্যাকাউন্ট আছে ১০ জনের। নিজস্ব ওয়েবসাইট, ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ ও ভেরিফাইড টুইটার আইডি আছে এমন একমাত্র এমপি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে ৩০০ এমপির মধ্যে ১৬৩ জনই ব্যবসায়ী! এ কারণে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একেবারেই নিষ্ক্রিয়।

আর রাজনৈতিক দল হিসেবে একমাত্র আওয়ামী লীগেরই ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ, টুইটার এবং ওয়েবসাইট আছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও এগিয়ে আছেন এ তালিকায়। তার যেমন নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে তেমনি আছে ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ ও টুইটার অ্যাকাউন্ট। প্রবাসীদের মাঝে একমাত্র যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা সুশান্ত দাস গুপ্ত ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজ আছে।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কোন ধরনের মাধ্যমে উপস্থিতি না দেখে আফ্রিকার দারিদ্র্য-পীড়িত বিভিন্ন দেশ উগান্ডা, ইথোওইয়া ঘানা, নাইজেরিয়ার মত দেশের তথ্য মন্ত্রীদের ব্যাপারে অনলাইনে খুঁজ নিলে দেখা যায় এসব দেশের তথ্য মন্ত্রীদের ও সরব উপস্থিতি আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচিত ৩’শ এবং সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের এমপিদেরকে জনগণের মুখোমুখি করতে এবার আসছে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ ‘আমার এমপি ডট কম’ নামের একটি সাইট। কেউ যদি কোনো বিষয়ে জানতে বা জানাতে চান তাহলে এই ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দিলেই যে এমপিকে প্রশ্নটি করছেন তিনি পেয়ে যাবেন।

আমার এমপি ডট কম ওয়েবসাইটটি পরীক্ষামূলকভাবে চলছে গত এক বছর ধরে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হবে চলতি বছরের মার্চের শেষ সপ্তাহে। এমনটাই জানিয়েছেন, ওয়েবসাইটটির প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার ইফতেখার মোহাম্মদ।

এই ওয়েবসাইটে থাকবে দেশের সব এমপির তথ্য। যে কেউ ওয়েবসাইটে ঢুকে নিজের এলাকা ও এমপির নাম দিলেই তার সব তথ্য চলে আসবে। নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা এমপিদের সকল সম্পদ বিবরণীও থাকবে সেখানে।

কেউ চাইলে তার এমপিকে ই-মেইল, ফোন, টুইট ও প্রশ্ন করার অপশনও পেয়ে যাবেন এই ওয়েব সাইটে। দরকারি মেনুতে ক্লিক করে যোগাযোগ ও সব প্রশ্ন করা যাবে। এমপির বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানাও আছে ওই ওয়েবসাইটে।

ওয়েবসাইটটির নির্মাতা লন্ডনভিত্তিক আইটি প্রতিষ্ঠান টেকশেড লিমিটেড। ওয়েবসাইটটির প্রধান অফিস সিলেটের হবিগঞ্জে। মুঠোফোনে কথা হয় প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার ইফতেখার মোহাম্মদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছি। এর মধ্য দিয়ে একজন সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তার জনপ্রতিনিধিকে খুঁজে পাবে। তার মনের কোণে জমে থাকা প্রশ্ন করতে পারবে যেকোনো সময়। ওয়েবসাইটটিতে জন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পিটিশন দাখিল করারও সুযোগ থাকবে। যদি সেই বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ পিটিশন দাখিল করেন তবে সেই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট এমপির নজরে ওয়েবসাইটটির উদ্যোক্তারাই আনবেন।’

এই উদ্যোগের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইফতেখার বলেন, ‘২০১০ সালে এই ওয়েবসাইটটি বানানোর ভাবনা আসে আমাদের মাথায়। তখন থেকেই আমরা পরিকল্পনা করেছি এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করার। এরপর ২০১৬ সালে এটি আমরা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছি।’

এই সময়ে সব এমপির সব তথ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ সেরে নিচ্ছেন তারা। এ জন্যই আনুষ্ঠানিক যাত্রায় দেরি হয়েছে বলে জানান ইফতেখার। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণভাবে চালু করার জন্য ৩৫০ জন এমপির তথ্য লাগবে। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা দেখি, তাদের সাত-আটজন ছাড়া কারোই কোনো ওয়েবসাইট নেই। তাই আমরা প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তাদের সম্মতি নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অনুমতির দরকার আছে। সবকিছু ঠিক করতে সময় লেগেছ।’

ইতোমধ্যে সবকিছু গুছিয়ে ফেলেছেন জানিয়ে ইফতেখার বলেন, ‘এই মাসেও আমরা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর সঙ্গে বসেছি। আশা করছি, মার্চের মধ্যেই আমরা এই ব্যতিক্রমী ওয়েসাইটটি উদ্বোধন করতে পারব।’

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/ আশা/ নীরব/এস আর / ১১ জানুয়ারি, ২০১৭