আনসার আল-ইসলাম নামে একটি জঙ্গি সংগঠন কয়েক বছর ধরেই সক্রিয় রয়েছে। এরই মধ্যে তারা ৯ জন মুক্তমনা লেখক, ব্লগার ও বুদ্ধিজীবীকে হত্যার দায় স্বীকার করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। এত দিন পর এসে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করেছে। অবশ্য নিষিদ্ধ করা না করায় তাদের বিশেষ কিছু আসে-যায় না। কারণ সংগঠনটি আগাগোড়াই গোপনে ও বেআইনিভাবে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে আসছিল। যা করা জরুরি তা হলো, যারা এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছে ও ছিল তাদের সবাইকে খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করা। তা না হলে তারা একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটাতেই থাকবে। এটা ঠিক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর অব্যাহত তত্পরতার কারণে জঙ্গি সংগঠনগুলো অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড অনেক কমে গেছে। তার অর্থ এই নয় যে তাদের ‘নাই’ করা গেছে। এখনো অনেক জায়গায় তাদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। অব্যাহত অভিযানের কারণে তারা অনেকটা গাঢাকা দিয়ে আছে। এই অভিযান আরো জোরদার করতে হবে এবং তাদের মূল শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হবে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দুটি কারণই যুক্ত রয়েছে। দেশে যেমন উগ্র বা জঙ্গি ধারণা পোষণকারী কিছু মানুষ রয়েছে, তেমনি বিদেশি উসকানি ও মদদ নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, আনসার আল-ইসলাম নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের অনুসারী বলে দাবি করত। আল-কায়েদা নেতা জাওয়াহিরিও অতীতে এক ভিডিও বার্তায় ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে তাদের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরেক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সঙ্গেও বাংলাদেশের কোনো কোনো জঙ্গি সংগঠন যোগাযোগ রক্ষা করছে বলে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়। এ ক্ষেত্রে নব্য জেএমবি হিসেবে পরিচিত সংগঠনটির নামই বেশি শোনা যায়। বাংলাদেশে জঙ্গিদের মূলোৎপাটন করতে হলে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় কারণকে সমানভাবে মোকাবেলা করতে হবে। তাদের যোগসূত্রগুলো খুঁজে বের করতে হবে। বিদেশি অর্থ, অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জামের সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও জঙ্গিরা যাতে অর্থের জোগান না পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক কোনো উপায়েই যেন জঙ্গিবাদের প্রচার না চলে তা নিশ্চিত করতে হবে। জানা যায়, শিক্ষক, সহপাঠী নানা পরিচয়ে জঙ্গিরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তরুণদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা জাল বিস্তারের মাধ্যমে এই অপচেষ্টা বন্ধ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজস্ব নজরদারি বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরিবারকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

জঙ্গিবাদ যেসব দেশে বিস্তৃতি পেয়েছে সেসব দেশের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়, এটি শুধু রক্তই ঝরায় না, একটি দেশের অর্থনীতিকেও ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। সমগ্র জনগোষ্ঠীর শান্তি বিনষ্ট করে। একই সঙ্গে যে পরিবারের সন্তান জঙ্গিবাদে জড়ায়, সেই পরিবারটিও এক মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি হয়। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমাদের এই সভ্যতাবিনাশী জঙ্গিবাদ থেকে মুক্ত থাকতে হবে।