গোলাম সারওয়ার: গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একগুচ্ছ কর্মসূচি নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত ছিলেন। সকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে যোগদান, কিছুক্ষণ পর রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, এর পরপরই হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক, দু’দেশের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক, অতঃপর চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই, তারপর দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যাহ্নভোজ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে অন্য মাত্রার যে অনুষ্ঠানটি ছিল মর্মস্পর্শী, তার আয়োজন হয়েছিল বিকেলে মানেকশ সেন্টারে।

এ অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে ভারতীয় সৈন্য ও সেনা কর্মকর্তারা নিজেদের জীবন বলীদান করেছেন, তাদের সাতজনের পরিবারের হাতে সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন এক আবেগঘন দৃশ্যপটের সূচনা হয়। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হয়েছে বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় শহীদদের রক্তের আখরে। দুই দেশই তাদের এই রক্তদান যুগের পর যুগ স্মরণ করবে। আসুন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করি। বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে ভারতীয়দের আত্মত্যাগ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগের জন্য আমরা সম্মানবোধ করছি, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, এই শহীদরা বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছেন। এখন তাদের সেই আত্মত্যাগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা এখনও দুই দেশ পারস্পরিক উন্নয়ন ও সামগ্রিক উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে পারি।

একাত্তরে শহীদ ল্যান্স নায়েক অ্যালবার্ট এক্কা, মেজর অনুপ সিং, সৈনিক অংশুয়া প্রসান, লেফটেন্যান্ট সমীর দাশ, স্কোয়াড্রন লিডার এবি সামন্ত, ল্যান্স নায়েক মোহিনী রঞ্জন চক্রবর্তী ও সুবেদার মালকাত সিংয়ের স্বজনের হাতে রূপার ক্রেস্ট ও পাঁচ লাখ রুপি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর নরেন্দ্র মোদি তেজোদ্দীপ্ত এক দীর্ঘ ভাষণে বলেন, আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাত ভারতীয় সৈন্যের পরিবারবর্গের হাতে সম্মাননা তুলে দিয়ে দিনটিকে ঐতিহাসিক মর্যাদা দিলেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি ছিল গত শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতীয় সৈনিকরা কাজ করেছেন। তাদের আজ সম্মাননা জানানো হচ্ছে, যা একটি মহৎ উদ্যোগ।

বক্তৃতার সময় মুগ্ধ শ্রোতারা বারবার করতালি দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন জানান। মোদি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নয়নের উচ্চমাত্রায় নিয়ে গেছেন। বহু ক্ষেত্রে তারা ভারতকে অতিক্রম করেছেন। বাংলাদেশের সামনে প্রগতির এক নতুন দিগন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্মের গল্পটাই আত্মত্যাগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের ১৩৩ কোটি মানুষকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখি সে স্বপ্নই বাংলাদেশকে নিয়ে দেখি। তিনি স্মরণ করেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার আটকা পড়েন। তখন ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা মেজর অশোক তাদের উদ্ধার করেন।

ভারতীয় শহীদদের সম্মাননা জানানোয় বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নরেন্দ্র মোদি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা এক একজন এক একটি বিশ্বাসের নাম। তাদের জন্য আমাদেরও কিছু করা উচিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা দেওয়া হবে। প্রতি বছর ১০০ জন করে মুক্তিযোদ্ধা বিনা খরচে ভারতে চিকিৎসা পাবেন। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের বৃত্তি ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার রুপি করারও ঘোষণা দেন তিনি।

পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ১০ হাজার সদস্যকে প্রতি বছর বৃত্তি এবং আগামী পাঁচ বছরে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের আরও ১০ হাজার সদস্যকে বৃত্তি দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের নানামাত্রিক উন্নয়নের প্রশংসা করে মোদি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোও উন্নতি করুক। ভারত একা এগোতে থাকলে তা আসলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভারত বাংলাদেশের শুধু সুসময়ের বন্ধু নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের এই বন্ধুত্ব সব সময়ের। এ সম্পর্ক নেতার সঙ্গে নেতার নয়, বরং জনগণের সঙ্গে জনগণের। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তারই মেয়ে শেখ হাসিনা এগিয়ে নিচ্ছেন উল্লেখ করে মোদি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল জনতার জন্য, আজও বাংলাদেশের উন্নতির ধারা এগিয়ে যাচ্ছে তারই সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা স্মরণ করে মোদি বলেন, একসঙ্গে পরিবারের ১৬ সদস্যকে হত্যা করা হলো। এই ভয়াবহতা কল্পনাও করা যায় না। এর পরও যেভাবে শেখ হাসিনা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, তেমন সাহস সবার থাকে না। তিনি দেশের জন্য এগিয়ে এসেছেন। দেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

‘জয় হিন্দ, জয় বাংলা’ বলে নরেন্দ্র মোদি তার বক্তব্য শেষ করেন। অনুষ্ঠানমঞ্চটি চমৎকার করে সাজানো হয়েছিল। এ সৃজনশীল নান্দনিক পরিকল্পনা ছিল সাজ্জাদ জহির বীরবিক্রমের। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, নিয়াজির আত্মসমর্পণ ও বাঙালির বিজয়োৎসব ছিল মঞ্চসজ্জার মূল রূপকল্প।

২০১১ সালে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে সম্মাননা জানানোর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের স্মরণ করা শুরু করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই সময় ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্বাধীনতা সম্মাননাটি গ্রহণ করেন। এরপর বিভিন্ন ধাপে ৩৪০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেওয়া হয়।

টাইমস ওয়ার্ল্ড ২৪ ডটকম/এস আর/কামরুল/নীরব/০৯ এপ্রিল ২০১৭